কিন্তু নিরুর মুখ আর মোমবাতির কাঁপা আলো পরিস্থিতিকে প্রকট করে তুলে সেটাকেই অবাস্তব পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা কি ভয় পাচ্ছে না? দুশো টাকার ওপর রোজগার করে ও কি অন্য একটা জীবন দেখতে পেয়েছে? সে নিজেও কি পঁচিশ বছর আগে এইরকম একটা জীবনের জন্য ফণী পালের হাতে নিজেকে তুলে দেয়নি! প্রথমে তিনশো টাকা এখন সেটা হয়েছে পাঁচশো।
‘প্রিয়, জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে, তোমারও মাইনে বেড়েছে। তিনশোয় আর পারা যাচ্ছে না। কিছু বাড়াও।’
‘কত?’ ভীত চোখে সে তাকিয়ে থেকেছিল।
ফণী পাল শুধু বাঁ হাতের পাঁচটা আঙুল দেখায়। আংটিগুলোর দিকে তাকিয়ে থেকে সে মাথাটা হেলিয়ে আড়চোখে পাশের টেবিলে তাকায়। ভৌমিক মন দিয়ে একটা ফাইল থেকে চিঠি বার করায় ব্যস্ত ছিল। মন দিয়ে কিছু করলে বুঝতে হবে ও কান দুটো সজাগ করে রেখেছে।
”আচ্ছা একটা কাজ করা যাক। আমিই বরং ডাকি। আমার গলা শুনলে ওরা বুঝতে পারবে না। তিরু, অরু, বরু…কার নাম ধরে ডাকব?”
”ডাকাডাকির দরকার নেই। বাবা কি বলেছিল আমাকে নিয়ে যাবে এখান থেকে?”
”না, তাতো কিছু বলেনি! তবে বাড়ি ফিরে তোমায় না দেখলে কেলো নিশ্চয়ই এখানে খোঁজ করতে আসবে। তুমি কি বাবার জন্য অপেক্ষা করবে?”
নিরু ইতস্তত করল। প্রিয়ব্রতর মনে হল, অপেক্ষা করতেই চায় কিন্তু কেলো যদি না আসে! কিংবা অনেক রাত করে আসে?
”তোমার বোধ হয় অস্বস্তি হচ্ছে।”
”না না, হচ্ছে না। আপনারই বরং হয়তো খারাপ লাগছে।…এমন একটা মেয়ে ঘরে বসে থাকলে-।”
নিরু উঠে দাঁড়াল।
”এমন একটা মেয়ে বললে কেন? কি এমন করেছ যে তোমায় আমি অন্যরকম ভাবব? বোসো, আমি তোমাদের বাড়িতে গিয়ে, কালীমোহন মিত্তির স্ট্রিট দিয়েই যাব, বোনেদের কাউকে ডেকে পগাড়ের দরজা খুলতে বলি।”
”না থাক, আপনাকে মিছিমিছি বাবা ঝামেলায় জড়াল। আমি একাই যেতে পারব। যে জন্য এত ভয়, হয়তো দেখব সে সব কিছুই হয়নি। রাস্তায় কেউই আমার জন্য দাঁড়িয়ে নেই, শুধু শুধুই ভয় পাচ্ছি।”
কথাগুলো শুনতে শুনতে প্রিয়ব্রতর মাথার মধ্যে রক্তের ঝলক লাগল। একটা সাঁই সাঁই আওয়াজ সে শুনতে পাচ্ছে। ছোটোবেলায় বাবা-মার সঙ্গে পুরী গেছল। সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পায়ের গোছ ডুবিয়ে দিয়ে ফিরে যাচ্ছিল তখন পায়ের তলা থেকে বালি সরে যাওয়ার শিরশিরানিটা সে এখন আবার অনুভব করছে।
‘শুধুশুধুই ভয় পাচ্ছি’…এই কথাটা শোনার জন্য সে বছরের পর বছর অপেক্ষা করে যাচ্ছে। ফণী পাল ছাড়া আর কেউ জানে না, জানবেও না। ফণী পাল অমর নয়, সত্তরের কাছাকাছি, একদিন মরবেই। ‘যে জন্য এত ভয় হয়তো দেখব সে সব কিছুই হয়নি’….সে সসম্মানে রিটায়ার করে বেরিয়ে আসবে অতুলচন্দ্র ঘোষ হয়েই। শুধু নামটা আর বি-এ সার্টিফিকেটটাই অন্যের। তাছাড়া তার পরিশ্রম, বুদ্ধি, কাজ, আনুগত্য, নিয়ম মানা সবই তো নিজের।
