ফণী পালের খোঁজ নিতে একবার ওর বাড়িতে যেতে হবে। এক মাস আগে শেষ দেখেছে। ওর বাড়ির গলিটা তার মনে আছে। দু’বার মাত্র গেছিল তা-ও ছাব্বিশ বছর আগে। একই ধরনের পাশাপাশি দুটো দরজা কিন্তু কোনটা যে ফণী পালের সেটা এখন ঠিক মনে পড়ছে না।
তাকে নিয়ে গেছিল নন্তু। একতলায় স্যাঁতসেতে ঘরটায় ছিল তক্তপোশ। সেটা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো জিনিস ছিল না, দেয়ালে একটা ক্যালেন্ডারও নয়। মোটা দেয়াল, ছোটো একটাই জানলা, তার শিকগুলো ছিল খুবই সরু। সিলিং নিচু, কাঠের কড়িবরগা। তক্তপোশে বসে ছারপোকার কামড় খেয়েছিল।
‘ধরা পড়লে কী হবে? তা আমি কী করে বলব?’ ফণী পাল দুজনকে একসঙ্গেই উত্তর দিয়েছিল। ‘তা ছাড়া ধরা পড়বেই বা কেন যদি নিজেরা সাবধান হয়ে প্রথম কয়েকটা মাস চলো! নামটা পরে বদলে দেবার ব্যবস্থা করব, তাতো বলছিই। এসব গ্যারান্টি তো আর লেখাপড়া করে হয় না, মুখের কথাই সব, তোমরা যদি মনে করো আমি ধাপ্পা দিয়ে টাকা নিচ্ছি তাহলে আর এসো না, ব্যস! আর যদি বিশ্বাস করো তাহলে এসো, অবশ্য টাকাটা সঙ্গে নিয়ে।’
‘পাঁচ হাজার বড্ড বেশি।’ প্রিয়ব্রত বলেছিল।
‘কিছু বেশি নয়। সারা জীবনে চাকরি থেকে কত লাখ টাকা পাবে, সেটা কি হিসেব করেছ? তোমরা কি ভেবেছ সব আমার পকেটেই যাবে? বখরাদার আছে।’
দরজার বাইরে সরু দালান দিয়ে আনাগোনা করছিল দু-তিনটি বালক। ময়লা থান পরা এক বুড়ি কোলে একটা ল্যাংটো বাচ্চচা নিয়ে ঘরে এসে বলল, ‘অ ফণী, একবার ডাক্তারের কাছে যা বাবা, জ্বর তো ছাড়ছে না।’
‘যাব’খন।’
‘আজ দু’দিন হল রান্নাঘরের ডুমটা কাটা।’
‘আজ কিনে দেব, এখন যাও তো এখান থেকে।’
ফণী পালের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে নন্তু বলেছিল, ‘কি করবি?’
‘বুঝতে পারছি না।’
‘আমার কিন্তু লোকটাকে সুবিধের মনে হচ্ছে না। অতগুলো টাকা, যদি মেরে দেয়!’
নন্তু আর যায়নি কিন্তু সে গেছিল। নন্তু পরে ছোটো একটা হোসিয়ারি দোকান খোলে হাতিবাগানে, এখন শুধু চা পাতা বিক্রি করে। দোকানের সামনে খদ্দেরের ভিড় দেখেছে, ভালোই চলে। চাকরিতে ঢোকার মাস ছয়েক পর ওর সঙ্গে প্রিয়ব্রতর দেখা হতে নন্তু জিজ্ঞাসা করেছিল, ফণী পালের কাছে আর সে গেছিল কি না? ওকে সে মিথ্যে কথা বলেছিল। না বললে, নন্তুও একটা গলার কাঁটা হয়ে থাকত।
ঝিমুনি আসছে। কোনোদিনই এমন সময়ে তার ঘুম পায় না। অফিস কামাইটা তার জীবনযাপন রুটিনের বাইরে প্রথম বেনিয়ম।
হিতু দরজায় এসে উঁকি দিয়ে প্রিয়ব্রতকে কপালের উপর দু’হাত আড়াআড়ি রেখে শুয়ে থাকতে দেখে ফিরে যাচ্ছিল। সে ডাকল।
”কিছু বলবি?”
