”আপিস কামাই দেবেন!”
তিলুর অবাক হওয়ারই কথা। তার থেকেও অবাক হবে ভৌমিক। সে তার চাকরি জীবনে কখনো অতুল ঘোষকে ক্যাজুয়াল নিতে দেখেনি।
”হ্যাঁ কামাই দোব, কেন দিতে পারি না?” তার তীব্র স্বর তিলুকে সরিয়ে দিল দরজা থেকে।
আজ সে একটু অন্যরকম হবে, প্রতিদিনের ছাঁদটা বদলাবার চেষ্টা করবে। বাজার করা, বাসে ওঠা, অফিস যাওয়া, আবার বাসে উঠে বাড়ি ফেরা, আজ বন্ধ রাখব। হিতুকে আজ সে স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দেবে-।
কিন্তু কী জানাবে?
প্রিয়ব্রত ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। রান্নাঘরটা তার শোবার ঘরের মুখোমুখি। তিলু পিছন ফিরে বাটনা বাটছে। বাঁদিকে হিতুর ঘর। পর্দা ঝুলছে খোলা দরজায়। শিলে নোড়া ঘষার শব্দ ছাড়া বাড়িটা নিঃসাড়। হিতুর ঘরের পাশেই ছাদে যাবার দরজাটা খোলা। দুটো চড়াই ছাদে খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে।
একহাতে পর্দা সরিয়ে সে উঁকি দিল। উপুড় হয়ে হিতু ঘুমোচ্ছে। মাথাটা বাঁদিকে ঘোরানো। খালি গা। পরনে শুধু দিনের প্যান্ট। বালিসটা বুকে জড়িয়ে ধরা। ধীর লয়ে ওঠানামা করছে পিঠ। দুই বগলের চুল দেখা যাচ্ছে। ঘাড় থেকে কোমর পর্যন্ত মেরুদণ্ড বেয়ে একটা খাত, তার দুপাশে মসৃণভাবে ছড়ানো পিঠের পেশি সামান্য উঁচু হয়ে গড়িয়ে পড়েছে পাঁজরের দিকে। কোমরটা কাঁধের থেকে সরু। পা দুটো ছড়ানো। প্রিয়ব্রত একদৃষ্টে ছেলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের ঘরে ফিরে তিনটে খবরের কাগজের একটা তুলে বিছানায় আধশোয়া হল।
তার চোখ রয়েছে কাগজে কিন্তু একটা হেডিংও মগজে আটকাচ্ছে না। হিতু এখন পূর্ণ যুবক। রোজগার করছে। এখন সে নিজের ভালোমন্দ বুঝতে শিখেছে।…শুধু রাজনীতির খবর। ভারতের প্রধানমন্ত্রী, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী, তাঁরা কী বলল…সেই একঘেঁয়ে বস্তাপচা চল্লিশ বছরের পুরনো কথাগুলোই উলটেপালটে নতুন ঢঙে বলা।…রিপোর্টারের কাজটা কী ধরনের? খবরটা কি ওর লেখা? মদ খেয়ে কি কাজ করা যায়? হিতু নিশ্চয় ছুটির পরই খেয়েছে। একা, না সঙ্গে আরও কেউ ছিল?
হাউসওয়াইফ পুড়ে মরেছে! এই এক বউ-পোড়ানোর ধুম লেগেছে সারা দেশে। এই গোপী বসাক লেনেই তিনটে বউ গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে ছিল। তিনজনই বাঁচেনি। তাদের একজন ছিল তার বন্ধু কার্তিকের মা। তখন সে ক্লাস ফাইভে পড়ে। কবেকার কথা। সে খবর কি কাগজে বেরিয়েছিল?…এই কি প্রথমবার খেল নাকি নিয়মিতই খাচ্ছে? রোজ খেলে এতদিনে সে ধরে ফেলত। নিশ্চয় কেউ ওকে ধরিয়েছে। কে সে লোকটা? হিতু কি তাকে হিতৈষী ভাবে? কার্তিকের বাবার শোভাবাজারে রেডিমেড জামাকাপড়ের দোকান ছিল। রাতে দোকান বন্ধ করে কোথায় যেন গিয়ে মদ খেত আর বাড়ি ফিরে বউকে ঠ্যাঙাত। হিতুও কি ওইরকম হবে?
