প্রিয়ব্রতর ঘাড়ের কাছটায় শিরশির করে উঠল। তার মনে হচ্ছে খবরটার মধ্যে এক ধরনের বিপদ তার জন্য অপেক্ষা করছে। আর পড়বে না স্থির করে কাগজটা নামিয়ে রাখতে গিয়েও রাখল না। দুর্নিবার একটা আকর্ষণ তার চোখ টেনে নিয়ে গেল অক্ষরগুলোর উপর।
প্রোফেসার গুপ্তা জানিয়েছিলেন তিনি নাকি হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে ফসিল আবিষ্কার করেছেন। উঁচু পর্বতমালার জন্য সেখানে খুব কম বিজ্ঞানীরই পৌঁছনো সম্ভব। প্রোফেসর ট্যালেন্ট বলেছেন, ফসিলের অধিকাংশ নমুনাই ‘সাধারণ লেবরেটরি শিলা’। তিনি আরও বলেছেন, প্রোফেসর গুপ্তার গবেষণা সম্পর্কে প্রথম তার সন্দেহ জাগে আঠারো বছর আগে যখন তিনি গ্রাপটোলাইট, খুদে সামগ্রিক ফসিল বিষয়ে একটি রিসার্চ পেপারে জানালেন, এই ফসিলগুলো তিনি কাশ্মীরের একটা জায়গা থেকে পেয়েছেন। প্রোফেসর ট্যালেন্ট সেই জায়গাটায় ঘুরে এসে বলেন, ‘গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। স্থানটি এমনই যে সেখানে গ্র্যাপটোলাইট কেন, কোনো ধরনের ফসিলই কখনো খুঁজে পাওয়া যাবে না। ব্যাপারটা নিয়ে তখন কিছু বলিনি। ভেবেছিলাম তঞ্চকতাটা আপনা থেকেই ফাঁস হয়ে যাবে। কিন্তু ক্রমশ জিনিসটা এমন জায়গায় এসে পৌঁছেছে, এত বেশি ভুল খবর জমে উঠেছে যে এখন আমাদের গবেষণার ফল ঠিক না ভুল সেটা বোঝায় দায় হয়ে পড়েছে, পুরো ডাটাই মিথ্যাচারে ভরা। ভারতীয় এবং বিদেশি বিজ্ঞানীরা বোকা বনেছেন। গুপ্তার রিসার্চ পেপারের বিদেশি সহ-লেখকরা গবেষণার জন্য ফসিলগুলো হিমালয় থেকে পাওয়া বিশ্বাস করেছিলেন। তারা একটুও সন্দেহ করেননি, যে ফসিলগুলো তারা বর্ণনা করেছেন সেগুলো তাদেরই খিড়কি দিয়ে এসেছে। হয়তো এসেছে তাদের নিজেদের লেবরেটরি ঘুরেই। রিও-তে রাইনো বা কাশ্মীরে ক্যাঙারু পাবেন কি, যদি না সেগুলো কোনো চিড়িয়াখানা থেকে বা ভ্রাম্যমাণ সার্কাস থেকে পালিয়ে সেখানে গিয়ে থাকে?’
প্রিয়ব্রত অবাক হল এই ভেবে যে প্রায় ষাটজন বিজ্ঞানী নিজেদের অজান্তেই এই জালিয়াতিতে জড়িয়ে পড়েছে ফসিলের নমুনা পরীক্ষায় আর পেপারের সহ-লেখক হতে রাজি হয়ে। ইতিহাসের এটা নাকি বৃহত্তর বৈজ্ঞানিক জালিয়াতির একটা! অথচ এই প্রোফেসর গুপ্তার ভারতীয় ভূতত্ত্ব বিষয়ে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ বই আর শ’ চারেক পেপার আছে! একদিনেই ব্যাপারটা হয়নি, বহু বছর ধরেই এটা তাহলে চলে আসছে।
কতদিন ধরে গুপ্তার জালিয়াতিটা চলছে জানার জন্য প্রিয়ব্রত খবরটার শেষের দিকে খুঁজতে গিয়ে এই কথাটা পেল: প্রোফেসর গুপ্তা গত পঁচিশ বছর ধরে তার কেরিয়ার তৈরি করেছেন মোচড়ানো, দোমড়ানো, জট পাকানো মিথ্যা খবরের ভিতের উপর। পঁচিশ বছর ধরে অজস্র ভুল সংবাদ যথেচ্ছ ঢেলে গেছেন, কেউ তাকে ধরতে পারেনি।
সে চাকরি করছে ছাব্বিশ বছর। গত মার্চে পঁচিশ পূর্ণ হয়ে গেল। কাগজধরা হাতটা অবশ হয়ে নেমে এল তার কোলে।
এই বিশ্বজিত গুপ্তা কি কখনো ভেবেছিল, হাজার হাজার মাইল দূরে অস্ট্রেলিয়ায় ট্যালেন্ট নামে একটা লোক আঠারো বছর আগে প্রথম তাকে সন্দেহ করে। ভারতে এসে ফসিল পাওয়ার জায়গাটা ঘুরে দেখে যায়। নিঃশব্দে অপেক্ষা করেছে শিকারের উপর লাফিয়ে পড়ার জন্য।
কেউ কি আঠারো বছর আগে গোপী বসাক লেনে এসে এই বাড়িটা দেখে গেছে! কেউ কি অপেক্ষা করছে তার জন্য!
