প্রিয়ব্রত বাড়ি ফিরল দু’ ঘণ্টা পর। ততক্ষণ সে হেঁটেছে। এ-রাস্তা ও-রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে সে থমকে দাঁড়িয়েছে, নিজের সঙ্গে কথা বলেছে। শূন্য চোখে তাকিয়ে আলো, দোকান, যানবাহন, লোকজনের ভাবভঙ্গি, কথাবার্তা শুনেছে, দেখেছে আর ভেবেছে, ফণী পালের অস্তিত্ব মুছে যাওয়ার জন্যই কি এই পৃথিবীটা ঝকঝকে উজ্জ্বল দেখাচ্ছে? এটাই কি তার জীবনের সেরা মুহূর্ত? প্রিয়ব্রত তখন আনমনে ঘড়ি দেখেছিল।
কলিংবেল বাজিয়ে সে অপেক্ষা করে। ছাদ থেকে তিলুর গলায় ”কে এ এ”, শুনে সে, ”আমি” বলার পরই ভেবেছিল, আর একটু জোরে, আরও ভরাট স্বরে ‘আমি’ বললেই ঠিক হত। এখন সে তীব্র তীক্ষ্ন স্বরে কথা বলতে পারার মতো অবস্থায় এসেছে। অতুলচন্দ্র ঘোষকে ধরিয়ে দেবার জন্য আর কেউ জীবিত নেই।
দরজা বন্ধ করার জন্য পাল্লাটা ধরে তিলু দাঁড়িয়ে ছিল। প্রিয়ব্রত তার পাশ দিয়ে ভিতরে যাবার সময় বলল, ”কেউ এসেছিল?”
কারুরই আসার সম্ভাবনা নেই, তবু সে বলল। বাবা রোজ এইভাবে বলতেন অফিস থেকে ফিরেই। আজ সে বাবাকে অনুকরণ করল!
”না, কে আবার আসবে!”
”কেন আসতে পারে না? আমার কি বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন নেই?”
তিলুর মুখভঙ্গি দেখে ওকে তার চড় কষাতে ইচ্ছে করল। হিতু লাই দিয়ে মাথায় চড়িয়েছে। তালাবন্ধ ঘর দুটোর পাশ দিয়ে যাবার সময় সে থমকে দাঁড়াল।
”অ্যাই, এদিকে আয়।…বলেছিলুম তালা দুটোয় মাঝে মাঝে কেরোসিন তেল দিবি, দিয়েছিলি?”
”এই তো ক’দিন আগে ঘর খুলে-”
চোপ, মিথ্যে কথা বলবি না।” প্রিয়ব্রত হাঁফ ছাড়ল চেঁচিয়ে ওঠার সুযোগটা পেয়ে। কীরকম মরচে ধরেছে দেখেছিস? কালকেই তেল ন্যাকড়া দিয়ে ঘষে ঘষে তুলবি।…শুধু খাওয়া আর ঘুম আর টিভি!”
সিঁড়ির আলোটা নেভানো। একতলারটা জ্বালা থাকলে ওটার জ্বালার আর দরকার হয় না। তবে একফালি আলো এখন সিঁড়ির মাথায় দেখে সে বুঝল অশোকবাবুদের দরজা খোলা। পা টিপে সে উঠতে লাগল।
বউটি কোমর থেকে শরীরটা নুইয়ে ন্যাতা দিয়ে মেঝে মুছছে। বুকের কাপড় ঢিলে হয়ে কাঁধ থেকে ঝুলে রয়েছে, ব্লাউজ পরা নেই। প্রিয়ব্রত পরিষ্কারভাবেই অনাবৃত পাঁজর, বগলের চুল আর স্তন দেখতে পেল। বড়োজোর সেকেন্ড চার-পাঁচ। চোখ সরিয়ে নেবার আগেই বউটি চমকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকাল। চোখের উপর দিয়ে ওর বিস্মিত চাহনিটা ঘষে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই প্রিয়ব্রত তিনতলার সিঁড়ির দিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে পা বাড়াল। সিঁড়িটা অন্ধকার হয়ে গেল তখুনি। দরজাটা তো বন্ধ করেই রাখা উচিত ছিল!
