আমি কি মুক্তি পেলাম! লোকটা যা বলল, সেটা কি সত্যি? আমি কি বিশ্বাস করব ওর কথা? ছাব্বিশ বছর ধরে বয়ে বেড়ানো অতুল কি কাঁধ থেকে এবার নামবে?
”কুড়ি বাইশ দিন আগে, ক্যানসারে মারা গেছেন। এই গলির মধ্যে ডানদিকে, প্রথম, দ্বিতীয়, থার্ড বাড়িটা। মাস চারেক আগে ধরা পড়েছিল, তারপর এই সেদিন আর জি করে ভর্তি হয়ে চার দিনের দিনই মারা গেলেন। পেটে হয়েছিল, স্টম্যাক ক্যানসার। শ্রাদ্ধ ট্রাদ্ধও তো হয়ে গেছে।”
লোকটা ব্রাশ দিয়ে আবার গালে ফেনা লাগাতে শুরু করল। এতবড়ো একটা খবর দিল অথচ কী নির্বিকার মুখ! ওর কি বিকার ঘটার কোনো কারণ আছে যেমন তার রয়েছে!
চার মাস ধরে ক্যানসার অথচ ফণী পাল একই রকম মুখ, একই হাঁটা, গলার স্বর, একই চাহনি নিয়ে তার সামনের টেবিলে এসে বসেছে। একবারের জন্যও তাকে টের পেতে দেয়নি! যে পকেটে নোট ভরা খামটা ঢোকাত সেই পকেটেই চার মাস ধরে ছিল যমের পরোয়ানা!
আমি মুক্ত! ভগবান কি কাল তাহলে প্রার্থনা শুনেছিলেন? কিন্তু ক্যানসার তো চার মাস আগেই ওর পেটে ঢুকে গেছিল! কুড়ি বাইশ দিন আগেই সে মুক্তি পেয়ে গেছে, অথচ সে জানত না! লাক, ভাগ্য। খোঁজ নিতে না এলে তো আরও কতদিন সে-
”ডানদিকে, থার্ড বাড়িটা?”
”হ্যাঁ।”
দু-চার পা এগিয়েই সে শুনতে পেল নাপিত বলছে, ”মরে গিয়ে ভালোই হয়েছে, এমন রোগে তো…নিজেও কষ্ট পাবে অন্যকেও কষ্ট দেবে।”
ছাব্বিশ বছর কষ্ট দিয়েছে একজনকে, তার সুখ শান্তি হরণ করেছে…দগ্ধে দগ্ধে তার জীবন খাক করে দিয়েছে। ফণী পাল তুমি যে কি উপকার করলে! নিজে মরে আমাকে বাঁচিয়ে তুললে। একটা নতুন জীবন এবার চাই, যা কিছু হারিয়েছি…প্রিয়ব্রতর ইচ্ছে করছে চিৎকার করে বলতে, সব আমি ফিরে পেতে চাই।
তৃতীয় বাড়ির আধখোলা সদর দরজা দিয়ে সরু দালানটার শেষ প্রান্তে বাচ্চচা কোলে এক স্ত্রীলোককে সে দেখতে পেল। পা দিয়ে জল সরিয়ে উঠোনে ফেলছে। বাঁদিকের যে ঘরে সে আর নন্তু বসেছিল সেটার দরজা খোলা। ঘরের যেটুকু অংশ চোখে পড়ল তাইতে সে বুঝল কোনো পরিবার সেখানে বাস করছে। সে খুট খুট করে কড়া নাড়ল।
”কে?” বাঁদিকের ঘর থেকে বেরিয়ে এল শালোয়ার-কামিজ পরা এক কিশোরী। ”কাকে চাই?”
”আচ্ছা এটাই তো ফণী পালের বাড়ি?”
”হ্যাঁ, উনি তো মারা গেছেন!”
”কবে? কী হয়েছিল ওনার?” তাহলে সত্যিই! প্রিয়ব্রত উত্তেজনা দমিয়ে জিজ্ঞাসা করল।
”ক্যানসার হয়েছিল। তা তিন হপ্তার মতো হল মারা গেছেন।”
”ফণী পাল, যাঁর হাতের আঙুলে তিনটে আংটি, হাতে লাঠি নিয়ে চলাফেরা করত, বয়স হল গিয়ে পঁয়ষট্টির মতো…সেই লোকই তো?” নিশ্চিত হয়ে নেওয়া দরকার। প্রিয়ব্রত জেনে নিতে চায় এই নামে দ্বিতীয় কোনো লোক এই বাড়িতে মরেনি।
”হ্যাঁ!” মেয়েটির বিস্মিত হওয়া দেখে প্রিয়ব্রত কিছুই মনে করল না। এভাবে কেউ জিজ্ঞাসা করলে তো হওয়ারই কথা।
”কে কে আছেন ওঁর?”
