লোকটা এখন কেমন আছে? তার পরিবারের লোকেরা কি ভাবছে? মামলায় যদি হেরে যায়?…কাল নিরুকে কোর্টে যেতে হবে। প্রিয়ব্রত জানলার দিকে তাকাল। জানলার কাছে গেলে তবেই ওদের ছাদটা দেখা যায়। যাবে কি?
মুখ ফিরিয়ে দেখল হিতু নেই। নিঃসাড়ে কখন ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। সে খাট থেকে উঠে জানলার কাছে গেল। নিরুদের ছাদে মানুষ নেই। এককোণে ভাঙা চুবড়ি আর কাপড়ের টুকরো পড়ে রয়েছে। কান পেতেও কথার টুকরো বা বাসনের শব্দ পেল না।
”তিলু চা করছিস নাকি?” প্রিয়ব্রত ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে অনুচ্চচ স্বরে বলল।
”দাদার জন্য জল বসিয়েছি, আপনি খাবেন?”
”হ্যাঁ।”
হিতুর ঘরের পর্দা টান হয়ে ঝুলছে। ঘর থেকে শব্দ আসছে না। দরজার কাছে এসে প্রিয়ব্রত পর্দায় হাত রেখে বলল, ”একটা কথা বলব তোকে।”
সেকেন্ড পাঁচেক পর, ”ভেতরে এসো” শুনে সে পর্দা সরাল। হিতু চিৎ হয়ে একটা ইংরেজি বই পড়ছে। খাটের নিচে অ্যাশ ট্রে থেকে ধোঁয়াটা হিতুর কানের পাশ দিয়ে উঠছে। বাবার গলা শুনে সিগারেট নিবিয়েছে। প্রিয়ব্রত স্বাচ্ছন্দ্য ও ভরসা পেল।
”মোটরবাইক চালানোটা কলকাতার রাস্তায় খুবই রিস্কি। তার উপর রাতে তো রাস্তায় আলো বলতে কিছুই থাকে না।”
সে প্রতিক্রিয়া দেখতে চায়। কিন্তু হিতুর চোখ বইয়ের পাতা থেকে সরল না। তাহলে কী ও বুঝতে পেরেছে, বাবা আসলে কী কথা বলতে এসেছে?
”যথেষ্ট বড়ো হয়েছিস, নিজের সেফটি সম্পর্কে আরও নজর দিতে শেখ। মোটরবাইক চালানো এমনিতেই বিপজ্জনক ব্যাপার, তার ওপর ফুল কন্ট্রোল না থাকলে-”
”কাল আমার ফুল কন্ট্রোল ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে।”
হিতুর স্বর তীব্র, চোখে অধৈর্যের বিরক্তি।
”যারা অ্যাকসিডেন্ট করে তারাও এইরকম ভাবত।”
”আমি এমন কিছু ড্রিঙ্ক করিনি যাতে অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে।”
প্রিয়ব্রত আহত হল এত স্পষ্ট করে, বিনা ভণিতায় ‘ড্রিঙ্ক’ শব্দটা ওর মুখ থেকে বেরিয়ে আসায়। ও তাহলে ধরেই রেখেছিল বাবা এই নিয়ে কথা বলতে আসবে। উত্তরও তৈরি করে রেখেছে।
”ড্রিঙ্ক করাটা এমনই জিনিস, এটা দিনদিন বাড়ে।…তুই ড্রিঙ্ক করে আর মোটরবাইক চালাসনি।”
”অ্যাকসিডেন্টের ভয়ে?”
হিতুর দৃষ্টিতে বিদ্রুপ, চ্যালেঞ্জ। চোখ ক্রমশ সরু হয়ে আসছে, ঠোঁট দুটো মুচড়ে চেপে ধরা। রাগ চাপার সময় ওর মুখটা এইরকম হয়।
”কাল যে মেয়েটা এসেছিল সে কে?”
প্রিয়ব্রত পাথর হয়ে গেল প্রশ্নের আকস্মিকতায়। সাড় ফিরে আসামাত্র বুকটা দুরদুর করে উঠল। হিতুর প্রশ্নে কীসের ইঙ্গিত। কী বলতে চায়, কী ভেবে নিয়েছে?
সে জানত তিলু ওকে চুকলি কাটবেই। যেমন ওর বমি করার কথাটা তাকে বলে দিয়েছে। হিতু জানুক কাল একটা মেয়ে তার ঘরে বসে কথা বলেছে, তাকে বাড়ি পর্যন্ত সে পৌঁছেও দিয়ে এসেছে। কিন্তু এইভাবে বলা প্রশ্নটার মধ্যে অশ্লীল কদর্যতার ছাপ রয়েছে। বাবার সঙ্গে এইভাবে কথা বলার মানসিকতা ও পেল কবে? কৈফিয়ত চাইছে কি?
