হিতু এত রেগে কথা বলছে কেন? জীবনটা কার, ওর না আমার? প্রিয়ব্রত শুনতে শুনতেই ভেবে গেছে নিজের কথা। কেন আমি নিজেকে উপভোগ করতে পারিনি সেকথা ওকে বলা যাবে না। চাকরি ছেড়ে দিয়ে সে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারত কিন্তু হিতুকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করে তোলার জন্য টাকার দরকার ছিল। বাবার দায়িত্ব যে কী জিনিস ও এখন বুঝতে পারবে না। বাবার হৃদয়ও ছুঁতে পারবে না।
মনে মনে কতবার প্রশ্ন করেছি, বয়স বাড়ছে, এবার আমি কি করব? উত্তর খুঁজতে গিয়ে বুকের মধ্যে শুধু প্রতিধ্বনি শুনেছি, এতকাল ধরে কি অর্জন করলাম? আমি কি সুখী? সফল? এই জীবনই কি চেয়েছি? প্রিয়ব্রত একদৃষ্টে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। পলক যেন পড়ছে না। শরীরে কোনো উত্তেজনা নেই। মধ্য জীবনের এই অনুভূতি বড়ো মর্মান্তিক, বড়ো নিঃসঙ্গ করে দেয়। কিন্তু এটাই তো সে কাজে লাগিয়ে খোলস বানিয়েছে।
”তোমার কি কখনো মৃত্যুর কথা মনে এসেছে?” হিতু সামনে ঝুঁকে তাকে চেয়ারে বসার জন্য হাত বাড়িয়ে ইশারা করল। বসবে কী বসবে না? ছেলে তার খোলস ভাঙার চেষ্টা করছে। এখন ওটা ভেঙেই বা কী লাভ? ভেতর থেকে তো বেরিয়ে আসবে রুগণ, আড়ষ্ট, চোখ পিটপিট করা একটা লোক, গ্যাস্ট্রিকের ব্যথাকে মাঝেমাঝে হার্ট অ্যাটাক ভেবে যে ঘামতে শুরু করে।
”না মনে আসেনি।”
”ভালো, খুব ভালো। বাবা যতদিন বেঁচে থাকে ছেলে ততদিন নিশ্চিন্ত বোধ করে, মরাটরার কথা তখন আর মনে আসে না, কলকাতার রাস্তাতেও মদ খেয়ে বাইকে স্পিড তোলায় ভয় আসে না। আমার আগে তো আমার বাবার মরার কথা, সে যখন বেঁচে রয়েছে তখন আর ভয় কি? কিন্তু তুমি মরলেই আমি সামনের সারিতে এসে যাব সুতরাং তোমার দীর্ঘদিন বাঁচা দরকার।”
হিতু হাসছে। ওর চোখে ঝাঁঝালো ভাবটা আর নেই। প্রিয়ব্রতর মনে হল, হিতু অন্য কিছু একটা বলতে চেয়েছিল। ‘আর তাকে নিয়ে তুমি’ বলেই, বাবা আঘাত পেতে পারে ভেবে তখন কথা ঘুরিয়ে নিয়েছে। ও তখন মুখ লক্ষ করছিল, নিশ্চয় দেখেছে বাবার মুখটা কীরকম যেন কালো হয়ে গেল! কিন্তু কীজন্য ও নিরুর আসাটা পছন্দ করেনি?
তিলু দু’কাপ চা নিয়ে ঢুকল। ওর চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে প্রিয়ব্রত বলল, ”বেশি দিন বাঁচাটা শেষ পর্যন্ত কষ্টের হয়ে ওঠে। ঠাকুর্দা নব্বুই বছর বেঁচেছিলেন। ছেলেমেয়ের মানে আমার বাবার, পিসির মৃত্যু তাকে দেখতে হয়েছে, নিজের স্ত্রীরও। নেহাত তখন জয়েন্ট ফ্যামিলি ছিল বলে তাই খানিকটা বেঁচে গেছিলেন। ওনার রাগ, দুঃখ, শোকতাপ, যাবতীয় ঝঞ্ঝাট সবাই ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। কিন্তু আমার তো কোনো ফ্যামিলিই নেই। অফিস থেকে ফিরে চুপচাপ বসে শুধু টিভি দেখা নয়তো কাগজ পড়া!”
”নিঃসঙ্গ বোধ করছ…কম্প্যানিয়ন চাই?”
