ম্লান আলোয় নিরুর মুখটা করুণভাবে পরের ধাপে নেমে বড়ো বীভৎস দেখাচ্ছে। প্রিয়ব্রতকে এই মুখটি মনে পড়িয়ে দিল কুড়ি বছর আগের একটা দৃশ্য।
.
এই ঘরেই সে উবু হয়ে বসে দু হাতে ফণী পালের দুটো পা চেপে ধরে রয়েছে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মঙ্গলা। পাশের ঘরে ঘুমোচ্ছে হিতু।
”ফণীদা আপনাকে তো পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছি। তখন বলেছিলেন আর দিতে হবে না। তাহলে আবার এখন কেন…মাসে মাসে তিনশো দিলে আমাদের চলবে কি করে? লোয়ার ডিভিশন ক্লার্কের মাইনে কত তা আপনি জানেন। প্রায় আদ্দেক মাইনে আপনি চাইছেন।”
”দ্যাখো প্রিয়, মাইনের এক পয়সাও তোমার পাওয়ার কথা নয়। এই চাকরিটা কোনোদিন কি তুমি পেতে যদি না আমি ব্যবস্থা করে দিতুম? আমিই অতুলচন্দ্র ঘোষের বি-এ সার্টিফিকেট জোগাড় করে তার নামে তোমাকে পরীক্ষায় বসাই। তোমার অফিসের বড়োবাবু সুবল ভটচাজ আমার নিজের লোক। তাকে দু হাজার খাওয়ালুম। সে ভেতর থেকে ব্যবস্থা করে চাকরিটা পাইয়ে দিলে। কথা ছিল অতুলচন্দ্র ঘোষ নামটা সে পরে প্রিয়ব্রত নাগ করে দেবে। অনেকবার তাকে আমি মনে করিয়েও দিয়েছি। করব, করছি করে সুবল ভটচাজ মাসের পর মাস কাটিয়ে শেষকালে অন্য ডিপার্টমেন্টে বদলি হয়ে গেল, তারপর তো সে রিটায়ার হয়ে গেছে। এসব তো তুমি জানোই।”
”হ্যাঁ ফণীদা জানি। আমিও তো মাসের পর মাস, প্রতিটি দিন ভয়ে ভয়ে কাটিয়ে যাচ্ছি, এই বুঝি ধরা পড়লাম। এই বুঝি আসল পরিচয়টা ফাঁস হয়ে গেল! আমার এই যন্ত্রণাটাও আপনি বোঝার চেষ্টা করুন।”
”চেষ্টা করেছি বলেই তো এখন এসেছি। এবার থেকে মাসে মাসে তিনশো টাকা দিয়ে এর প্রায়শ্চিত্ত করো, দেখবে অনেক শান্তি পাচ্ছ। এখন যদি তোমার অফিস জানতে পারে তুমি অতুলের নাম আর সার্টিফিকেট ভাঁড়িয়ে গত পাঁচ বছর ধরে চাকরি করে চলেছ তাহলে কি শাস্তি তুমি পাবে জান? না না জেলটেল হওয়ার কথা বলছি না, ওসব তো আছেই। এছাড়াও পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, সমাজ যখন জানতে পারবে তখন? ব্যাপারটা ভেবে দেখেছ কি? তোমার ছেলে যখন জানতে পারবে তার বাবা ছিল একটা ভন্ড, একটা জালি লোক…।” ফণী পাল ডান চেটোটা গালে বুলোতে বুলোতে দরজায় পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা মঙ্গলার দিকে তাকিয়েছিল।
”সামনের মাস থেকেই আমি দেব। আপনি দোহাই, বাড়িতে নয় অফিসে পয়লা তারিখে আসবেন।”
ফণী পালের আঙুলে তখন ছিল জমাট শুকনো রঙের মতো একটা পলার আংটি। প্রিয়ব্রত একদৃষ্টে সেটার দিকেই তাকিয়ে ছিল। তখন মনে হয়েছিল তার হৃৎপিণ্ডটাকেই গালের ওপর বোলাচ্ছে।
‘বেশ তাই হবে।’ একতলায় নামার সময় ফণী পাল নীচু গলায় বলেছিল, ”সবাই বাঁচতে চায়। বুঝলে প্রিয়, তুমি, আমি সবাই।”
ফণী পাল আজ আসেনি। কুড়ি বছরে এই প্রথম!