”পেছনের বাড়ির নিরু, খুদিকেলোর বড়োমেয়ে।…মেয়েটা আটমাস আগে রেপড হয়েছিল। পুলিশ কেস চলছে।”
হিতুর মুখে কোনো ভাবান্তর ঘটছে না। যেন তার জানা ঘটনা। কাগজে কাজ করে অনেক কিছুই হয়তো জানে।
”রেপড হয়েছে তো কি হয়েছে, গন্ডা গন্ডা মেয়েই হচ্ছে, তাই বলে এখানে এল কেন?”
”ওকে থ্রেট করেছে খুন করবে বলে। কোর্টে আইডেন্টিফাই যাতে না করে সেজন্য…ওরা বাড়িতে এসে ওকে ছুরি দেখিয়ে শাসিয়ে গেছে, খুদিকেলোকেও বলেছে দোকান বোমা মেরে জ্বালিয়ে দেবে!”
প্রিয়ব্রতর স্বর ধাপে ধাপে তীক্ষ্ন হয়ে উঠল। সে নিজেও সেটা বুঝতে পারছে কিন্তু নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করল না। স্বর চড়ে ওঠে তো চড়ুক। ব্যাপারটার গুরুত্ব তার কাছে কতটা এটা হিতুকে বোঝাতে হবে।
”এখন ওদের মনের অবস্থাটার কথা ভেবে দ্যাখ!”
”দেখেছি।” বই মুড়ে রেখে হিতু দুটো হাত মাথার পিছনে ছড়িয়ে দিল, অলস শ্লথ ভঙ্গিতে। ”ছুরি দেখাক কি বোমা মারুক তাই নিয়ে তোমার মাথাব্যথা কেন? কলকাতায় এসব রোজই ঘটছে। তোমার কি সময় কাটাবার আর কিছু নেই?”
”গরিব ওরা, মেয়েটাও ছেলেমানুষ-”
”কত ছেলেমানুষ? বয়স কি ছয়, সাত, আট? তিনজন রেপ করেছে যাকে সে কি ছেলেমানুষ? আর তাকে নিয়ে তুমি-!”
”তাকে নিয়ে আমি….কি?”
প্রিয়ব্রত হাত বাড়াল চেয়ারের পিঠটা ধরার জন্য। মুখ ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে, হাতের আঙুলের কাঁপুনি থামাতে মুঠো করল। হিতু তাকে লক্ষ করছে দেখে স্বাভাবিক দেখাবার চেষ্টায় সে চেঁচিয়ে বলল, ”তিলু, চা কখন দিবি রে।”
”বাবা একটা জিনিস হয়তো তুমি বুঝতে পারছ না কিংবা হয়তো বোঝ, চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর বয়সের মাঝের সময়টাতেই পুরুষ মানুষ তার জীবনের একটা হিসেবনিকেশ কষে। …আচ্ছা, ছোটোবেলায় তোমার বাবা জীবন সম্পর্কে যা কিছু তোমায় বলেছিল, বুঝিয়ে ছিল এখন জীবনের মাঝপথে এসে সত্যিই সেইরকমটাই কি মনে হচ্ছে?”
”না।”
”ভবিষ্যতের দিকে এখন তাকিয়ে মনে হচ্ছে কি অতীতটাই ভালো ছিল?”
কী উত্তর সে দেবে? গত ছাব্বিশটা বছর যা ছিল সামনের ছাব্বিশটা বছরও সেই একই যন্ত্রণার মধ্যে থাকবে। একমাত্র বিশ্বজিত গুপ্তা জানে কী কষ্ট সে বহন করে চলেছে।
”পুরুষ মানুষ তুঙ্গে থাকে এই বয়সে। আমি কিন্তু তোমায় তা দেখলাম না।” হিতু উঠে বসল। ”একইভাবে বছরের পর বছর চাকরি করে গেলে একই চেয়ার-টেবিলে বসে। আমি মানছি তোমার যা কোয়ালিফিকেশন বা বিদ্যেবুদ্ধি তাতে এর বেশি কিছু করা সম্ভব নয়। কিন্তু তাছাড়াও জীবনটাকে উপভোগ করা, মানে এই সময়টাতেই তো মদের মতো জীবনটাকে চুমুকে চুমুকে খাবার কথা। আমি জ্ঞান হওয়া থেকে তোমায় দেখলাম শুধু গঙ্গাজলই খেয়ে গেলে, নিজেকে একটু ঝাঁকাঝাঁকিও করলে না।”
