”আজকাল যা অবস্থা হয়েছে, কোনো লোককে মেরে ফেলাটা খুব শক্ত কাজ নয়। কাগজে রোজই তো দেখি মেয়েদের লাশ রাস্তার ধারে কী মাঠের এখানে ওখানে পড়ে থাকছে।”
”তাহলে কী করব? মা বলছে পালিয়ে যা।”
নিরুর ব্যাকুল স্বরটা একতলার নোনা ধরা দেয়াল শুষে নিল। একটা আরশোলা মেঝে থেকে উড়ে দেয়ালে বসে শুঁড় নাড়াচ্ছে। কড়ি আর বরগাগুলোয় ঝুল, তাতে মোমবাতির আলোর কম্পন।
”এই তিনটে লোক কিন্তু সত্যিই সত্যিই আমাকে…আমি কিন্তু একটুও মিথ্যে বলছি না, আপনি বিশ্বাস করুন। আমার যে কী কষ্ট হয়! মনে পড়লে এখনও আমি কাঁদি…আমি তাহলে কী করব? আপনি বলে দিন না?”
প্রিয়ব্রতর মনে হল এই অনুনয় তার কাছ থেকে পরামর্শ চেয়ে নয়, যেন জীবনভিক্ষা করছে। দুটি চোখ ধীরে ধীরে জলে ভরে উঠছে। মুখটা যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গিয়ে নীচু হতে হতে পাশের দিকে ফিরিয়ে রাখল লজ্জায়। নিজের অসহায়তা নিরু বুঝতে পারছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রিয়ব্রতও বুঝতে পারল সে নিজেও কত অক্ষম।
”তুমি পালিয়ে যাও। সত্যি কথা কোর্টে দাঁড়িয়ে বললে ওরা তোমাকে ছেড়ে দেবে না।”
প্রিয়ব্রত ঝুঁকে মুখের কাছে মুখ আনল তার ডান হাতটা আপনা থেকেই উঠে এসে নিরুর কাঁধের উপর যেন বিশ্রাম নেবার জন্য রাখল। এতে কি মেয়েটি ভরসা পাবে? কিংবা সাহস?
”আপনি আমাকে লুকিয়ে রাখতে পারেন?”
”আমি? কোথায় রাখব?”
”এই ঘরে। যেমন তালাবন্ধ আছে ওইভাবেই থাকব।”
”পাগল হয়েছ!…চলো পৌঁছে দিয়ে আসি।”
”না। আপনি বলুন, এই ঘরেই আমি থাকব, থাকতে ঠিক পারব।”
হাতটা নিরু আঁকড়ে ধরেছে। সরু, দুর্বল আঙুল। কবজির উপরে ফুলে রয়েছে গাঁট। ঘেমে ওঠায় হাতের লোম পাণ্ডুর চামড়ায় লেপটে, নাকের নীচেও বিজবিজে ঘাম।
”তা হয় না।”
”কেন হবে না? এখানে থাকলে ওরা জানতে পারবে না, কোর্টে নিয়ে যাবার জন্য পুলিশও আমাকে খুঁজে পাবে না। কোর্টে না গেলে, বাবা বলেছে মামলা কেঁচে যাবে। ওরা ছাড়া পেয়ে গেলে আমি বেঁচে যাব।”
”হয় না হয় না, তুমি এখনও ছেলেমানুষ, ঠিক বুঝবে না অসুবিধেটা কোথায়। জানাজানি হবেই, তখন লোকে কী বলবে? তুমি এখন বাড়ি চলো।”
কর্কশ হয়ে উঠল গলাটা, রুক্ষ শোনাচ্ছে, কিন্তু সে নিরুপায়। প্রিয়ব্রত দুঃখ পাচ্ছে ওর অবস্থাটা বুঝে কিন্তু সে কোনোরকম সাহায্যই করতে পারবে না। ছেলেমানুষের কথা শুনে ছেলেমানুষি করা সম্ভব নয়। তাদের দুজনের বয়সের পার্থক্যের মতো, জগৎও দুটো।
হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে সে খিল নামাল। জ্বলন্ত মোমবাতি হাতে নিয়ে রাস্তা দিয়ে যাওয়া যায় না। ফুঁ দিয়ে নেবাবার আগে সে নিরুর মুখের দিকে তাকাল। একদৃষ্টে তার দিকে নিরু তাকিয়ে। চাহনিতে কী যে রয়েছে প্রিয়ব্রত বুঝতে পারল না।
