নিরু আট মাস কাটিয়েছে। তার এখনও শুরুই হয়নি। যদি হয়? সে তীক্ষ্ন চোখে তাকাল। মুখ নামিয়ে নিরু অন্যমনস্ক চোখে মেঝেয় তাকিয়ে। স্বীকার করতে হয়তো লজ্জা পাচ্ছে।
”বলো। এখনও কি তোমার লজ্জা করে?”
প্রিয়ব্রত নিজের গলার আওয়াজে অপ্রতিভ হল। প্রেম নিবেদনের সময় নাটকের প্রেমিকদের স্বর এই রকম সর্দিভরা হয়ে যায়।
নিরু যেন ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলল, ”লজ্জা! কই না তো! লজ্জা করবে কেন?”
”প্রথম প্রথম করেনি?”
”দুখ্যু হত, কষ্ট হত। ছত্রিশ দিনের রোজ পেয়েছিলুম। মাঝে একটা দিন বাংলা বনধ হল, নইলে-সাঁইত্রিশ দিন হত। দুশো টাকার ওপর রোজগার করেছিলুম।”
নিরুর মুখে এই প্রথম সে একটা স্বচ্ছ প্রশান্ত আবরণ নেমে আসতে দেখল। একটা হাসি ঠোঁটের উপর দিয়ে পিছলে চলে গেল।
”কাজটা খুইয়ে আফসোস হচ্ছে?”
”অনেকগুলো টাকা তো! বাবাকে একদিন বললুম, একবার গিয়ে খোঁজ নাও না যদি কাজটা আবার পাওয়া যায়। বাবা ফিরে এসে বলল, কাজ দেওয়া তো দূরের কথা, তোকে বাড়ি থেকেই বেরোতে বারণ করেছে। পুলিশও বাবাকে বলেছে আপনার মেয়ে কিন্তু খুব ডেঞ্জারে আছে। বাড়ি থেকে যেন বেরোয় টেরোয় না।…জানেন বাচ্চচা বলেছিল নার্সিংহোমে আয়ার কাজ পাইয়ে দেবে। ওর মা আয়ার কাজ করে তো!”
প্রিয়ব্রত লক্ষ করে যাচ্ছে। নিরুর মধ্যে চাপা উত্তেজনার একটা প্রভাব কাজ করছে। তার জীবনের জন্য অনেকেই ভাবছে। তারও যে একটা গুরুত্ব আছে এটা জানতে পারার বিস্ময় ওর এখনও কাটেনি।
”প্রাণের মায়া তো সবারই আছে, তাই না?”
প্রিয়ব্রত মাথা নাড়ল। নিশ্চয়, সবারই আছে। সবাই বাঁচতে চায়। সে নিজেও চায় কিন্তু নিরুর মতো করে নয়। তার পৃথিবীটা আরও ছড়ানো, অনেক জটিল, অনেক কিছু নিয়ে জড়ানো।
”বাচ্চচাও কি তোমাকে-?”
”না না, ও কিছু করেনি। ওই অমর আর গুলেই আমাকে…।”
”তাহলে পুলিশের কাছে তিনজনের নাম বললে কেন?”
”বাচ্চচার নাম কেন যে বললুম!…ছেলেটা কিন্তু ভালো। তখন তো মাথার ঠিক ছিল না। আর আমার জন্য কাজের চেষ্টা করবে না।” নিরু হতাশ চোখে তাকিয়ে রইল।
”তিলু।” প্রিয়ব্রত ডাকল। ”একটা মোমবাতি দিয়ে যা। এই আলোটার বোধহয় তেল ফুরিয়েছে।”
নিরু মুখ পিছনে ঘুরিয়ে জানলার দিকে তাকাল। ”এই ঘরটায় খুব হাওয়া আসে।”
”দক্ষিণটা অনেক দূর পর্যন্ত খোলা তো।”
নিরু উঠে গিয়ে জানলায় দাঁড়াল। মুখ গরাদে লাগিয়ে নীচে তাকিয়ে নিজেদের ছাদটা দেখছে। ”ডাকলে শুনতে পাবে কি?”
”না না, ডাকাডাকি করতে যেয়ো না। গলার আওয়াজ…ধারেকাছে কে কোথায় রয়েছে…জানলা থেকে সরে এসো।” বলার পরই প্রিয়ব্রতর মনে হল, ধারেকাছে বলতে তো নীচের পগাড়টা। সেখানে এই অন্ধকারে নিরুর জন্য কে বা কারা আর অপেক্ষা করবে?
