-প্রথমে দেখেই আমার কেমন সন্দেহ হয়েছিল। কোবরেজ মশাইকে আমি বলেছিলুম ব্যাপার ভাল নয়। উনি তো বললেন পুলিশে জানিয়ে রাখ। আরে বাবা পুলিশ কি করবে! এসব কারবার যারা করে তারা কি অত সহজে ধরা দেবার পাত্তর। রইলুম তক্কে তক্কে।
-কি, কি হয়েছে রে দুলে!
বাজারে থলি হাতে মাঝবয়সী একজন ভিড় কেটে দুলালের মুখোমুখি হল।
-সেই মেয়েটা গুলোদা। বলেছিলুম না সেদিন চালচলন সুবিধের নয়। রোজ নতুন নতুন বন্ধু। বুঝি না কিছু যেন। আর ভদ্দর ঘরের মেয়েই যদি হবি, তার অত সাজগোজ কিসের! ঘরে বসে জানলা খুলে হি হি করে হাসা, দোকান থেকে চপ-কাটলেট আনা, এসব আসে কোত্থেকে? পুরুষমানুষ তো একটা বুড়ো অথর্ব বাপ। দিনরাত ঘরে বসে থাকে। সংসার চলে তাহলে কার পয়সায়? ওর ছোট বোনটাকে গোবরা জিগ্যেস করেছিল। এই নিয়ে রাস্তায় যাচ্ছেতাই অপমান করেছিল। গোবরাটা ন্যাকা, আমি থাকলে ধুধ্বুড়ি ছুটিয়ে দিতুম।
যমুনা ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। সরু গলিতে অল্প কয়েকটা লোক জমলেই ভিড় হয়ে যায়। এখন গোটা পাড়াটাই ভেঙে পড়েছে। এমন হয় চোর ঠ্যাঙাবার সময়। আর হোত দাঙ্গার সময়।
মাধবী চুপ করে দাঁড়িয়েছিল। চমকে উঠল ঠিক কানের কাছে কার গলার স্বর শুনে।
-ঘোল ঢেলে লাথি মেরে বার করে দিক। ভদ্দর পাড়ায় ব্যবসা খুলেছে, মাগির সাহসও কম নয়!
মাধবী ফিরে তাকাল। জানলার আধখানা কপাট খুলে একটি বৌ নিজের মনেই কথাটা বলল।
-নতুন এসেছে বুঝি?
-না দিদি, আজ মাস তিনেক হল আছে। আমার জানলা থেকে তো ওদের সবই দেখা যায়। রাত এগারটা, বারোটায় বাড়ি ফেরে রোজ। উনি একদিন রাত্তিরে ধর্মতলায় একটা পাঞ্জাবির সঙ্গে ট্যাক্সিতে উঠতে দেখেছিলেন। মদ-টদও বোধহয় খায়। আচ্ছা আপনিই বলুন, এমন মেয়েকে পাড়ায় রাখতে আছে? উনি বলছিলেন দু’পা গেলেই তো আসল আড্ডা। সেখানে গিয়ে বাড়ি ভাড়া নিলেই তো হয়, ভদ্দর পাড়ায় থাকা কেন! কি বলুন?
-তা’ত ঠিক।
মাধবী ছোট্ট কথা বলে চুপ করে গেল। গলায় বোধহয় সূতিকার মাদুলি। চওড়া সিঁদুর। টকটক গন্ধ বেরোচ্ছে শাড়ি থেকেই। ঘরটা অন্ধকার করা, ফলে ওকে আর দেখতে পাচ্ছে না, তার ওপর জানলার আধখানাও ভেজানো।
-বেরিয়ে আসুন। আজ একটা হেস্তনেস্ত ক’রে তবে ছাড়ব।
-চেঁচালে বেরোবে নারে। মার, লাথি মার দরজায়।
-পুলিশে খবর দে’না!
-পুলিশ-টুলিশ দিয়ে কি হবে, আমরাই ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
মাধবী খুঁজল যমুনাকে। ভিড়ে কোথায় মিশে আছে। শনিপুজো দিতে যাবে, সে কথা কি ভুলে গেল!
-আপনি বুঝি এ পাড়ায় থাকেন?
-হ্যাঁ।
-কোন বাড়িতে?
-পঁচিশ নম্বরে।
-কটি ছেলেপুলে?
-তিনটি। দুই ছেলে এক মেয়ে।
-মেয়ের বিয়ে হয়েছে?
