প্রিয়ব্রত অবাক। দড়ি খুলে হিতু প্রথম বাক্সর ঢাকা তুলে বলল, ”ফ্রায়েড চিলি চিকেন। খেয়ে দ্যাখো।”
”হঠাৎ!”
”বাজার-টাজার হয়নি, মাছও নেই, নিরিমিষ খেতে কি ভালো লাগে? আসার সময় তাই চাইনিজ রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়লুম আর তোমার জন্যও কিনে নিলুম…লাস্ট কবে চাইনিজ খেয়েছ?”
”কোনোদিনই খাইনি।”
তিলু প্লেট এনে দিয়েছে। হিতু দুটো টুকরো প্লেটে রেখে, চোখ সরু করে প্রিয়ব্রতর দিকে তাকাল। ”কোনোদিনই খাওনি? এতে তো গোমাংস-টাংস নেই!”
প্রিয়ব্রত অপ্রতিভতা কাটাতে বলল, ”সেজন্য নয়, আসলে ডাল ভাত ছাড়া আর কিছু ভালো লাগে না। চপ কাটলেটও খাই না।”
দ্বিতীয় বাক্সটা খুলে হিতু বলল, ”আমেরিকান চপ সুয়ে। আর এটায় আছে প্রন ফ্রায়েড রাইস। যদি এখন না খাও তাহলে ফ্রিজে তুলে রাখুক, কাল সকালে গরম করে খাওয়া যাবে।…অ্যাই তোর খাওয়া হয়েছে?”
তিলু মাথা নাড়ল।
”থালা নিয়ে আয়। কাল সকালে কিন্তু পাবি না।”
তিলু থালা আনতে বেরিয়ে যেতেই প্রিয়ব্রত বলল, ”একটা কথা ছিল। তিলুর সামনে বলব না।”
”কী কথা? দাঁড়াও, এগুলো আগে ফ্রিজে তুলে দিয়ে আসি।”
প্রিয়ব্রত অপেক্ষা করল। হিতু আজ মাইনে পেয়েছে। দু’ বছর আগে প্রথম মাইনে পেয়ে রাবড়ির বড়ো একটা ভাঁড় হাতে নিয়ে এই ঘরে ঢুকেছিল। ‘হাফ কেজি, সব তোমায় খেতে হবে।’ প্রিয়ব্রত আশা করেছিল মাইনের পুরো টাকা হিতু তার হাতে তুলে দেবে। অন্তত প্রথমবার তাই করুক। সে নিজেই তখন বলবে, ‘আমাকে দিচ্ছিস কেন, নিজের কাছেই রাখ! যদ্দিন আমি চাকরি করছি তোকে সংসারের জন্য কিছু দিতে হবে না।’ কিন্তু হিতু টাকা দেয়নি। বলেছিল, ‘তোমার জন্য আগে একটা পোর্টেবল ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট টিভি কিনব, চারটে ইনস্টলমেন্টে শোধ দেব। তারপর ইনস্টলমেন্টে একটা ফ্রিজ।’ সে গভীর সুখ পেয়েছিল ‘তোমার জন্য’ কথাটিতে।
ছেলে তার কথা ভাবে, তার জন্য অনুভব করে এটা তাকে বিচলিত করেছিল। ভৌমিক বলেছিল, ‘অতুলদা আপনি ভাগ্যবান। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়া তো আমার শালার ছেলেও। বাপের গলব্লাডার অপারেশন করাল বাঙ্গুরে পেয়িং বেডে রেখে। কেন, একটা ভালো নার্সিং হোমে রেখে তো করাতে পারত! এস বি গ্রুপে অফিসার, মাইনে পাচ্ছে সাড়ে চার হাজার আর আপনার ছেলে তো দেড় হাজার। হার্ট, বুঝলেন অন্তঃকরণ, এটাই আসল জিনিস। অথচ বাপ কি কষ্ট করেই না ছেলেকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছে।’
হিতুর অন্তঃকরণ সত্যিই ভালো। বাবার দুঃখকষ্ট ও বুঝতে চায়, নইলে বলবে কেন…কিন্তু সবটা কি বোঝে? জীবনের হিসেবনিকেশ করতে বলছে। ওর ধারণা এখন নাকি তার কম্প্যানিয়ান চাই। কম্প্যানিয়ান তো তার ছিলই-ফণী পাল!
