প্রিয়ব্রত বিছানায় পাশ ফিরল। পাখা ঘুরছে তবু ঘামে সপ সপ করছে চাদর, বালিশ। বাইকের ক্ষীণ শব্দের জন্য সে কান পাতার চেষ্টা করল। কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। কুয়াশার মতো ঘুম ছড়াচ্ছে তার চেতনায়।
ছাব্বিশ বছর ধরে তার বুকের মধ্যে তালা বন্ধ রয়েছে একটা লজ্জা, একটা অপরাধ। সেটা কুরে কুরে তার সুখ, আনন্দ, সাহস, স্বাচ্ছন্দ্য খেয়ে নিয়েছে। তালা ভেঙে তাকে হিড়হিড় করে টেনে বার করে নিয়ে যাচ্ছে, এমন একটা দৃশ্য বহুবার সে কল্পনা করেছে আর ভয়ে শিউরে উঠেছে।
‘শুধু শুধুই ভয় পাচ্ছি’!
বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিরুদের গলি পর্যন্ত নির্বিঘ্নেই তো যাওয়া গেল। এইভাবে সেও তো পঁচিশটা বছর পার হয়ে এল…সিকি শতাব্দী! এইভাবে বাকি পথটাও কি যাওয়া যাবে না? নিজেকে ছাই করে মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে…লক্ষ লক্ষ মানুষ তো এইভাবেই রাস্তা ধরে ছাইগাদার দিকে হেঁটে চলেছে!…শুধু ফণী পালই একটা জ্বলন্ত কয়লা হয়ে রয়েছে!
আজই প্রথম ফণী এল না। কিছু একটা হয়েছে বোধহয়। হোক। সারা রাত সে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করবে ফণী পাল ট্রাম থেকে নামার সময় পড়ে গিয়ে যেন চাকার তলায় চলে যায়। তার ডাকে ভগবান তিনকড়িকে ট্রামের তলায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। এবারও নিশ্চয় শুনবেন।
কিন্তু তিনকড়ি কেন হঠাৎই বেঞ্চে তার জায়গাটায় বসতে চেয়েছিল? আজও সেটা তার জানা হয়নি!
স্বদেশ বলল না তো বাহাদুর শা জাফর কত তম মোগল বাদশা ছিল? কাল অফিসে গিয়ে ওকে জিজ্ঞাসা করতে হবে।…না থাক। ছেলেটা বড্ড খবর রাখে।
‘বুঝলেন অতুলদা, যত রাজ্যের লুকোনো খবর, হাঁড়ির খবর, গোপন ব্যাপার…’ অতুলদা অতুলদা….!
নিরুর মুখে একটা সাদা কাগজ আঁটা ছিল। তাতে কী খবর ছিল, তা সে কোনোদিনই জানতে পারবে না। এই সব কাগজে মুহূর্তের জন্য কথা ফুটে ওঠে আর মিলিয়ে যায়।
সুড়ঙ্গের মতো গলির অন্ধকারে নিরু ঢুকে গেল।…কাঠের সঙ্গে কাঠের ধাক্কা লাগার শব্দ এবার আসবে…আসবে…আসবে।
ঘুমিয়ে পড়ার আগে প্রিয়ব্রত বাঁ হাতটা ঊরুর উপর তুলে দিল।
৩
”দাদা কাল কখন ফিরল রে?”
”অনেক রাতে, প্রায় বারোটায়।”
”নিশ্চয় ঘুমোচ্ছিলি, আর দাদা বেল বাজিয়ে যাচ্ছিল!” তিলু ঘর মুছছে। জবাব দিল না।
”দাদাকে খেতে দিয়েছিলি?”
”খেয়ে এসেছে বলল।…খাবে কি, যা গন্ধ বেরোচ্ছিল মুখ থেকে!”
গন্ধ! প্রিয়ব্রতর স্নায়ুগুলো বুকের কাছে কেউ টেনে ধরল। মুখে গন্ধ বললে তো একটাই মানে হয়।
”কে বলল গন্ধ?” সে ধমকে উঠল। ”কি আবোলতাবোল বকছিস?”