”হ্যাঁ। মেয়েটা যদি নীচের ঘরে থাকতে চায় তাহলে থাকুক না, আমার কোনো আপত্তি নেই।”
ছেলের মুখের দিকে সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। ওর মুখে গুরুগম্ভীর কোনো সদিচ্ছা নেই শুধু ছেলেমানুষি একটা লাবণ্য ছাড়া।
”না। তা হয় না।”
”ওকে যদি বেঁচে থাকায় সাহায্য করা যায়-”।
কাকে সাহায্য করার কথা হিতু বলছে? নিরুকে না বাবাকে? নিঃসঙ্গতা ঘোচাবার জন্য কী সহজ সরল সমাধানই ও ছকে ফেলেছে!
”ওকে কোনোভাবেই সাহায্য করা যাবে না। এভাবে কিছুদিন লুকিয়ে থেকে মৃত্যুকে কিছুক্ষণ থামিয়ে রাখা যায় মাত্র। মরা তো অনেক রকমের হয়! ও যদি সরে যায়, মানে সত্যিই যদি খুন হয়, তাহলে সেটাই বোধহয় ভালো হবে, তুইও কাগজে লেখার মতো একটা সাবজেক্ট পাবি।”
হিতুর মুখটা মুহূর্তের জন্য অপ্রতিভ দেখাল। শেষের কথাটা জুড়ে না দিলেই বোধহয় ভালো হত! কিন্তু কীভাবে যেন তার মুখে এগিয়ে এল বিদ্রুপটা! প্রিয়ব্রতর নিজেকে ছেলের কাছে ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে।
”খুন হলে তার সামাজিক দিকটাকে উপেক্ষা করা উচিত হবে না। এইভাবে অত্যাচারিত মেয়েদের যদি সমাজ-”
হিতু চলে গেছে।
দুটো হাত কপালের উপর রেখে প্রিয়ব্রত চোখ বন্ধ করল।
সন্ধ্যার মুখে সে ফণী পালের খবর নিতে বাড়ি থেকে বেরোল। বেনেটোলার রাস্তাটা দিয়ে তেলেভাজা-মুড়ির দোকান পর্যন্ত গিয়ে সে ডানদিকের সরু রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। অবিকল গোপী বসাক লেন কিংবা কালীমোহন মিত্র স্ট্রিটের মতোই রাস্তাটা। সেই আঁস্তাকুড়, টিউবওয়েল, ঢিবি, গর্ত, ইট-বার-করা দেয়াল, উনুনের ধোঁয়া। কাউকে জিজ্ঞাসা করে নিশ্চিত হয়ে নেওয়াই ভালো। ফণী পালের মতো লোককে এখানে সবাই নিশ্চয় জানে। চুল কাটার দোকানে দাড়ি কামাচ্ছে একজন। প্রিয়ব্রত এগিয়ে গেল।
”আচ্ছা ভাই, এখানে ফণী পালের বাড়ি কোথায় বলতে পারেন?”
বাঁ হাতে মাথাটা ধরা, ডান হাতে ক্ষুর গালের উপর দিয়ে টানতে টানতেই নাপিত বলল, ”কী করে?”
”তা ঠিক বলতে পারব না। মনে হয় কিছু করতেন না। বয়স হয়েছে, প্রায় সত্তরের কাছাকাছি।”
”আপনার কেউ হন?” ক্ষুর থেকে সাবানের ফেনা বাঁ হাতের কবজিতে ঘষে লাগিয়ে লোকটি তাকাল।
”না পরিচিত লোক, মাঝে মাঝে দেখা হত।”
”শেষ কবে দেখা হয়েছে?”
প্রিয়ব্রতর বুকের ভিতরটা সামান্য কেঁপে উঠল। একথা কেন বলল? তাহলে কি… ”একমাস আগে শেষ দেখেছি। উনি আসবেন বলে আর আসেননি।”
”কোনোদিন আর আসবেনও না। মারা গেছেন।”
”অ্যাঁ, সে কি!” প্রিয়ব্রত বুকের মধ্যে প্রচণ্ড মোচড় পেল। হাত বাড়িয়ে সে দোকানের পাল্লাটা ধরে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রেখে শুধু তাকিয়ে রইল লোকটির মুখের দিকে।