”বলো।” হিতু ঘরে ঢুকেছে।
”পরিচিত একটা লোকের বাড়িতে আজ গিয়েছিলাম। বহুদিনের চেনা। বলতে গেলে ওঁর চেষ্টাতেই চাকরিটা পেয়েছি। অভাবী লোক মাসে মাসে কিছু সাহায্য দিতুম, অল্প টাকাই।”
হিতুর চোখে কোমল দরদ। বাবার সম্পর্কে ওর ধারণাটাই ফুটে উঠেছে। প্রিয়ব্রতর মনে হল, ছেলের কাছ থেকে শ্রদ্ধা পাওয়ার জন্য একটু মিথ্যা বললে দুজনের কারুরই ক্ষতি হবে না। ব্যাপারটার বেশিরভাগই তো সত্যি। ফণী পালের চেষ্টাতেই তো এই চাকরি, মাসে মাসে টাকা দেওয়াও সত্যি। লোকটার অভাব ছিল বলেই ব্ল্যাক মেইল করত।
”গিয়ে শুনলাম ক্যানসারে দিন কুড়ি আগে মারা গেছে।”
”ওহহ!”
হিতুর মতো তার চোখেও এখন বিষাদ ছড়াল। যে-কোনো লোকের মৃত্যুই দুঃখের। কিন্তু ফণী পালের কথা বলার জন্য তো সে হিতুকে ডাকেনি।
”লোকটার কে কে আছে?”
”বউ, দুই ছেলে, নাতি-নাতনি।”
”তোমার মন খারাপ লাগছে?”
”হ্যাঁ।”
”শুয়ে পড়ো।”
”হিতু, ওই মেয়েটার কি হবে?”
প্রশ্ন এবং বিস্ময় নিয়ে হিতুর চোখ-মুখ কুঁচকে গেল। ”কোন মেয়েটা?”
”খুদিকেলোর মেয়ে। কাল কোর্টে ওর কেসটা উঠবে। ও যাবে কি যাবে না সেটা এখনও ঠিক হয়নি। যদি যায়, যদি কোর্ট ওকে আসামীদের শনাক্ত করতে বলে তাহলে কি শনাক্ত করবে? করলে, আমার ধারণা ওরা প্রতিশোধ নেবেই।”
”ওকে খুন করবে?”
প্রিয়ব্রত মাথা সামনে ঝাঁকিয়ে বলল, ”খুদিকেলোকেও পথে বসাবে দোকানটার সর্বনাশ করে, তার মানে পাঁচ-ছ’টা লোক ভিখিরি হয়ে যাবে।”
”তাহলে শনাক্ত করার দরকার কি, এতগুলো লাইফ যখন ইনভলভড? তা ছাড়া রেপিং তো আর পৃথিবীতে এই প্রথম ঘটল না! রেপড হয়েছে তো হয়েছে, তাতে কি এমন এসে গেল? মেয়েরা স্বামীর হাতেও তো রেপড হয়। এখানে নয় একজনের বদলে তিনজন, এই তো তফাত! প্রেগন্যান্ট হয়েছে কি? আট মাস কেটে গেছে…কিছুই হয়নি।”
”হিতু এটা একটা সম্মান হারানোর ব্যাপার। একটা অল্পবয়সি মেয়ের ইজ্জত…পবিত্রতা…কেউ জোর করে কাউকে নরকে ঘুরিয়ে আনলে তার শরীরে ময়লা লাগে, আজীবন সে দুর্গন্ধ পায়। তার জীবনটাই বিষিয়ে যায়। সারাজীবন নিজেকে অশুচি মনে করে।”
”মামলায় জিতলে, তিনটে লোকের জেল হলেই অমনি দুর্গন্ধ উঠে যাবে, শুচি হয়ে যাবে? কী আজেবাজে কথা বলছ তুমি?”
”তাই বলে অপরাধী শাস্তি পাবে না?”
”নিশ্চয় পাওয়া উচিত। শাস্তির ভয় না থাকলে তো মানুষ যা খুশি তাই করতে শুরু করবে। বহু অপরাধই চাপা থাকছে তাই শাস্তি পায় না কিন্তু যেগুলো জানা যাচ্ছে, প্রমাণিত হচ্ছে সেগুলোর শাস্তি হওয়া নিশ্চয় উচিত! কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাপারটা তো অন্যরকম। বাস্তব বিচার করো, ফলাফলটা কী হতে পারে সেটা ভেবে তবেই পা বাড়াও। তিনটে লোককে শাস্তি দিতে গিয়ে আরও পাঁচ-ছ’টা মানুষ মরবে! এটা কি কোনো কাজের কথা হল?…বি প্র্যাক্টিক্যাল।”
