বাজার করে, খেয়ে তাকে অফিস যেতে হবে। দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হল, নিরু বাড়িতেই রয়েছে। ইচ্ছে করেই দেখা করল না। হয়তো ভেবেছে দেখা করে কোনো লাভ নেই। এই লোকটার কাছে আশ্রয় চেয়েছিল। পরিষ্কার বলে দিয়েছে ‘হয় না, হয় না। তুমি এখনও ছেলেমানুষ, ঠিক বুঝবে না।’
এখন নিরুর বয়স কত? হিতুর বয়সিই হবে। বাইশ বা তেইশ, কিন্তু আরও ছোটো দেখায় অপুষ্টির জন্যই। ওর কাঁধে হাত রেখে কথা বলতে বলতে সে একবারই শুধু মুঠোর মধ্যে হাড় মাংস চেপে ধরেছিল। কী পাতলা, নরম ওর কাঁধের হাড়। মুঠোয় আর একটু জোর দিলে বোধহয় ভেঙেই যেত!
নিরু কি কিছু আঁচ করেছিল? মেয়েদের তো বাড়তি একটা অনুভব ক্ষমতা থাকে। তার হাত তখন ও আঁকড়ে ধরে বলেছিল, ‘কেন হবে না?’ এটা কি ওর দাবি? কিছু কি টের পেয়েই এই দাবি জানিয়েছিল? হাত আঁকড়ে ধরার মধ্যে কিছু খোঁজার চেষ্টা ছিল? তখন প্রত্যাখ্যান করেছি, প্রিয়ব্রত বাজারের ফটকের সিঁড়িতে জলকাদায় সাবধানে পা ফেলে উঠতে উঠতে ভাবল, তখনও জানতাম না ফণী পাল মারা গেছে। তখনও জানতাম না হিতু বলবে, ‘একইভাবে বছরের পর বছর…।’
”বাবু মজফফরপুরের লিচু, দশ টাকা, দশ টাকা কেজি।…খোসায় মোড়া রসগোল্লা, মাত্র দশ।”
হিতু লিচু ভালোবাসে। প্রিয়ব্রত উবু হয়ে বসে বলল, ”পাঁচশো। পাতা-টাতা একটু কম দিয়ো।”
. ভৌমিক এল সাত মিনিট দেরিতে। হাজিরা খাতায় সই করে নিজের চেয়ারে বসতে বসতে বলল, ”এতদিন চাকরি করছি, এই প্রথম আপনাকে ক্যাজুয়াল নিতে দেখলুম। গুরুতর কিছু হয়েছে কি?”
”নাহহ, সেরকম কিছু নয়, এমনিই। ইচ্ছে হল ডুব মারব, উইক ডে-তে বাড়িতে কেমন লাগে দেখব, দুপুরে ঘুমোব।” সে ছুটির দরখাস্তের ফর্মে কারণ দেখাবার ঘরটা ফাঁকা রেখেছে। এক দিন কামাইয়ের জন্য এইসব কথা লিখবে কি না সে ভেবে পাচ্ছে না।
”আচ্ছা ভৌমিক, কি লেখা যায় বলো তো?”
”কীসের লেখা?”
”কাল যে আসিনি তার একটা কারণ তো লিখতে হবে!”
”ডায়ারিয়া।”
”এটা একটা বিশ্রী কারণ।”
”ক্যাজুয়ালের আবার বিচ্ছিরি সুচ্ছিরি কি? দরখাস্তটা তো আর কাগজে ছেপে বেরোবে না যে পাঁচটা লোকে জেনে যাবে আপনার পেট ছেড়েছিল! অতুলদা বুঝলেন, হাস্যকর এই নিয়মটা। আরে বাবা, আমার ছুটি নেবার অধিকার আছে তাই আমি নিচ্ছি, এজন্য আবার কারণ দর্শাতে হবে কেন? এইরকম বাজে ফর্ম্যালিটিজ সরকারি অফিসে কত যে আছে!…যা খুশি লিখে দিন। কাকা বা জ্যাঠা আছেন কি? না থাকলে লিখুন, ডেথ অফ মাই আঙ্কল।…এটা পছন্দ হচ্ছে?”
”ওহ ভৌমিক, আমার সেই দাদা, যিনি টাকা নিতে আসেন।”
”খোঁজ নিয়েছেন?”