”চলো আমি তোমার সঙ্গে যাব। দেখব সত্যি হয় কি না তোমার কথাটা।” নিরু প্রশ্ন নিয়ে তাকাল।
”এইমাত্র যেটা বললে, শুধু শুধুই ভয় পাচ্ছি। এক মিনিট।”
প্রিয়ব্রত পকেট থেকে চাবির রিঙ বার করে আলমারির পাল্লা খুলল। ন্যাপথলিনের গন্ধ বরাবরের মতোই বেরিয়ে এল। খামে ভরা মাইনের টাকা বরাবরই সে মঙ্গলার স্মৃতিমাখা বিবর্ণ দুটো সিল্কের রঙিন শাড়ির মাঝে ঢুকিয়ে রাখে। রাখার সময় বরাবরের মতোই একবার সন্দিগ্ধ চোখে পিছনে তাকাল।
নিরু দেখছিল, চোখাচোখি হতেই মুখ ঘুরিয়ে নিল। মোমবাতিদানটা তুলে নিয়ে সে বলল, ”চলো।”
সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে প্রিয়ব্রত রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে বলল, ”তিলু বেরোচ্ছি, সদর দরজাটা বন্ধ করে দিসনি যেন, এখুনি ফিরব।”
মোমবাতি ধরা হাতটা তুলে সে ধীরে ধীরে নামতে লাগল। দোতলায় সে দাঁড়াল। সিঁড়ির দরজার চৌকাঠটায় হোঁচট খাবার সম্ভাবনা আছে নতুন লোকের। ভাড়াটেদের দরজা বন্ধ। ভিতর থেকে বাসন রাখার শব্দ এল। অশোকবাবুরা তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়ে।
”তুমি আগে আগে নামো। আলোটা তাহলে পাবে। সিঁড়িগুলো ক্ষয়ে গেছে, দেখে দেখে না নামলে…তুমি আবার হাওয়াই চটি পরে। কাপড়টার কি হয়েছে দেখেছ কাদার ছিটে লেগে?”
একতলা। ছোটো উঠোনের পাশ দিয়ে সরু রক। উঠোনের একদিকে দরজা, খুললেই পগাড়। রকের পাশে দুটো ঘর, তালা দেওয়া।
”ঘর দুটোয় কেউ থাকে না?”
প্রিয়ব্রত দাঁড়াল। ”এক সময় ভাড়াটে ছিল, এখন খালিই পড়ে আছে। ভাড়া আর দোব না।”
”কেন?”
”এমনি। বাড়িতে লোক যত কম থাকে ততই শান্তি।”
সদর দরজার খিলে হাত রেখে, কী ভেবে প্রিয়ব্রত ঘুরে দাঁড়াল। ”একটা কথা জিজ্ঞাসা করব। ঠিক ঠিক উত্তর দেবে?”
নিরুর চোখে বিস্ময় ও উদ্বেগ ফুটে ওঠামাত্র প্রিয়ব্রত তাকে আশ্বস্ত করার জন্য বলল, ”তেমন কিছু নয়, এটাকে কৌতূহল বলতে পারো।”
প্রিয়ব্রত পূর্ণদৃষ্টি ওর মুখের উপর রাখল। নিরু আঁচলটা কাঁধের উপর টেনে প্রায় অস্ফুটে বলল, ”বলুন?”
”কোর্টে যখন তোমায় শনাক্ত করতে বলবে, তুমি তখন কি করবে?…ওদের কি তুমি চিনিয়ে দেবে?”
কথাটা বুঝে ওঠার জন্য নিরু কয়েক সেকেন্ড সময় নিল তারপরই ফ্যাকাসে হয়ে গেল মুখটা।
”কী করব?”
”সেটাই তো জানতে চাইছি।”
”যদি বলি এই লোকগুলোই আমাকে-” গলা ভেঙে নিরুর কথা বন্ধ হয়ে গেল। ঢোঁক গিলে ফিসফিস করে বলল, ”ওরা কি সত্যিই সত্যিই আমাকে মেরে ফেলবে।”
