”আমি যেতে পারব।”
প্রিয়ব্রত তার দু’ধারের অন্ধকারের দিকে তাকাল। কেউ এগিয়ে আসছে না।
”তুমি নিরাপদে পৌঁছলে কিনা সেটা বুঝব দরজা বন্ধ করার শব্দে। শব্দ করে বন্ধ করবে, কেমন?”
নিরু অন্ধকারে সুড়ঙ্গে ঢুকে গেল কথা না বলে, একবারও পিছনে না তাকিয়ে। প্রিয়ব্রত তাকিয়ে আছে কান সজাগ করে। কাঠের সঙ্গে কাঠের ধাক্কা লাগার একটা শব্দ তার দরকার। তাহলেই সে নিশ্চিন্ত হবে। তার কর্তব্য, দায় থেকে সে মুক্তি পাবে।
সে অপেক্ষা করছে। নিরু একটা শব্দ তৈরি করে পাঠিয়ে দিলেই সে জেনে যাবে মিছিমিছিই এই ভয়। ‘হয়তো দেখব সে সব কিছুই হয়নি…শুধু শুধুই ভয় পাচ্ছি।’ তাই ঘটছে পঁচিশ বছর ধরে। সে শুধু কিছু একটার জন্য অপেক্ষা করে গেছে। ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়েছে। এখন সে তেল ফুরিয়ে যাওয়া ল্যাম্পটার থেকে আর বেশি কিছু নয়।
এইরকম নেভানো ল্যাম্প হাজারে হাজারে কলকাতায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। খাচ্ছে, ঘুমোচ্ছে, সিনেমা দেখছে, পদ্য লিখছে, অফিস করছে, মদ খাচ্ছে, বেশ্যার কাছে যাচ্ছে, মন্দিরে পুজো দিচ্ছে, ছেলেমেয়েকে পড়াচ্ছে…কতরকমেই জীবন যাপন করছে। কিন্তু তার মতো ওরাও কি ধরা পড়ে যাওয়ার মতো কিছুর অপেক্ষা করছে? ওরা যে আর জ্বলছে না সেটা কি লুকোতে পেরেছে?
প্রিয়ব্রত অপেক্ষা করছে। এতক্ষণে শব্দটা এসে যাওয়ার কথা। তাহলে কি নিরু পৌঁছয়নি? মাঝপথে কেউ ওর মুখ চেপে ধরল নাকি! ছমছম করে উঠল তার বুক। একবার ঢুকে দেখে আসবে, নাকি আর একটু অপেক্ষা করবে? সোজা গিয়েই ওদের দরজা। দিনের বেলা হলে এইখান থেকেই দেখা যেত।
”কাকে চাই আপনার?”
চমকে উছে প্রিয়ব্রত মোমবাতিটা শক্ত করে ধরে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল। তিন হাত দূরে একটা লোক। সাদা গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরা। মাঝবয়সি বলেই মনে হচ্ছে টাকের জন্য।
”এই গলির মধ্যের শেষ বাড়িটায়, খুদিকেলোকে খুঁজতে এসেছি, কিন্তু যা অন্ধকার!”
”ওর একটা দর্জির দোকান…।”
”হ্যাঁ, হ্যাঁ, জানি।”
”সেখানে যান, পাবেন।”
লোকটা নিঃশব্দে পিছনের বাড়িতে ঢুকে গেল। প্রিয়ব্রত আর অপেক্ষা করল না। সে ফিরে এসে নিজের সদর দরজাটা ঠেলে খোলার সঙ্গে সঙ্গেই নৈঃশব্দ্য ভেঙে এ-বাড়ি ও-বাড়ি থেকে কথা বলার শব্দ ফুটে উঠল। লোডশেডিং শেষ। ইলেকট্রিক বালবের আলোয় কড়ি বরগা, ঝুল, কালি, নোনা-ধরা দেয়াল আবার পরিচিত লাগছে। আপনা থেকেই সে হাতটা তুলে ঘড়িতে সময় দেখতে গিয়ে হাতের মোমবাতিটার দিকে প্রথমে তাকাল। আশ্চর্য লাগল তার, এতক্ষণ সে এটাকে বয়ে বেড়াচ্ছে!
