”তাহলে ওকে গুন্ডাদের দাবিই মেনে নিতে হয়।”
”হ্যাঁ, তাই-ই, আর দু হাজার টাকাটাও যেন না ছাড়ে। ইজ্জত, পবিত্রতা, শুচিতা রক্ষার সময় এটা নয় বাবা, আগে চেষ্টা করো বাঁচার তারপর ওসব নিয়ে ভাবা যাবে। এতে অন্যায়ের প্রশ্রয় দেওয়া হবে ঠিকই কিন্তু দেশটা যে জায়গায় এখন এসে পড়েছে তাতে আরও অন্যায় হবে। এই দুর্বল অসহায় মেয়েটাকে যুদ্ধ করতে ঠেলে দিলে। তুমি ওর বাবাকে বলো, এখান থেকে ওকে সরিয়ে দিক আর কোর্টকে জানাক মামলা আর চালাতে চায় না।”
হিতু ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। প্রিয়ব্রত একদৃষ্টে টেবিলের দিকে চোখ রেখে দাঁড়িয়ে। চিন্তা করার উপাদানগুলোকে সে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে যতই সাজাবার চেষ্টা করছে ততই এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। হিতুকে সে আসলে বলতে চেয়েছিল, নীচের ঘরে নিরুকে কয়েকটা দিন থাকতে দেবে, এতে ওর আপত্তি আছে কি না?
অথচ কথায় কথায় সে পবিত্রতা, শুচিতা এনে ফেলে অপরাধীদের শাস্তি পাওয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ল! হঠাৎ সে কেন দুষ্টের দমনের জন্য উত্তেজিত হল তার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ সে খুঁজে পাচ্ছে না। এতে যে খুদিকেলোর গোটা পরিবারটাই বিপদে পড়বে, এই বোধটাই হারিয়ে ফেলে সে অবাস্তব কথাবার্তা বলল। ছোটোবেলা থেকে শুনে শুনে হয়তো অন্যায় সম্পর্কে একটা প্রতিবাদ তার মধ্যে জমা ছিল সেটাই এখন উছলে উঠেছে কিংবা তার নিজের অন্যায়ের গ্লানি কাটিয়ে উঠতে। ফণী পালের মারা যাওয়াতেই কি তার সাহস বেড়ে গেল? এটাই কি নতুন জগতে তার বেরিয়ে আসা?
যখন হিতু বলল, ”বহু অপরাধই চাপা থাকছে তাই শাস্তি পায় না”, তখন বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠেছিল। প্রিয়ব্রত জানে সারাজীবনই তার বুক মাঝে মাঝে ছ্যাঁৎ করবে। তিনকড়ি কেন বেঞ্চে জায়গা বদলাতে চেয়েছিল বা নিরুর শেষবারের চাহনিতে কী কথা বলা ছিল, কোনোদিনই সে যেমন জানতে পারেব না, তেমনি বাসে কাল নিরুর পাছা তার ঊরুতে যখন চাপ দিচ্ছিল তখন তার শরীর মঙ্গলার স্মৃতি থেকে কতটা সরে গেছিল, তাও সে বলতে পারবে না।
শোবার আগে আলো নিভিয়ে সে জানলায় দাঁড়াল। আকাশ ঘোলাটে। চাঁদ যে উঠেছে সেটা বোঝা যাচ্ছে বাড়িগুলোর এবড়ো-খেবড়ো মাথার ছায়া থেকে। একটু পরে নিরুদের ছাদটার অন্ধকার আবছা হবে। ওখানে কেউ দেয়ালে ঠেস দিয়ে যে বসে নেই, প্রিয়ব্রত তা জানে।
বিছানায় শুয়ে সে ঠিক করল, কাল সকালেই সে খুদিকেলোর সঙ্গে কথা বলতে ওদের বাড়িতে যাবে। ওকে বলবে: আজ কোর্টে যাসনি, ডুব মেরে দে। পুলিশ খুঁজতে এলে বলবি মেয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। কোথায় গেছে কেউ তা বলতে পারছে না।…আর শোন, নিরুকে আমার কাছে পাঠিয়ে দে। ওকে আমি লুকিয়ে রেখে দেব। কাকপক্ষীতেও জানতে পারবে না।