নিরুকে কাছাকাছি রাখার, ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার ইচ্ছে তার ভিতরে কখন যে তৈরি হয়ে উঠল, প্রিয়ব্রত সেটা হদিশ করতে পারল না। তার একটা যে-কোনো ধরনের ভরসা বা সমান স্তরের অনুভব কি এখন দরকার?
জ্বলন্ত মোমবাতি পিতলের বাতিদানে বসিয়ে তিলু টেবিলে রাখল। ল্যাম্পটা নিয়ে সে বেরিয়ে যাবার সময় প্রিয়ব্রত সেটা লক্ষ করল, আড়চোখে নিরুর দিকে তাকাল। কেন তাকাল? পিছনের বাড়ির মেয়েটাকে নিয়ে বাবু হঠাৎ কেন ঘরে এল, এটাই বোধহয় জানতে চায়, কিছু কি খারাপ উদ্দেশ্যের কথা ভাবছে? ও কি জানে নিরু রেপড হয়েছিল? নিশ্চয় হিতুকে বলবে, ‘বাবু একটা মেয়েকে নিয়ে এসে ঘরে বসে কথা বলছিল।’ মেয়েটা যে পিছনের বাড়ির বাল্যবন্ধু খুদিকেলোর মেয়ে, সেটা হয়তো ইচ্ছে করেই চেপে যাবে। এটা ওটা হিতুর কাছ থেকে পায়। তিলু ওকে সব খবরই দেয়।
হিতু ছাদ থেকে নিরুকে কি আর দেখেনি। হিতু কি জিজ্ঞাসা করবে, মেয়েটা কে? বোধহয় করবে না। তাদের মধ্যে কথাবার্তা ক্বচিৎই হয়। সকালে অফিসে যাবার আগে যতটুকু সময়, তার মধ্যে দু-চারটে দরকারি কথা শুধু বলা যায়।
”রোজ সকালে ভেজানো ছোলা খাওয়াটা ভালো। দু’দিন ধরে দেখছি পড়েই রয়েছে, খেয়ে নিস।”
”বাজারে দেখা হল ধীরুদার সঙ্গে। ওদের উঠোনে তোর মোটরবাইকটা রাখার কথা বললাম। ওপরটা ঢাকা, রোদবৃষ্টি লাগবে না। মনে হল, মাসে গোটা তিরিশ টাকা পেলে রাজি হয়ে যাবে, কথা বলব?”
‘আজ বড়োপিসিমার মেয়ে রাজুদি এসেছিল…আগে ওদের বাড়ি হয়ে। তোকে দেখবার খুব ইচ্ছে, একদিন যাস না, টালা আর কতদূরই বা!’
নিরু ফিরে এসে আবার খাটে বসল। একই জায়গায়, একই ভাবে।
”আলো আসুক, আমি নীচে গিয়ে পগাড়ের দরজা খুলে তোমাকে পৌঁছে দেব।…তোমাদের দরজা ধাক্কালে শুনতে পাবে তো?”
”পাবে। তবে কখনো তো কেউ ধাক্কায়নি, তাও আবার রাতে। ভয়টয় পেয়ে হয়তো খুলবে না।”
”হ্যাঁ ঠিকই বলেছ। ভয় পাবার কারণ তো-।”
প্রিয়ব্রত আবার তীক্ষ্ন করল নজর। হাওয়ায় মোমবাতির শিখাটা বাঁকা হয়ে থরথর করছে। নিরুর মুখ ভয়ে না বিরক্তিতে লম্বাটে লাগল, সেটা ঠিক করতে পারল না। পরিস্থিতিটাই তার কাছে অবাস্তব লাগছে।
এক এক রবিবার দুপুরে গাঢ় ঘুমের পর ছাদে বেরিয়ে এসে শিথিলভাবে পাঁচিলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে সে এই রকম অবাস্তবতার মধ্যে পড়েছে। আকাশ থেকে ধীর শান্ত আলো নেমে এসে উঁচুনিচু বাড়িগুলোর শ্যাওলা ধরা, পলেস্তরা খসে পড়া দেয়ালে জমে থাকে। টবের গাছ, ফুল, জানলার ফ্যাকাসে, পর্দা, অ্যান্টেনায় কাক, ভাঙা পাইপের পাশে অশ্বত্থ চারা, তারে ঝোলানো কাপড়, কার্নিশে ঘুমন্ত বেড়াল, সবকিছুর মধ্যে আশ্চর্য এক সমাহিত মন্থর ভাব! সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখতে দেখতে ধাঁধায় পড়ে। তার প্রতিদিনের জীবনকেই তখন অবাস্তব মনে হয়।
