ওকে বুকের কাছে টেনে নিল দিনেশ। কাঁপছে শরীরটা। মুঠো দিয়ে চোখ কচলাতে শুরু করেছে।
-কি হয়েছে। কান্না কেন? কি হয়েছে!
-মরে গেছে।
ছেলেটা কাঁদছে। দিনেশ গলাটা ওর মাথায় চেপে ধরে পিঠে হাত বুলোতে লাগল। কি বলবে সে এখন। কোন কিছু বোঝার মত বুদ্ধি হয়নি। হাজার কথা বলেও একে সান্ত্বনা দেওয়া যাবে না। চুপ করে রইল সে। ওর কান্না আর জোয়ারের শব্দ মিশে গেছে। বুকের মধ্যে কলকল করছে।
চুপ করল ছেলেটা। ওকে টেনে পাশে বসিয়ে দিল দিনেশ।
-খেয়েছ?
-না।
-খাবে?
-না।
-কখন মরে গেছে?
-বিকেলে। ইস্টিশনে লিচু কিনে, হাসপাতালে যেতেই একটা লোক বলল, মরে গেছে।
-কি অসুখ করেছিল?
-জানি না। অনেকদিন হাসপাতালে ছিল, তারপর পেট কেটেছিল।
-বাড়িতে কে কে আছে?
-বাবলু আর দিদমা।
-আর?
-আর কেউ না।
-সঙ্গে কেউ আসেনি?
মাথা নাড়ল ছেলেটা।
-গাড়িতে করে নিয়ে এসেছে। আমিও ওই গাড়িতে এসেছি। খুব জোরে চালাচ্ছিল। একবার একটা লোক আর একটু হলেই চাপা পড়ত।
দিনেশের বুক থেকে মাথাটাকে দূরে সরিয়ে ছেলেটা মুখের দিকে তাকাল। ঝকমক করছে চোখ দুটো। গাল দুটো বেশ ফুলো-ফুলো।
-তোমার বাবা এখন কোথায়?
-ওইখানে, অফিসে কি সব লিখছে, দাঁড়িয়ে আছে।
চুপ করল ছেলেটা। দিনেশ কূলকিনারা পাচ্ছে না, এখন কি বলবে। ছেলেটা তাকিয়ে আছে ঘাটের দিকে। ঢেউ এসে ওখানে শব্দ করছে।
-আমাদের বাড়িতে একটা ময়না আছে। আমি রোজ তাকে সন্ধ্যেবেলায় ছাতু খেতে দি।
ঘাটে শব্দ হচ্ছে। দিনেশ শুনল। মালগাড়ির ইঞ্জিন হঠাৎ হুইসল দিল। ছেলেটা ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল। দেখা যাচেছ না। তরতর করে উঠে গেল। ইঞ্জিন দেখে আবার ফিরে এল।
-আমি যখন হাসপাতালে দাঁড়িয়েছিলুম তখন দু’টো দোতলা বাস গেছল। একদিকে গেছল।
-তুমি দোতলা বাসে চেপেছ?
-হুঁ। ইস্টিশন থেকে তো দোতলা বাসে করে হাসপাতালে আসতুম। এগিয়ে এসে দিনেশের কাঁধের ওপর ঝুঁকে ছেলেটা বলল।
-আমি একটা লিচু খাব?
-খাও না।
দিনেশ নিজেই খোসা ছাড়িয়ে দিতে লাগল। ক্ষিদে পেয়েছে ছেলেটা বীচিগুলো নিয়ে জলের দিকে ছুঁড়তে লাগল। খেলা করছে দুটো কুকুর। টিপ করে সেদিকে ছুঁড়ল। কেঁউ করে কুকুর দুটো পালাল। ছেলেটা হেসে উঠল।
শরীর গরম লাগছে দিনেশের। নখ বসে যাচ্ছে নরম শাঁসে। হাত কাঁপছে। জল ছুটছে। ঘাটে শব্দ হচ্ছে। শাণ্টিং-এর শব্দ হল। মন্দিরে জোর স্তোত্র পাঠ হচ্ছে। ছেলেটা ওপাশে সরে গেল কুকুর দুটোকে খুঁজতে। দেখতে পেলে আবার বীচি ছুঁড়ে মারবে। হাসবে।
ওর কান্না দেখে বুকের মধ্যে কথাগুলো জমাট হয়ে গেছল। ওর হাসির আঁচে বুক গলছে। সারা শরীরে গরম ছড়িয়ে পড়ছে। হাত পা খেলাতে ইচ্ছে করছে। জোয়ান বয়সের জোর শিরার মধ্যে ছুটছে।
গঙ্গার জল ছুটছে। উত্তরমুখো জল ছুটছে। জোয়ার আসে সমুদ্র থেকে। দূরে অন্ধকারে কালো মত একটা কি নড়ছে। বয়া? অন্ধকারে বয়া থাকে না। নৌকো? তাই হবে। ওটাকে ধরা যায় তো!