”ক্যানসারে মারা গেছেন, দিন কুড়ি আগে।”
ভৌমিকের চোয়াল, খবরটার আঘাতে ঝুলে পড়ল। প্রিয়ব্রত লক্ষ করল, শুধু মুখ নয় বসার ভঙ্গিটাও বদলে গেল। শিরদাঁড়াটা আলগা হয়ে দেহটা ইঞ্চিখানেক বসে গেল, কাঁধটাও ঝুঁকে গেছে। চোখের সাদা অংশটা প্রকট।
”এই একটা রোগ দাদা, বড্ড ভয় করে। কখন যে এসে ঘাড় মটকাবে, কেউ বলতে পারে না।”
”অত ভয় পেলে চলে না ভৌমিক। যার যেমন আয়ু ভগবান দিয়েছেন, সে ঠিক তত দিনই বাঁচবে, ক্যানসার কিসসু করতে পারবে না।”
”না দাদা, আমার আঠাশ বছরের বাই ওয়েটলিফটার ছিল। একদিন জিমন্যাসিয়াম থেকে ফিরল কাঁধে চোট নিয়ে। বারবেল মাথার উপর তুলেই পা স্লিপ করে। ঘাড়ের উপর বারবেলটা পড়ে। ব্যথা আর সারে না। চার মাস পর ধরা পড়ল ক্যানসার হয়েছে তখন আর চিকিৎসা করার কিছু ছিল না। কি বিউটিফুল বডি যে ছিল! তেরো বছর হয়ে গেল মারা গেছে, এখনও চেহারাটা চোখের সামনে ভাসে। কে ভেবেছিল এমন রোগে…।”
ভৌমিক ধীরে ধীরে মুহ্যমান হয়ে, একদৃষ্টে খোলা দরজা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল। প্রিয়ব্রত তখন দরখাস্তে লিখল: ডায়ারিয়া।
”আপনি জানলেন কবে?” ভৌমিক নিজেকে সামলে তুলেছে।
”কালই। ওর বাড়িতে গেছিলাম খোঁজ নিতে। স্টমাকে হয়েছিল। ….শোনামাত্র আমি তোমার মতোই ভয় পেয়ে গেছিলাম। তার পর মনে হল, ভয় পেয়ে আমার হবেটা কি? আমি কি ভয় পাওয়ার যোগ্য? যাদের অনেক কিছু পাওয়ার, ভোগ করার আছে তারাই মরতে ভয় পাবে। আমি গত পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর ধরে একই রাস্তায় হেঁটে গিয়ে বাজার করেছি, একই রুটের বাস ধরেছি, একই চেয়ার টেবিলে কাজ করেছি, একইরকম লোকেদের সঙ্গে বাসে ফিরেছি, দিনের পর দিন। আমি কোনোদিনই ডিরেক্টর হতে পারব না, ম্যানেজার হতে পারব না, এমনকি বড়োবাবুও নয়। তাহলে আমার ভয় পাওয়ার কোনো যুক্তি আছে কি?”
প্রিয়ব্রত অফিসে এই প্রথম টানা এতক্ষণ কথা বলল। বলার সময় মনে হচ্ছিল, হিতুই যেন তার মুখ দিয়ে কথা বলছে। সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিল।
”তাই বলে আপনি মরার ভয় পাবেন না?”
ছেলেটা সজল দত্তর টেবিলে খালি কাপ রেখে কেটলি থেকে চা ঢালছে। অফিসে এসেই অনেকে চা খায়। প্রিয়ব্রত প্রথম কাপ খায় বারোটায়। কিন্তু এখন তার খেতে ইচ্ছে করল।
”অ্যাই খোকা” সে চেঁচিয়ে ডাকল, ”এখানে দুটো চা দিয়ে যা।”
”অতুলদা, আমি এখন খাব না।”
”আরে খাও এক কাপ, এখন খেলে ক্যানসার হবে না।”
প্রিয়ব্রত অফিসে কখনো কাউকে চা খাওয়ায়নি, কারুর দেওয়া চা খায়নি। আজ ব্যতিক্রম ঘটল।
”ভৌমিক তোমার তো চল্লিশ হয়েছে। এখন তুমি জীবনের তুঙ্গে রয়েছ। হিসেবনিকেশ করার সময় এটাই, করেছ কি?”
