এখন মঙ্গলা আর ফণী পাল দুজনেই মৃত। হালকা বোধ করলেও প্রিয়ব্রত বিষণ্ণতার স্পর্শ পেল। তার হাঁফছাড়ার অংশীদার হতে পারত মাত্র একজনই…দুজন একসঙ্গেই হয়তো বলে উঠত, ”ভগবান আছেন।”
”কিছু বললেন?” একতলা থেকে জল আনতে সিঁড়ির বালতি হাতে তিলু দাঁড়িয়ে পড়েছে।
”আলুর দমটা খুব ভালো হয়েছে, শিখলি কোথায়?”
তিলুর মাড়ি বার করা হাসি দেখবে না বলেই প্রিয়ব্রত তাকাল না।
‘তাও তো গরমমশলা কম পড়েছে। দোতলার বউদির কাছে চাইতে গেলুম, বলল নেই। ছিল ঠিকই আসলে দেবার ইচ্ছে ছিল না।”
”তুই জানলি কী করে?”
”আমি লোক চিনি।”
”আমাকে চিনিস? বলতো আমি কেমন?”
”পরে বলব।” তিলু সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ নেমে গিয়ে আবার উঠে এসে গলা নামিয়ে বলল:
”সন্ধেবেলায় পেছনের বাড়িতে খুব ঝগড়া হচ্ছিল।”
”কোন পেছনের বাড়ি?”
”কাল যে মেয়েটা এসেছিল, ওর গলা আর ওর মায়ের গলা পেলুম। ঠিক বুঝতে পারলুম না কী নিয়ে ঝগড়া। একবার শুনলুম ‘মরি মরব তোমাদের কি?’ মা’টা বলল, ‘দূর হ দূর হ, আমার আরও চারটে মেয়ে আছে।’ আমি পাঁচিলে দাঁড়িয়েছিলুম। তারপর দেখি অন্ধকার ছাদে এসে একজন সিঁড়ির দরজার দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসল, বোধহয় মেয়েটাই।”
তিলু নীচে নেমে গেল। ও কেন গলা নামিয়ে বলার দরকার বোধ করল? প্রিয়ব্রতর মুখের মধ্যে আলুর টুকরো হঠাৎ বিস্বাদ হয়ে উঠল। তিলু নাকি লোক চেনে! তাকে তাহলে কীভাবে চিনেছে? নিরুর সামনে তার গলার স্বরে, চাউনিতে বা বসার ভঙ্গির মধ্যে এমন কিছু কী প্রকাশ হয়েছিল যাতে তিলুর মনে হতে পারে…।
কী মনে হতে পারে?
প্রিয়ব্রতর কপালে হালকা ঘাম ফুটে উঠল। কাল সে স্বাভাবিকভাবেই তো তাকিয়ে ছিল নিরুর দিকে! রেপ, খুনের ভয়, প্রাণের মায়া, এইসব নিয়ে কথা বলার সময় গলার স্বরে অস্বাভাবিক কিছু ছলকে ওঠা কি সম্ভব? তবে একতলায় সে ওর কাঁধে হাত রেখেছিল কিন্তু তিলু তখন ওখানে ছিল না। হ্যাঁ, সে রেখেছিল। নিরু হাতটা তখন চেপে ধরে বলেছিল, ‘এই ঘরেই আমি থাকব, থাকতে ঠিক পারব।’
তারপর হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে খিল খুলেছিল। তার আগে সে বলেছিল, ‘হয় না হয় না, তুমি এখনও ছেলেমানুষ-।’ সে ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নেভাল। নেভাবার আগে নিরুর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। নিরুও তাকিয়ে কিন্তু ওর চাহনিতে কোনো কথা বলা ছিল না।
খাবার শেষ না করেই প্রিয়ব্রত উঠে পড়ল। তিলু জল নিয়ে এসেছে।
”বিকেল থেকে অম্বল হচ্ছে, আর খাব না।”
ঘরের আলো না জ্বেলে সে জানলায় দাঁড়াল। এখনও কি নিরু দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে আছে? অন্ধকার ছাদে সে খুঁজল। দু-তিন হাত লম্বা একটা ঘন গাঢ় অন্ধকার ছাদের মাঝখানে যেন সে দেখতে পেল। নিরু কি শুয়ে রয়েছে?