প্রিয়ব্রত অস্বস্তি ভরে কাগজ থেকে চোখ সরিয়ে জানালায় তাকাল। স্বচ্ছ আকাশ, মেঘের আঁচড়টুকুও নেই। কে জানে দুপুরে মেঘ হয়ে বিকেলে আবার ঝড়বৃষ্টি হতে পারে।…কার্তিকের বাবার মতো হিতু অশিক্ষিত নয়। তা ছাড়া ওর বউ নিশ্চয় কার্তিকের মায়ের মতো ছুঁচিবেয়ে কদাকার হবে না। বাড়ির মানমর্যাদার কথাও নিশ্চয় হিতু ভাবে।…’মাইনর গ্যাং রেপড!’
হাতটা শক্ত হয়ে উঠল। প্রিয়ব্রত কাগজটা বিছানার উপর মেলে কাত হতে হতে মুখ ফিরিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে নিল। নোংরা বিষয়ের খবর পড়ার সময় সে চায় কেউ যেন তার পড়াটা দেখে না ফেলে।
”কে?” প্রিয়ব্রত চমকে মুখ ফেরাল।
”একটা কাগজ দেবে?” দরজায় হিতু দাঁড়িয়ে। চোখেমুখে জল দিয়েছে, বুকটা ভিজে, চোখ দুটো ফুলে রয়েছে।
”কোনটা নিবি?”
মেইলটা দাও। এক মিনিট দেখব।”
হিতু এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে চেয়ারে বসল। একেবারে চারটে পাতা উলটেই কী যেন খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে গিয়ে একটু ঝুঁকে পড়ল।
”তোর কোনো লেখা?”
বোধহয় শুনতে পায়নি। বরাবর এইরকমই, কিছু পড়তে শুরু করলে সেঁধিয়ে যায় লেখার মধ্যে। একবার পড়লেই মনে রাখতে পারে বলে পড়ার টেবিলে ওকে বেশিক্ষণ বসতে দেখা যেত না। প্রিয়ব্রত আর একটা কাগজ তুলে নিয়ে চোখ বোলাতে লাগল।
”এই নাও…দেখি ওটা দাও তো।”
প্রিয়ব্রত আর একটা কাগজ এগিয়ে দেবার সময় বলল, ”তোর লেখা আজ বেরিয়েছে?”
”হুঁ, রোজই বেরোয়।”
হিতু আবার কাগজে ডুবে গেল। এই সব খবর কি ও লেখে? প্রিয়ব্রত আবার জানলার দিকে তাকাল। নিরু এখন কী করছে! ক’খানা ঘর নিয়ে ওরা থাকে? অতগুলো বোন, মা, বাবা, চলাফেরার জায়গা কোথায়? কারুর বাড়িতেও যাওয়ার উপায় নেই। আছে শুধু ছাদটা। ও কি এই রোদের মধ্যে ছাদে এসে বসে আছে?
মদ খেয়ে বাড়ি ফিরেছে অথচ হিতুর মুখে কোনো গ্লানি নেই। ওকে বারণ করলে কি খাওয়া বন্ধ করে দেবে? যদি বলি আমি কষ্ট পেয়েছি, ভয় পেয়েছি তাহলে কি বাবার মুখ চেয়ে…এটা কি খবর! প্রিয়ব্রত কাগজটা তুলে চোখের কাছে টেনে আনল।
”হিমালয়ান ফ্রড বাই ইন্ডিয়ান সায়েন্টিস্ট।” প্রিয়ব্রত বিড়বিড় করে হেডিংটা পড়ল। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানের অধ্যাপক জন ট্যালেন্ট জানাচ্ছেন, পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্বের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ কাল্পনিক ফসিল আবিষ্কার করে তারই সাহায্যে উত্তর ভারতের ভূপ্রকৃতির ইতিহাস নতুন করে লিখেছেন। যেসব নমুনার উপর ভিত্তি করে লেখা, তা ফসিলের দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। তা ছাড়া ওগুলো প্রায়শই কুড়িয়ে পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রে, ইউরোপের কিছু জায়গায়, চীনে এবং অন্যত্রও।