প্রিয়ব্রত একদৃষ্টে নিরুর মুখের দিকে তাকিয়ে মঙ্গলাকেই যেন দেখল। ভয়ে, অসহায়তায় পাণ্ডুর মুখটা পাতলা টিনের মুখোশের মতো দেখাচ্ছিল। কান্না চাপাতে চাওয়ার চেষ্টায় মুখোশটা দুমড়ে গিয়ে যা হয়ে উঠল, সে আর তাকিয়ে থাকতে পারল না।
”তোমার তখন কি মনে হয়েছিল?”
মুখ নীচু করে, ফিসফিস স্বরে সে জানতে চাইল। এই প্রশ্নটা মঙ্গলাকেই কোনো একদিন জিজ্ঞাসা করবে ভেবে রেখেছিল। করা আর হয়নি।
”আমার ঠিক মনে নেই।…বোধহয় বাঁচবার কথাই তখন ভেবেছিলুম।…আমি অন্ধকার ঘর থেকে যখন ছুটে বেরিয়ে গেছিলুম পরনে তখন ছিল শুধু সায়াটা আর ছেঁড়া ব্লাউস। রাস্তায় অনেকটা ছোটার পর একটা লোক আমায় ধরে দাঁড় করায়। জিজ্ঞেস করে কেন আমি এভাবে ছুটছি। সঙ্গে সঙ্গে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেল। তারাই আমায় থানায় নিয়ে যায়।”
”এই কাজটা কে জোগাড় করে দিয়েছিল?”
”বাবার এক চেনা লোকের বন্ধু হল মালিক। সেই বলে কয়ে ঠিক করে দিয়েছিল। রোজ ছ’টাকা।”
”তোমার এই ব্যাপারটা খবরের কাগজে বেরিয়েছিল?”
”আমরা তো কাগজ নিই না তাই প্রথমে জানতুম না। আমাদের সামনের বাড়ির মাসিমা তিরুকে ডেকে জিজ্ঞেস করে ‘হ্যাঁরে তোর দিদির কি হয়েছে রে? কাগজে বেরিয়েছে গণধর্ষণ করেছে ওকে?’ তারপর চুল কাটার সেলুনের একজন বাবাকে কাগজ দেখিয়ে বলে, ‘ঠিকানা আর নাম দেখে মনে হচ্ছে আপনারই মেয়ে?’ এরপর আমাদের পাড়ার সবাই জেনে যায়।”
”তোমার তাতে অসুবিধে হত না?…মানে তোমার কি খুব লজ্জা করত?”
প্রিয়ব্রত ল্যাম্পের পলতে উসকে দিল। সে নিরুর মুখ ভালো করে দেখতে চায়। চোখের মণিতে ঔজ্জ্বল্যের হেরফের, ঠোঁটের কেঁপে ওঠা বা গালের চামড়ার সামান্য কুঞ্চনও সে নজরছাড়া করতে রাজি নয়।
এটা তাকে জেনে রাখতে হবে। যদি সে কোনোদিন ধরা পড়ে তাহলে তার অবস্থাটা কী হতে পারে? নিরু আর সে অবশ্য একই জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। বয়সে, শিক্ষায়, সামাজিক, আর্থিক সব ক্ষেত্রেই বিরাট পার্থক্য। ওর কোনো আত্মীয় নেই, তার আছে। সামনের বাড়িতেই সাত-আটজন দাঁত বার করে হাসবে, চেঁচিয়ে টিপ্পুনি কাটবে।
তাছাড়া নিরু মেয়ে, দুর্বল, গরিব…জোর করে পাশবিক অত্যাচার…খবরের কাগজের এই শব্দ দুটো খুব প্রিয়। আর সে পুরুষ বয়স্ক, জেনেশুনেই নাম ভাঁড়িয়ে চাকরি করেছে। ঠকিয়ে বছরের পর বছর মাইনে নিয়েছে…তারা দুজন একই রকম প্রতিক্রিয়া আশা করতে পারে না।…তাছাড়া তার হিতু রয়েছে!
