”না দাদা, অঙ্ক-টঙ্ক আমার একদমই মাথায় ঢোকে না। হাসি পেলে হাসি, কান্না পেলে কাঁদি এর মধ্যে আবার হিসেবটিশেব কষার কি আছে?”
দুজনকে দু’কাপ চা দিয়ে গেল ছেলেটা। চুমুক দিয়ে প্রিয়ব্রত দেয়ালে ঘড়ির দিকে তাকাল। কোর্ট নিশ্চয় এতক্ষণে বসে গেছে। ওদেরটা কখন উঠবে? এই ধরনের কেস সাধারণত প্রথম দিকে ওঠে না কিন্তু হাজির থাকতে হবে দশটা থেকেই। নিরুকে নিয়ে খুদিকেলো অপেক্ষা করছে। নিশ্চয় কোর্টরুমের মধ্যে। বাইরে থাকলে ‘ওরা’ কিছু একটা করে ফেলতে পারে। পুলিশ আর কী করবে, যা গিজগিজে ভিড় থাকে। একটা লোক ছুটে পালাতে চাইলে অনায়াসেই পালাতে পারবে। সিটি সেশনস কোর্টেই তো এখন মামলা নাকি ব্যাঙ্কশালে? এটাই তো খুদিকেলোকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি!
এইরকম বোকামি কতবার যে সে করেছে। কাল পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার কি কোনো দরকার ছিল? সে কি ইচ্ছে করেই এইভাবে উঠেছিল আচমকা কিছু দেখে ফেলার আশায়? বউটি বেশিরভাগ সময় ব্লাউজ পরে না এটা সে জানত। কিন্তু খোলা দরজার সামনে ঘর মুছবে কোমর থেকে শরীরটাকে ঝুঁকিয়ে, এটাও কি সে জানত? গলাখাঁকারি না দিয়ে বোকামিই করেছে। …হিতু ইদানীং ঝাঁঝালো মেজাজে কথা বলছে। আমার মধ্যে অপছন্দ করার অনেক কিছুই ও পাচ্ছে।
…’তোমার কি সময় কাটাবার আর কিছু নেই?’ হঠাৎই তিরিক্ষে হয়ে ওঠে, সব ব্যাপারই খোলাখুলি, স্পষ্ট, চটপট চায়…’এমনিতেই তো তুই একটু থপথপে ধরনের, স্লো’…কেউ তোকে দলে নিতে চাইত না…চোখ বুজে তোকে কাটাতুম।’ খুদিকেলোকে মৌলালির মোড়ে দেখামাত্রই তার পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া উচিত ছিল। তাহলে ফণী পালের মরাটাকে সে শুধু একমনে চুমুকে চুমুকে উপভোগ করতে পারত, নিরু চিরকাল অজানাই থেকে যেত।
প্রিয়ব্রত টেবিলের ড্রয়ারে চাবি ঢোকাল। আড়চোখে ভৌমিকের দিকে তাকিয়ে মনে হল চট করে যেন চোখ সরিয়ে নিল। এতক্ষণ ও তাকেই লক্ষ করছিল কি? চাবি ঘুরিয়ে সে ড্রয়ারটা সামান্য টেনে সাদা খামটাকে দেখতে পেল। এবার থেকে আর খামের মধ্যে টাকা ভরে তাকে অপেক্ষা করতে হবে না।
”জানো ভৌমিক, প্রতি মাসের পয়লা তারিখে টাকাটা দেবার জন্য অপেক্ষা করতাম। কীরকম একটা অভ্যাসের মতো হয়ে উঠেছিল। বহু বছরের অভ্যাসটা কাটিয়ে উঠব ঠিকই তবে যতদিন অফিস করব মাসের পয়লা তারিখে ওকে মনে পড়বেই। তোমারও বোধ হয় মনে পড়বে।”
”পড়বে। প্রত্যেক পয়লার সাড়ে চারটে বাজলেই আমার চোখ, কেন জানি দরজার দিকে চলে যেত। আশ্চর্য, অথচ আমার সঙ্গে কোনোদিনও আলাপ পরিচয় হয়নি! কী জানি একটা ব্যাপার ওনার মধ্যে ছিল!”