-খোকা তুমি এখানে আছ তো? আমার কাপড় জামাগুলো একটু দেখ। একটা ডুব দিয়েই উঠে আসছি।
আণ্ডারওয়্যার পরে জলে নামল দিনেশ। আঙুলগুলো কুঁকড়ে গেল। কতদিন জলে পা ডোবে না যে! টান লাগছে পায়ে। পা সরে যাচ্ছে। ঠিকমত শরীরটাকে খাড়া রাখা যাচ্ছে না, টলমল করছে।
-সাঁতার দিতে পারেন?
সাঁতরালে ও খুশি হবে। ওর গলার স্বরে তারই জানান দিল। দূরে কালোমত কি একটা নড়ছে। ওটাকে ধরা যায় কি!
ঝাঁপিয়ে পড়ল দিনেশ। জলটা ঠাণ্ডা কনকনে নয়, শরীর জুড়িয়ে যায়। স্রোত চলেছে। গা ভাসালে হবে না। কাঁধে, বগলে চড়চড় করে উঠল মাংস। এককালে মেসিনের মত হাত চলত। জং ধরেছে। মুখে জল ঢুকছে। কুলকুচো করে ফেলল। আবার জল ঢুকছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ভুল হচ্ছে। ডান হাত টেনে তোলার সময় মুখটা ডান দিকে ফেরাতে হবে। পাড়ি মারতে হবে সামনে। গুড়িগুড়ি ফেনা উঠবে! ডান হাত জলে পড়বে, মুখও জলে ডুববে, তখন শ্বাস ছাড়তে হবে। কতকালের অনভ্যাস!
কোথায় সেই কালোমতন জিনিসটা! এধার ওধার তাকায় দিনেশ। কিছু নেই। জায়গাটা অন্ধকার। দূর থেকে কিছু একটা আছে বলে মনে হয়। বুকে ব্যথা করছে। এখন যদি কিছুক্ষণ ভেসে থাকা যায়! না, তাহলে অনেক দূর টেনে নিয়ে যাবে।
চীৎকার করছে ছেলেটা। অন্ধকারে দেখতে পায়নি। ভেবেছে বোধ হয় ডুবে গেছে। দিনেশ চীৎকার করে সাড়া দিল। হয়তো কেঁদে ফেলবে। আহা কাঁদুক। ওর কান্না ভারি ভালো, ও কাঁদুক!
একটা লোক সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে ছেলেটার কাছে দাঁড়াল। কি যেন বলল, ছেলেটা ওর সঙ্গে চলে গেল। যতক্ষণ দেখা যায় দিনেশ ছেলেটাকে দেখল, তারপর গা ভাসিয়ে দিল।
.যমুনা শনিপুজো দিতে যায়। মাধবী বলল আজ সে’ও যাবে। যাবে ভাল কথা। যমুনার কোন আপত্তি নেই তা’তে।
শৈলর ছেলেটাকে রমার কোলে দিয়ে মাধবী বেরিয়ে পড়ল। গরদের শাড়িটা পোকায় কেটেছে! যমুনার আটপৌরে শাড়ি দেখে গরদ না পরার ক্ষোভটা মিটে গেল মাধবীর। গরদ পরলে গিন্নি-বান্নি দেখায়।
অনেকগুলো মোড় ঘুরলে গলিটা পড়ে মাঝারি রাস্তায়, সেখান থেকে সিধে বড় রাস্তা। বাস চলে। সে রাস্তাটা পার হলেই শনিঠাকুরের মন্দির।
দুটো মোড় ঘুরতেই জমজমাট ভিড় পথ আটকাল মাধবীদের। চীৎকার করছে দু’একজন মুখে রক্ত টেনে, সকলে শুনছে। বেশি চেঁচাচ্ছে যে ছেলেটি তাকে মাধবী খুব ছোট অবস্থায় দেখেছে। ওর নাম দুলাল। দুর্গাপুজোর কমিটিতে ওর নাম থাকবেই। ইলেকশনের সময় ভোট চাইতে এসেছিল। বাঁ হাতের দুটো আঙুল বোমা বাঁধতে গিয়ে উড়ে গেছে।