প্রিয়ব্রত চায়ে চুমুক দিল। হিতুর স্বরে হালকা ফাজলামোর ছোঁয়া থাকলেও সে কিন্তু উত্তর দিল না। কিছু একটা উদ্দেশ্য আছে এই কম্প্যানিয়ন শব্দটা বলার পিছনে।
”মা মারা যাবার পর তুমি তো বিয়ে করতে পারতে!”
”পারতুম। কিন্তু তাহলে তোকে লেখাপড়া শিখিয়ে বড়ো করে তুলতে পারতুম না।” প্রিয়ব্রতর সন্দেহ হচ্ছে, হিতু বোধহয় তাকে খেলাচ্ছে।
”এখন তো আর আমাকে নিয়ে তোমায় ভাবতে হচ্ছে না, নিজের কথা এবার ভাবতে পারো।”
হিতু এক চুমুকে কাপ খালি করে আবার চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। বইটা তুলে মুখের কাছে ধরে পাতা ওলটাতে ওলটাতে বলল, ”খুদিকেলোর মেয়েকে তো ছোটো থেকেই দেখেছি। রোগা হলেও মন্দ দেখতে নয়, মুখ চোখ শার্প,…ও মেয়েকে কিন্তু কেউ বিয়ে করবে না।”
”কিন্তু ওর তো কোনো অপরাধ নেই, ইচ্ছে করে ও এটা ঘটায়নি।”
”সেটা বোঝাবে কাকে? চারপাশের মানুষজনকে তো দেখছ, মনে হয় কি কেউ বিয়ে করতে রাজি হবে?…তোমাকে বললে কি-” হিতু হোঁচট খেয়ে থেমে গেল।
প্রিয়ব্রত মনে মনে হাসল। হিতুর উদ্দেশ্যটা সে বুঝতে পেরেছে। বাবার নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে তোলার জন্য ওর মনে হয়েছে এটাই আসল পথ। কি তাহলে লেখাপড়া করল? কাদের সঙ্গে মেলামেশা করছে?
”আমি এটা এমনিই বললাম…কথার কথা মাত্র।” হিতু আড়চোখে তাকিয়ে নিয়ে পিঠ চুলকোবার জন্য কাত হল।
তুই কি বিয়ে করতিস? প্রিয়ব্রত বলতে গিয়েও বলল না। হয়তো জেদ দেখিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলবে, কথার পিঠে কথা জমবে, অথচ দুজনেই জানে মনের সৎ ইচ্ছা প্রকাশ করার চর্চা হিসেবেই তারা নিরুকে ব্যবহার করছে।
”মেয়েটা খুন হবে যদি কোর্টে দাঁড়িয়ে তিনজনকে চিনিয়ে দেয়। আমাকে বলেছিল ‘তাহলে কি করবে?’ আমি বললুম পালিয়ে যাও। ও বলল, ‘আমাকে লুকিয়ে রাখতে পারেন?’ নিরু আমাদের নিচের ঘরে লুকিয়ে থাকতে চেয়েছিল মামলাটা খারিজ না হওয়া পর্যন্ত। আমি রাজি হইনি।”
হিতু বইটা নামিয়ে রেখেছে বুকের উপর। চোখে ঔৎসুক্যর নীচে কোমল ছায়া। খালি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে প্রিয়ব্রত ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
নিজের ঘরে এসে কাগজগুলো ভাঁজ করে সে টেবিলে রাখল। বিছানার চাদরটা সমান করে পাতল। শুধু বুক নয় সারা শরীরটাই ভারী লাগছে যেন গায়ের চামড়া সিসে দিয়ে তৈরি। তার এখন কিছুই করার নেই।
কাছাকাছি কোনো বাড়িতে মেয়েদের ঝগড়া হচ্ছে। প্রায়ই হয়। তিলু ঘর মুছে গেছে। মোছার দাগ দেখা যাচ্ছে জানলা দিয়ে আসা আলোয়।…নিরু যদি লুকিয়ে থেকে প্রাণ বাঁচাত তাহলেই বা কি হত? সারাজীবনই তো এই ঘটনাটা ওর সঙ্গে থাকবে! চেনা লোকেদের এড়িয়ে চললেও নিজের স্মৃতিকে তো মুছে ফেলতে পারবে না। যখন তখন বুকের মধ্যে লোডশেডিং হবে। মোমবাতি জ্বালিয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকার জন্য কাউকে পাবে না। অতুলচন্দ্র ঘোষকে কি মুছে ফেলা যাবে নির্বিঘ্নে রিটায়ার করার পরও?