আমার ছেলে হিতু, লেখাপড়ায় ব্রিলিয়ান্ট, অত্যন্ত ম্যাচিওরড, আমাকে ভালোবাসে খুব। ওর জন্যই আমি আর বিয়ে করিনি। আমার এই স্যাক্রিফাইসটা ওকে বোধ হয় খোঁচায়। তাই নিরু সম্পর্কে ও আপত্তি করবে না। ও আমাকে কখনো তুঙ্গে দেখেনি। ও আমাকে মদের মতো করে জীবনটাকে চুমুকে চুমুকে খেতে দেখেনি।…এসব কথা থাক, মোদ্দা ব্যাপার হল, নিরুকে আমি লুকিয়ে রেখে দেব। ও আর কখনো রেপড হবে না, খুন হবার ভয় পাবে না…খুদিকেলো বি প্র্যাক্টিক্যাল, এতগুলো মেয়েকে তোর পার করতে হবে!…ফণী পাল মরে গেছে, আমি এখন মুক্ত, আমি এখন নিজেকে ঝাঁকাতে পারি। ছাব্বিশ বছর ধরে একটা খোলসের মধ্যে ঢুকে আছি। এবার ওটা আমি ভাঙব। তুই আমায় একটু সাহায্য কর…নিরুকে পাঠিয়ে দে।…আমার কাছে বেঁচে থাকবে…নিরু শব্দ করে দরজা বন্ধ করেনি, আমি নিশ্চিন্ত হতে পারছি না। কাঠের সঙ্গে কাঠের ধাক্কা লাগার শব্দটা খুব দরকার।…
৪
”খুদিকেলো বাড়িতে নেই?”
প্রিয়ব্রত প্রশ্নটা দ্বিতীয়বার করল। ঢোলা ময়লা ফ্রক পরা মেয়েটিও দ্বিতীয়বার বলল, ”বাবা বেরিয়ে গেছে।”
”আজই তো কোর্টে কেস উঠবে?”
”জানি না।”
”আচ্ছা তোমার দিদি, নিরুকে একবার ডেকে দাও। বলো পিছনের বাড়ির প্রিয়কাকা ডাকছে।”
”অরু, ভেতরে একবার আয় তো।”
স্ত্রীলোকের তীক্ষ্ন স্বর, প্রায় ধমকের মতোই বাড়ির ভিতর থেকে বেরিয়ে এল। মেয়েটি মুখ ফিরিয়ে পিছনে কাউকে দেখল তারপর প্রিয়ব্রতর মুখের দিকে তাকিয়ে আলতোভাবে দরজার পাল্লাটা ভেজিয়ে দিল। বাজারের থলিটা চার ভাঁজ করে মুঠোয় চেপে সে অপেক্ষা করতে লাগল। ভিতরে চাপা গলায় কেউ কথা বলছে, বোধ হয় খুদিকেলোর বউ-ই হবে।
ভেজানো পাল্লাটা সন্তর্পণে আবার খুলে গেল। মেয়েটি ধীর গলায় বলল, ”দিদি বাড়ি নেই। বাবা ওকে নিয়ে ভোরেই বেরিয়ে গেছে।”
পাল্লাটা বন্ধ করে দিচ্ছিল, প্রিয়ব্রত ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, ”এক্ষুনি ফিরবে কি?”
”তা কিছু বলে যায়নি।” মেয়েটির দুটি চোখ আর পায়ের একটা পাতা শুধু দুই পাল্লার মাঝে দেখা যাচ্ছে। তাকে সন্দেহ করছে। আজকের দিনটা এই বাড়ির লোকেদের কাছে খুবই ভয়ের। যে-কোনো অপরিচিতই এদের কাছে সন্দেহজনক। তাই বলে কি তাকে ভেবেছে ‘ওদের’ দলেরই কেউ? কিন্তু সে তো পিছনের বাড়ির লোক। এই মেয়েটি ছাদ থেকে তাকে নিশ্চয়ই দেখেছে।
”দরকারি একটা কথা ছিল,…আচ্ছা, পরে আসব। দিদিকে বোলো আমি খোঁজ করছিলাম।”
পাল্লা বন্ধ হয়ে গেল নিঃশব্দে। দু’পাশে দেয়াল, আর নীচু ছাদের সুড়ঙ্গটা দিয়ে প্রিয়ব্রত রাস্তার দিকে তাকাল। ঝকঝকে রোদের মধ্য দিয়ে মানুষ হাঁটছে। সাইকেল গেল, রিকশা গেল। অথচ গলির মধ্যে কোনো শব্দ নেই।