-না। পাত্তর খুঁজছি।
-ভাল ছেলে পাওয়া আজকাল ভারি শক্ত।
দুজনেই চমকে উঠল। কে যেন দরজায় লাথি মেরেছে। ভিড়টা আঁট হয়ে উঠেছে। যমুনা কাছে এল মাধবীর।
-কি কাণ্ড দেখলেন দিদি। পাড়ায় থাকি অথচ এসব কিছু জানি না।
-এসব কি আর ঢাকঢোল পিটিয়ে কেউ জানায়।
ঘরের মধ্যে থেকে কচি গলায় কান্না উঠতেই বউটি সরে গেল জানলা থেকে।
-চল, পুজো দিতে যাবে না!
-যাব। আর একটু দাঁড়ান না।
-ওদিকে পুজো শেষ হয়ে যাবে।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও যমুনা পা বাড়াচ্ছিল। তখনই হটাশ করে দরজাটা খুলে গেল। ভিড়টা দরজার কাছ থেকে একটু পিছিয়ে এল।
-কি পেয়েছেন আপনারা, দরজা ধাক্কাচ্ছেন কেন?
সব চুপ। কতকগুলো মুহূর্ত কাটল। তারপর চীৎকার করল গুলোদা।
-এসব চলবে না ভদ্দর পাড়ায়।
-কি চলবে না?
-কারবার করা চলবে না।
-মেরে তুলে দোব।
-আসল পাড়ায় ঘর নিন না!
-মা বোন নিয়ে আমাদের বাস কত্তে হয়।
আর কিছু বোঝা যাচ্ছে না। সকলেই চীৎকার করতে শুরু করে দিয়েছে। যমুনার হাত ধরে মাধবী টানল।
-আর একটু দেখে যাই না।
-পুজোর দেরি হয়ে যাচ্ছে।
কিছুদূর গিয়েই দরজা বন্ধের শব্দ শুনে ফিরে তাকাল মাধবী। বন্ধ দরজায় ওরা আবার লাথি মারতে শুরু করেছে।
দরজার ধার ঘেঁষে ঘোমটা দিয়ে কে একজন দাঁড়িয়েছিল, বয়স্ক মনে হয়েছিল। বোধ হয় মেয়েটির মা। মেয়ে যখন বলল, কি চলবে না? তখন হাত ধরে টানছিল আর কি যেন বলছিল নিচু গলায়, ঘরের মধ্যেটাও একটুখানি দেখা গেছল, বুড়োমতন একজন বাটি থেকে কি খুঁটে খুঁটে খাচ্ছিল। মুখ তুলে কা’কে যেন কি বলল। একটা ফ্রক-পরা মেয়ে এসে ঠোঙা থেকে বাটিতে কি সব ঢেলে দিল।
-কাণ্ড দেখেছেন!
-হুঁ।
-কি দিন কাল পড়েছে যে।
যমুনা এরপর বকবক করে যাবে। যাকগে। কান না দিলেও চলবে। মাধবী রাস্তা চলতে সাবধান হল। জলের কল-মিস্তিরী রাস্তা খুঁড়েছে। ঢিপি হয়ে আছে। কথা বলছে যমুনা, বলুকগে। বারান্দা আর জানলা, কোন বাড়িরই খালি নেই। ওরা মজা দেখছে। খুশি হচ্ছে।
মাধবী ঠিক খুশি হতে পারছে না। ঘোমটা দেওয়া সেই মেয়েমানুষটি আর বাটি থেকে খুঁটে খুঁটে-খাওয়া বুড়ো মানুষটির চেহারা মনে পড়ছে। ওরা মজা দেখছে। দেখবেই তো।
অনেক কিছুই ঘটে যাচ্ছে। এটাও একটা ঘটনা। ঘটনা আচমকা ঘটে না। কারণ থাকে। এরও একটা কারণ আছে নিশ্চয়। শৈলর স্বামীর চাকরী যাওয়াও একটা ঘটনা। কিন্তু এমন করে কি বারান্দা জানলায় ভিড় জমবে যদি শৈলর স্বামী রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়! তফাত আছে দুটো ঘটনায়। চাকরি যাওয়াটায় যতটুকু গুরুত্ব আছে তার থেকেও বেশি ভদ্রপাড়ায় একটা মেয়ের বেশ্যাবৃত্তিতে।