বেয়ারা এসে ভৌমিকের টেবিলে দাঁড়াল। ”বড়োবাবু বললেন, কাল যে ফাইলটা উনি দেখতে পাঠিয়েছিলেন সেটা বারোটার মধ্যে চাই। ডি এল আর ওটা নিয়ে রাইটার্সে যাবেন।”
ভৌমিক ব্যস্ত হয়ে পড়ল। প্রিয়ব্রত সন্তর্পণে ড্রয়ারটা টানল। খামটা এখানেই রেখে দেবে না বাড়ি নিয়ে যাবে? শুধু কি ফণী পালের মধ্যেই একটা ব্যাপার? আলতো হাসি ফুটে উঠল তার মুখে। এখন তার নিজেকে সুখী মনে হল। বহু বছর পর অফিসটাকে আঁকড়ে ধরে সময় কাটাবার জায়গা বলে আর তার মনে হচ্ছে না। বাইরেও একটা জগৎ তার জন্য অপেক্ষা করছে।
স্বদেশ সরকার এল সাড়ে চারটে নাগাদ।
”অতুলদা, একটা চিঠি লিখব, ছাপিয়ে দিতে হবে।”
প্রিয়ব্রত প্রশ্ন নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল।
”আপনার ছেলেকে বলবেন একটু?”
”হিতুর তো ইংরিজি কাগজ!”
”আমি ইংরিজিতেই লিখব। কেন, পারি না ভেবেছেন?
”না না, আমি বলছি না যে পার না তবে ওদের কাগজে চোস্ত, মানে খুব স্মার্ট ইংরিজি না হলে-।”
প্রিয়ব্রত ঠোঁটের কোণের হাসিটাকে ঠেলে নিয়ে গেল চোখের কোণে। ‘ডেঞ্জারাস লোক এই স্বদেশ সরকার।’ কই এখন তো মনে হচ্ছে না! কীরকম মিনমিনে, আমতা আমতা ভাব চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে।
”চিঠি কী নিয়ে?”
”মশা নিয়ে। কি ভীষণ বেড়েছে বলুন তো।”
ভৌমিক মুখ নিচু করে লেখায় ব্যস্ত। মুখ না তুলেই বলল, আমাদের বেলেঘাটায় যা অবস্থা, সন্ধের পর পাগল হয়ে যেতে হয়। ধূপ জ্বালিয়ে, ম্যাট পুড়িয়ে, স্প্রে করে, সবই দেখেছি, ব্যাটারা ইম্মিউন হয়ে গেছে।”
”কই আমাদের ওদিকে তো মশা নেই!” প্রিয়ব্রত অবাক হবার ভান করল। ওদের কথার তালে তাল দিয়ে এতকাল কথা বলে এসেছে। এবার সে নিজেকে জানান দেবে। মুখ নিচু করে থেকে আর ঘাড় নেড়ে এতগুলো বছর তো কাটল! ডেঞ্জারাস লোক…হাঁড়ির খবর, জানার আগ্রহ নাকি বড়ো বেশি। মোগল বংশ নীলরতনের ফ্রি বেডেই শেষ হয়ে গেছে তো কী হয়েছে? তাতে তোর এত মাথাব্যথা কেন? বাহাদুর শা কততম বাদশা, কে তা জানতে চায়! এই সবই তো ওর হাঁড়ির খবর!
”কী জানি, আপনি নর্থ ক্যালকাটায় থেকেও মশার কামড় খাচ্ছেন না, এটা একটা খবর!” ভৌমিক এবারও মুখ তুলল না।
”অতুলদার রক্ত বোধ হয় ওদের কাছে টেস্টফুল নয়।”
”বোধ হয় তাই। কিন্তু স্বদেশ, চিঠি ছাপালে কি মশা উধাও হবে?”
”হবে না। কিন্তু কর্পোরেশনের, গভরমেন্টের টনক তো নড়াতে হবে। মশার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে চিঠি যদি কাগজে বেরোয়, দেখবেন কিছুটা কাজ হবে।”
”কই চিঠিটা দাও।”
”এখনও লিখিনি, কাল আপনাকে দেব।”
”টাইপ করে দিয়ো।”
স্বদেশ উঠে যাবার পর সে আবার সাদা খামটার কথা ভাবল। পাঁচশো টাকা ওতে রয়েছে। টাকাটা নিয়ে সে বাড়ি যাবে নাকি ফণী পালের স্মৃতি হিসেবে ড্রয়ারেই রেখে দেবে? পাঁচশো টাকার খুব কিছু দরকার তার নেই। হিতু চাকরি করছে। ওটা তাহলে স্মৃতি হয়েই থাক। প্রত্যেক দিন ড্রয়ার খুলে খামটা দেখলেই তার মনে পড়বে, কীভাবে ভয়ের চোয়ালের মধ্যে বাস করে অবশেষে সে ছাড়া পেয়েছে। কিন্তু এখনও সে পুরোপুরি মুক্তি পায়নি। মাসে মাসে টাকা আর দিতে হবে না। কিন্তু ধরা পড়ার ভয়টা রয়েই গেছে।