কি ভাবল বউটি!…কিন্তু আমার কোনো দোষ আছে কি? সিঁড়ি দিয়ে লোক ওঠানামা করবেই, তাহলে দরজা খুলে আদুড় গায়ে অমন করে ঝুঁকে পড়া কেন? আমি এ ব্যাপারে পরিষ্কার।
ঘরে এসে জামার বোতাম খুলতে খুলতে সে মঙ্গলার ছবির দিকে তাকাল। কতদিন হল…বারো বছর, কোনো মেয়েমানুষের বুক দেখিনি। মঙ্গলাই প্রথম আর শেষ। এই খাটেই তারা তিনজন শুত, মাঝখানে হিতু। তারা অপেক্ষা করত হিতুর ঘুম গাঢ় হবার জন্য। অন্ধকারে সন্তর্পণে তারা কাজটা সেরে ফেলত। মঙ্গলা নগ্ন হয়নি কখনো, এটা চিন্তাই করতে পারত না। এখন সে প্রায় ভুলে গেছে নারীদেহের বিভিন্ন জায়গা স্পর্শ করার অনুভবটা কেমন। চুমুর স্বাদ, শরীরের গন্ধ সম্পর্কে কিছুই আর তার স্মৃতিতে ধরা নেই।
মঙ্গলা একটু বেশি নাদুসনুদুস ছিল, দোতলার বউ তা নয়। গ্রামের মেয়ে খাটিয়ে শরীর। খুব কমই ওকে ঘর থেকে বেরুতে দেখেছে। অবশ্য সিঁড়ি দিয়ে তার ওঠানামা তো বাজার আর অফিস যাওয়ার সময়, এর মধ্যে কতটুকুই বা দেখার সুযোগ পাওয়া যায়!
জামাটা চেয়ারের পিঠে ছুঁড়ে দিয়ে প্রিয়ব্রত খাটে বসল। ফণী পাল একদিনই শুধু এই ঘরে এসেছিল। ওই চেয়ারে বসে কথা বলেছিল। মঙ্গলা তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল পাথরের মতো। ওর মুখটায় কী যেন একটা ব্যাপার ছিল…সেটা এত বছর পর সে কাল নিরুর মুখে দেখতে পেয়েছে।
”তিলু খিদে পেয়েছে রে, রান্না হয়েছে?”
”হয়েছে…দিচ্ছি।”
মঙ্গলার সঙ্গে এই মেয়েটার সাদৃশ্য মুখের একটা অভিব্যক্তিতে ছাড়া আর কিছুর মধ্যে সে খুঁজে পাচ্ছে না। অসহায়, করুণ ঝাপসা অন্ধকার ভেদ করে জীবনের দিকে তাকাবার চেষ্টায় হাঁচড়পাচড়ের মতো ভাব। যেন গলা টিপে ধরায় চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। তারপরই একটা টিনের মুখোশ এঁটে বসল। যন্ত্রণার চাপে মুখোশটা দুমড়ে যাচ্ছে। কতক্ষণের জন্য ওরা দুজন একই মুখ পেয়েছিল, দশ সেকেন্ড?…দশ মিনিট?
তারপরও মঙ্গলা জীবনের নিয়মকানুন, অভ্যাসগুলো পালন করে গেছে। রান্নায় নুন বেশি হয়েছে শুনে অপ্রতিভ মুখে তাকিয়েছে,…বাজার থেকে ফেরার পর ‘পায়ের কাদা ধুয়ে ঘরে ঢুকবে’ বলেছে,…মা মারা যাওয়ার খবর পেয়েই ফুঁপিয়ে উঠেছে,…উঠোন নোংরা রাখার জন্য ভাড়াটের সঙ্গে ঝগড়া করেছে…ঘুমন্ত ছেলের মাথার উপর দিয়ে একটা হাত এগিয়ে এলে সেটা আঁকড়ে বুকের উপর চেপে ধরেছে…প্রিয়ব্রতর এখন ছাড়াছাড়া মনে পড়ল, অথচ এইভাবে দিন কাটানোর মধ্যে একবারও ফণী পালের নাম তারা উচ্চচারণ করেনি। কিন্তু পয়লা তারিখে তিনশো টাকা কম হাতে পাওয়ার মুহূর্তে মঙ্গলার মনে ঢাকনা সরে গিয়ে একটা অন্ধকার গর্ত বেরিয়ে পড়ত না কি? নিশ্চয় পড়ত, স্বভাবটা ওর চাপা ছিল।