”সাবধানে পা ফেলে এসো।”
নিরুর হাত ধরল সে। অন্য হাতে নেবাল মোমবাতি। শব্দ না করে দরজা ভেজিয়ে দিল সন্তর্পণে।
যেন মরা মানুষের হাত। প্রিয়ব্রত আলতো টান দিল। চাকা লাগানো খেলনার মতো নিরু হাঁটছে। জ্যাঠামশাইয়ের ঘরে উজ্জ্বল আলো। ইনভারটার ব্যাটারি গত বছর কিনেছে। বাড়িতে এমন একটা মেয়েকে লুকিয়ে রেখে দিয়েছে জানলে এই বাড়ির লোকেরা কি বলবে? বুড়ো বয়সে একটা বউ-মরা লোকের চরিত্র নষ্ট হওয়ার নমুনা হিসেবে পাড়ায় তাকে নিয়ে ফিসফিস আর হাসাহাসি হবে। অথচ কাউকে সে বলতে পারবে না আসল কারণটা।
গলি থেকে বেরিয়ে গুপি বসাক লেনে পা দিয়ে সে নিরুর হাত ছেড়ে দিল। এবার বাঁদিকে যেতে হবে। রাস্তাটা তিরিশ মিটার গিয়ে বাঁদিকে ঘুরে পড়েছে কালীমোহন মিত্র স্ট্রিটে। মোড়ে একটা টিউবওয়েল, কয়লার দোকান, রাং-ঝালের দোকান আর একটা ছাপাখানা। আবার বাঁদিকে তিরিশ মিটার গেলে নিরুদের গলি। কালীমোহন মিত্র স্ট্রিটের উপর সামনের বাড়িটা তার দোতলার নীচ দিয়ে সুড়ঙ্গের মতো ভিতরে চলে গেছে গলিটা। এরই শেষে নিরুদের দরজা।
অন্ধকারে হুঁশিয়ার হয়ে হাঁটার জন্যই পিছনের বাড়ির গলিতে পৌঁছতে মিনিট দুই সময় লাগল। এই দু মিনিট তারা কথা বলেনি। প্রিয়ব্রতর সবকটি ইন্দ্রিয় নিবদ্ধ ছিল ভয় পাওয়ার মতো ঘটনার সামনে পড়ার জন্য।
অন্ধকার ভাগ ভাগ হয়ে গেছে হারিকেন আর মোমবাতির আলোয়। কোনো ভাগ থেকে একটি লোকও বেরিয়ে এসে তাদের পথজুড়ে সামনে দাঁড়াল না। প্রিয়ব্রত হাতের মুঠি শিথিল করল নিরুদের সুড়ঙ্গের মতো গলিটার সামনে এসে। এরমধ্যে কেউ কি লুকিয়ে আছে?
ছুরিটা তলপেটে ঢুকিয়ে ডাইনি কি বাঁয়ে টানবে। নরম নাড়িভুঁড়ির মধ্য দিয়ে ইস্পাতটা স্বচ্ছন্দে চলবে। তারপর টেনে বার করা। সাত কি আট সেকেন্ড বড়োজোর লাগবে।
নিরু প্রথমেই চিৎকার করে উঠতে পারবে না। শকটা সামলে নিয়ে প্রথমে একটা গোঙানির মতো শব্দ ওর মুখ থেকে বেরোবে। শ্বাস না টেনে চিৎকার করা যায় না। শ্বাস যতক্ষণে টানবে ততক্ষণে লোকটা ছুটে কিংবা হেঁটে গলি থেকে বেরিয়ে আসবে কিংবা আর একবার ফলাটা পেটে ঢুকিয়ে দিয়ে নিশ্চিত হয়ে নেবে।
”তুমি এবার কি যেতে পারবে, না দরজা পর্যন্ত সঙ্গে যাব?” উদ্বিগ্ন স্বরেই কথাটা বলা উচিত কিন্তু প্রিয়ব্রতর নিজের কানেই স্বরটা পাওয়ার মতো ঠেকল।
নিরু সুড়ঙ্গটার দিকে তাকাল। অন্ধকারে ওর মুখ সে দেখতে পাচ্ছে না। ফুঁ দিয়ে মোমবাতিটা নেবাবার আগে সে শেষবার নিরুর মুখ দেখেছে। মুখে কিছুই বলার ছিল না।