তিনটে ইংরিজি কাগজ এখন রাখা হচ্ছে। হিতু বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত সেগুলো তন্ন তন্ন করে পড়ে। কলিং বেলের শব্দ হবার আগে সে মোটরবাইকের এঞ্জিনের শব্দটার জন্য অপেক্ষা করে। বাইকটা বাড়ির গলির মধ্যে ঢোকানো যায় না। হিতুর এক বন্ধু, তিনটে বাড়ি আগে থাকে। তাদের দরজাটা চওড়া, সেখানেই সিঁড়ির নীচে বাইকটা রাত্রে রেখে দেয়। বন্ধু জানিয়েছে, এত রাতে দরজা খুলে দিতে তাদের অসুবিধা হচ্ছে তাই ধীরুদার উঠোনে রাখার ব্যাপারে হিতু তাড়াতাড়ি কথা বলতে বলেছে।
প্রিয়ব্রত আজ আলো নিভিয়ে শুয়ে থাকল। কাগজটা পড়ার চেষ্টা করেছিল, পারেনি। বারবার তার চোখের উপর দিয়ে সারা দিনের কিছু কিছু ছবি সার দিয়ে চলতে থাকায় সে কাগজ রেখে দিয়েছে।
অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো গলিটা থেকে একটা শব্দ পাওয়ার জন্য কেন সে উৎকণ্ঠিত হয়েছিল? নিরুর নিরাপদে বাড়ি ফেরার প্রমাণ পাওয়া কি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তার কাছে? ওকে খুন বা হরণ করার জন্য অন্ধকারে ওৎ পেতে থাকার কি কোনো দরকার হবে? দিনেরবেলাতেই তো এসব কাজ এখন করা যায়!
করা যদি না হয় অর্থাৎ নীরু যদি পরশু পর্যন্ত বেঁচে থেকে কোর্টে হাজির হতে পারে তাহলে মেয়েটা সেখানে কী করবে? ও কি নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করবে না? সেটাই তো উচিত, স্বাভাবিক!
কিন্তু ওর মুখটা কেন স্বাভাবিক ছিল না? মোমবাতির কাঁপা আলোর জন্যই কি সে পড়তে পারল না নিরুর চাহনির ভাষা? প্রচণ্ড আতঙ্ক বা মরিয়া ভাব কি হতাশা থাকলেই স্বাভাবিক হত, কিন্তু কিছুই ওর চোখে বলা ছিল না। ভিতরের শূন্যতা কি চোখ দিয়ে ফুটে ওঠে? এতগুলো বছর কত লোক তার চোখের দিকে তাকিয়েছে কিন্তু কেউ তো ইঙ্গিতেও তাকে জানায়নি: ‘তোমার ভেতরে মনে হচ্ছে আর কিছু নেই’, ‘আপনার মধ্যে কেমন যেন খালি খালি ভাব দেখা যাচ্ছে!’
মোমবাতিটা নেভাবার পর নিরুর মুখ আর সে দেখার সুযোগ পায়নি। প্রিয়ব্রত বারবার মনে করার চেষ্টা করল। প্রোজেক্টারে দেখানো স্লাইডের মতো মুখটা বারবার সরে যাচ্ছে। ধারা বর্ণনার মতো ওর কথাগুলোও সেই সঙ্গে ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে সরে যাওয়া মুখের সঙ্গে।
‘দুঃখ হত, কষ্ট হত, ছত্রিশ দিনের রোজ পেয়েছিলুম।’
‘প্রাণের মায়া তো সবারই আছে, তাই না?’
‘যে জন্য এত ভয়, হয়তো দেখব সে সব কিছুই হয়নি!’
‘তাহলে কি করব? ওরা কি সত্যি সত্যিই আমাকে মেরে ফেলবে?’
‘আপনি আমাকে লুকিয়ে রাখতে পারেন?…ওরা ছাড়া পেয়ে গেলে আমি বেঁচে যাব।’
না, তোমাকে আমি লুকিয়ে রাখতে পারব না। দিনের পর দিন কোনো মানুষের পক্ষে তালা বন্ধ ঘরে থাকা সম্ভব নয়। ছেলেমানুষ, ছেলেমানুষ! এভাবে বেঁচে থাকা যায় না।