”বউ, দুই ছেলে। ছেলের বউয়েরা, নাতি নাতনিরা…আপনি দোতলায় যান, এই ঢুকেই বাঁদিকে সিঁড়ি, ওনারা ওপরে থাকে।”
”না না, এই যথেষ্ট।”
প্রিয়ব্রত ফিরে আসার সময় একবার মুখ ফিরিয়ে তাকাল। মেয়েটি বাড়ির ভিতর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে এসে তাকে দেখছে। দেখবেই তো! একটা লোক কথা বলতে বলতে হঠাৎ চলে গেল, সে তো কৌতূহলের পাত্র হবেই। তাই হব। সবাইকে অবাক করে দেব। অতুল ঘোষ শুধু অফিসের হাজিরা খাতায়, মাইনের পে-স্লিপে, ভৌমিকের ‘অতুলদা’ ডাকের মধ্যে যেমন ছিল তাই থাকবে বাড়ি পর্যন্ত ওকে আর আসতে হবে না।
পাড়ায়, বাড়িতে, বাজারে, পথে, বাসে ক’জন তার নাম ধরে ডাকে? সে মনে করতে পারল না শেষ কবে সে ‘প্রিয়’ ডাক শুনেছে। কারুর সঙ্গেই তার এখন ডেকে কথা বলার মতো সম্পর্ক নেই। পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে দেখাই হয় না, হলেও ঠোঁটটা টেনে তারা পাশ কাটিয়ে চলে যায়। শুধু খুদিকেলোর সঙ্গে কালই প্রথম কথা বলল আর বাজারে বীরুদার সঙ্গে। আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে কালেভদ্রে দেখা হয়। তাদের মধ্যেও তার নাম ধরে ডাকার বয়সিদের সংখ্যা কমে আসছে। প্রিয়ব্রত নিরাপদ, অতুলেরও ভয় পাবার একমাত্র কারণটাকে ক্যানসার শেষ করে দিয়ে গেছে।
‘একটা চিঠি দিয়ে যদি তোমার ডিরেক্টরকে সব জানিয়ে দিই তাহলে কি হবে জান?’
তখন সে জানত কী হবে। এখন সে জানে ওই চিঠি কোনোদিনই তার অফিসে পৌঁছবে না। মাসে মাসে পাঁচশো টাকার খামটা আর তাকে টেবলের ওধারে ঠেলে দিতে হবে না। গভীর গাঢ় ঘুমের জন্য আর সে ছাদে পায়চারি করবে না।
‘জ্ঞান হওয়া থেকে তোমায় দেখলাম শুধু গঙ্গাজলই খেয়ে গেলে!’
হিতু ঝাঁকাঝাকি দেখতে চায়। জীবনকে নাকি মদের মতো খেতে হবে! এই ফণী পালই তাকে কুরে কুরে খেয়ে ফোঁপরা করে দিয়ে গেছে।…হিতু তাচ্ছিল্যভরে কথাগুলো বলেনি। বলার সময় রাগে থমথম করছিল ওর মুখটা। একটা লোক তার জীবনের তুঙ্গে থাকার বয়সে যেভাবে কথা বলে, চলে, ফেরে, হিতু সেইভাবে তার বাবাকে দেখতে পায়নি। না দেখতে পাওয়ার জন্য দায়ী তো ফণী পাল!
কিন্তু আর সময় আছে কি জীবনকে তুঙ্গে টেনে তোলার? সারা জীবনই সমতল ভূমিতে সে হেঁটেছে। একবারও তার মনে হয়নি এই একই মাপে কদম ফেলে ফেলে যাওয়ার পিছনে কোনো কারণ বা উদ্দেশ্য আছে। উদ্দেশ্যহীন, অকারণ জীবন যাপন! আমার যা বিদ্যাবুদ্ধি তাতে চড়াই ভাঙার চিন্তা সত্যিই অসম্ভব। বাস থেকে নেমে অফিস যাওয়ার সময়ে অতুল ঘোষ হয়ে যাওয়া আর অফিস থেকে বেরিয়ে প্রিয়ব্রত নাগ হওয়া-ছাব্বিশ বছর ধরে এইভাবে চলে আসছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা ভয়ের জগতে ঢুকে যাওয়া আর নির্বিঘ্নে ফিরে এসে পরের দিনটার জন্য নিজেকে তৈরি করা!…হিতু বলল, ‘আমি কিন্তু তোমায় তা দেখলাম না!’ কি দেখতে চেয়েছিল? মদ খেয়ে বাইক চালিয়ে মাঝরাতে বাড়ি ফেরা? সেটাই তুঙ্গ?