গরাদে মুখ লাগিয়ে প্রিয়ব্রত তার দৃষ্টিকে তীক্ষ্নতার শেষ সীমায় নিয়ে গেল। ওটা কি কোনো মানুষ? নাকি একটা কাপড় পড়ে রয়েছে? ঘরের আলো জ্বাললে তার আভায় ছাদের অন্ধকার কিছুটা ফিকে হবে। জ্বালব?
কিন্তু সত্যিই যদি নিরু হয়? ঘরের আলোর দিকে নিশ্চয় তাকাবে। চোখ দুটো কি দেখতে পাওয়া যাবে? একটা কিছু ওর চাহনিতে নিশ্চয় থাকবে। আর সেটা তার জানা দরকার।
”নিরু, নিরু।” অস্ফুটে সে ডাকল। গলার স্বর গরাদ ছাড়িয়ে, পগাড়ের মাঝখান পর্যন্ত পৌঁছল না।
”নিরু, নিরু।” আবার সে ডাকল, আরও মৃদু স্বরে, প্রায় মনে মনে।
‘মরি মরব, তোমাদের কি?’ কেন? কেন, একথা বললে? বাঁচার উপায় তো রয়েছে। পালাও, কোর্টে যেয়ো না, তুমি হাজির না হলে ওদের শনাক্ত করবে কে? মামলা খারিজ হয়ে যাবে, তুমিও বেঁচে যাবে। ওরা কথা দিয়েছে যখন, বদমাস হলেও নিশ্চয় কথা রাখবে। দু হাজার টাকা দিক বা না দিক, আগে তুমি নিজেকে বাঁচাও।
নিরু, তোমার শরীর কিছুক্ষণ যন্ত্রণা ভোগ করা ছাড়া কিছুই তো হারায়নি। আমাকে দেখ। আমার মন, আমার আত্মা, ছাব্বিশ বছর ধরে নরক বাস করেছে, আর তুমি মাত্র আটমাস! তোমার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ অটুট রয়েছে, তুমি সক্ষম, তোমার মধ্যে বাঁচার ইচ্ছেও ভীষণ, আমি ছাব্বিশ বছর ভয়ের চাপ সহ্য করেছি। এখন আমার সামনে আর একটা জগৎ অপেক্ষা করছে, তোমার সামনেও তাই। আমার ফণী পাল সরে গেছে, তোমার বুকে যে পাষাণ সেটা নামিয়ে ফেল।
নিরু, কাল তুমি কোর্টে যেয়ো না। শুধু তুমিই নও, তোমার বাবা, মা, তোমার চারটে ছোটোবোনও বিপদে পড়বে। তাদের কথাটাও ভাব। পুলিশ যতই তোমাকে সাহস যোগাক শেষ পর্যন্ত ওরা কিন্তু তোমায় রক্ষা করতে পারবে না।…আমিও কি পারি?
কলিং বেল বাজল।
”যাই-ই-ই।”
তিলুর পায়ের শব্দ নীচে নামছে। প্রিয়ব্রত ঘরের আলো জ্বালল। টেবিলে ঝুঁকে ঘড়িতে সময় দেখল। এগোরোটা বাজতে কুড়ি। হিতু আজ তাড়াতাড়ি ফিরেছে, বোধহয় কাল বেশি রাত করে ফেরাটা পুষিয়ে দিতে।
তিনতলায় থামল পায়ের শব্দটা। প্রিয়ব্রত তাকিয়ে আছে দরজার দিকে। তার মনে হচ্ছে হিতু দরজা দিয়ে একবার উঁকি দেবে। চোখাচোখি হলে মুখ সরিয়ে নিতে পারবে না। তখন সে কথাটা বলবে।
”চেষ্টা করলুম তাড়াতাড়ি ফেরার, তোমার খাওয়ার আগেই যাতে পৌঁছতে পারি, পারলুম না।”
হিতুর হাতে ঝুলছে দড়ি বাঁধা তিনটে কাগজের বাক্স। টেবিলের উপর রেখে সে চেঁচিয়ে বলল, ”তিলু একটা প্লেট নিয়ে আয়…চাইনিজ। এখনও বোধ হয় গরম আছে। না হলে গরম করে নিতে হবে।”