তিলু ন্যাতার জল নিঙড়ে বালতিতে ফেলছে। গম্ভীর চোখে একবার তাকিয়ে বলল, ”কলঘরে গিয়ে বমিও করেছে। আমি ধরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলুম।”
বেরিয়ে গেল তিলু। প্রিয়ব্রত খাটে বসে মাথা নামিয়ে রাখল। ঝিম ঝিম করছে শরীর। শেষকালে তার কপালেই এমনটা ছিল। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে হিতু মদ ধরল! এই তো সেদিন স্কুল ফাইনালের রেজাল্ট জেনে এসে তাকে প্রণাম করল। ফার্স্ট ডিভিশন! ‘মা’কে প্রণাম কর হিতু। ওর আশার্বাদ নে।’ হিতু কতক্ষণ ধরে ছবিটায় মাথা ঠেকিয়ে রেখেছিল! ওর এগারো বছর বয়সে মা মারা যায়।
মঙ্গলার ছবির দিকে তাকিয়ে প্রিয়ব্রতর চোখ জলে ভরে এল। সেই হিতু এখন চাকরি করছে, মদ খাচ্ছে। একই সঙ্গে সে বাবা আর মায়ের ভূমিকা পালন করেছে। বিয়ে করার চাপ প্রত্যাখ্যান করেছে মা-মরা ছেলের মুখ চেয়ে।
‘বাবা দুশো টাকা দাও তো, জুতো কিনব।’
অ্যাতো টাকার জুতো! কিন্তু কথাটা সে মুখ থেকে বার করতে পারেনি। শুধু বলেছিল, ‘ফরেন জুতো?’
গিটার কিনব, জিনস কিনব, টেপ রেকর্ডার কিনব, দার্জিলিং যাব…প্রশ্ন না করে সে হিতুকে খুশিতে রাখার চেষ্টা করে গেছে। খুব ভালো ছাত্র ছিল। চমৎকার ইংরিজি লেখে।
প্রথম ওর মুখে সিগারেটের গন্ধ পেয়েছিল কবে? প্রিয়ব্রত মনে করার চেষ্টা করল। পাঁচ বছর আগে মঙ্গলবার মৃত্যুবার্ষিকীর দিনে। ওই দিনটায় সে উপোস করে। ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র হিতু বলেছিল, ‘তোমার গ্যাস্ট্রিক আছে, নিজের শরীরটা আগে দেখো। না, না, সেন্টিমেন্টে আঘাত আমি মোটেই করছি না, …এসব আমি বুঝি, কিন্তু সবকিছুর একটা প্র্যাক্টিক্যাল দিকও তো আছে?’
হিতু তখন থেকেই এসব বোঝে! কী মনে করে ‘এসব’ কথাটা বলেছিল? মায়ের প্রতি বাবার ভালোবাসা, আনুগত্য এটা ওর কাছে জীবনের আনপ্র্যাক্টিক্যাল দিক!
কথা বলার সময় ওর মুখ থেকে সিগারেটের গন্ধ পেয়েছিল। তাতে যতটা সন্ত্রস্ত হয়েছিল তারও বেশি অবাক হয়েছিল ওর বয়স্কতা দেখে। কবে এতবড়ো হয়ে উঠল যে প্র্যাক্টিক্যাল দিক দেখার চোখ খুলে গেছে! মুখের ওপর বাবাকে সমালোচনা করার জোর পেল কীভাবে? তখন সে বলতে পারত, নিজের চরকায় তেল দাও হিতু, আমাকে আমার কাজ করতে দাও।
বলতে পারেনি। ভয় হয়েছিল, একমাত্র ছেলেটা তাহলে দূরে সরে যাবে। হিতু কখনো তাকে অসম্মান, অবহেলা করেনি। হাসিখুশি, আমুদে কিন্তু চট করে রেগেও ওঠে। তর্ক করার ঝোঁক ছোটো থেকেই। প্রিয়ব্রত ওকে বরাবর প্রশ্রয় দিয়ে গেছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে দেওয়াটা উচিত হয়নি। কিন্তু এখন ও শাসনের বাইরে নিজের এলাকায় চলে গেছে।
”বাজার যাবেন না?” দরজায় দাঁড়িয়ে তিলু। ”আটটা তো বাজে!”
”শরীরটা খারাপ লাগছে, বাজারে আর যাব না।…নিরিমিষেই চালিয়ে দে। অফিসেও যাব না।”