তাহলে এতদিনে ঝাঁপিয়ে পড়তই। কেউ জানে না একমাত্র ফণী পাল ছাড়া। ওর মুখ সে বন্ধ করে রেখেছে মাসে মাসে পাঁচশো টাকা দিয়ে। ফণী পাল তাকে ধরিয়ে দেবে না যতদিন টাকাটা পাবে।
এত বছর পর তাকে ধরিয়ে দিয়ে কার কি লাভ হবে? সে তো কোনো ভুল বা মিথ্যা খবর ঢেলে দেয়নি! যতটা গুটিয়ে থাকা একটা মানুষের পক্ষে সম্ভব সেইভাবেই ছাব্বিশটা বছর কাটিয়ে এসেছে। কখনো কারুর বিন্দুমাত্র ক্ষতি করেনি, নিজের কাজ অন্যের ঘাড়ে চাপায়নি, প্রোমোশনের জন্য চেষ্টা করেনি। আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী, সহকর্মী সবার থেকে সরে গিয়ে নিজস্ব একটা জগৎ সে গড়ে ফেলেছে।
নিজেকে ঘিরে খোলস বানিয়েছে। সেটাকে প্রতিদিন সে কঠিন করে তুলেছে নিজেকে ভয় পাইয়ে। চেতনা, স্নায়ু, দৃষ্টি, স্বরনালি এমনকি পদক্ষেপও সে একই সূত্রে ভয়ের সঙ্গে বেঁধে ফেলেছে। বাইরে থেকে কোনো তাপ, আলো, শব্দ, বাতাস, হাসি সেই আবরণ ভেদ করে ঢুকতে পারেনি। এটাই তার বড়ো কৃতিত্ব, কাউকে এত বছর ধরে জানতে দেয়নি সে অন্য জগতে বাস করে।
কিন্তু কেউ কোথাও অপেক্ষা করছেই। বিশ্বজিত গুপ্তার মতো বিজ্ঞানী পঁচিশ বছর পর যদি ফেঁসে যেতে পারে তাহলে ছাব্বিশ বছর পর একটা আপার ডিভিশ্যন ক্লার্কও ধরা পড়তে পারে। গুপ্তা বলেছে ‘পেশাগত ঈর্ষা’ থেকে তার সম্পর্কে এইসব বলা হয়েছে, সে মামলা করবে।
তাকে কেউ ঈর্ষা করে না।
সে মামলা করার কথা ভাবতেই পারে না।
ধরা পড়লে চাকরি অবশ্যই যাবে। কিন্তু আর কি হতে পারে? প্রভিডেন্ড ফান্ডের টাকা নিশ্চয় দেবে না। ছাব্বিশ বছরের মাইনের টাকা কি ফেরত চাইবে? জেলে পাঠাব কি? চাকরির নিয়মকানুনে এইরকম ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট করে কোনো শাস্তির কথা বলা আছে কি না তা সে জানে না। জানতে গেলে কৌতূহল তৈরি হতে পারে ভেবেই সে অফিসে কখনো খোঁজ নেয়নি। বিশ্বজিত গুপ্তার জেল বা জরিমানা নিশ্চয় হবে না।
