”কেন? এতে তো ওদের সুবিধে হত। সেবা করার জন্য একজন সেধে এগিয়ে এসেছে…রাজি না হওয়ার কি আছে?”
নিরু মুখ নামিয়ে নিল। তিলু চা নিয়ে এসেছে। কাপটা টেবিলে রাখার সময় প্রিয়ব্রতর মনে হল আলোটা ম্লান হয়ে পড়েছে, বোধহয় তেল কমে গেছে। লোডশেডিং কতক্ষণ যে চলবে তার স্থিরতা নেই। এখুনি বিদ্যুৎ আসতে পারে কিংবা মাঝরাতে। তবু রক্ষে ঝড়বৃষ্টিতে গরম খানিকটা কমেছে।
”রুটি কি করে ফেলেছিস?”
”এই তো করতে বসেছিলুম।”
সকালে রান্না করে ফ্রিজে রাখা হয়। রাতে শুধু গরম করে নেওয়া। তিলু চলে যেতে সে চায়ের কাপে চুমুক দেবার সময় দেখল নিরু মাথা নিচু করেই রয়েছে। প্রিয়ব্রত শব্দ করে দ্বিতীয় চুমুক দিতেই সে মাথা তুলল। চোখাচোখি হওয়ার পর নিরু চোখ নামিয়ে মৃদু স্বরে বলল, ”ওরা সব জেনে গেছে।”
কি জেনে গেছে? এটা বলতে গিয়েই প্রিয়ব্রত কথা বলার ঝোঁকটাকে সামলে নিল। নিরু অবশ্যই জানে তার সামনে বসা এই লোকটাকে তার বাবা ঘটনাটা জানিয়ে দিয়েছে। এখন না জানার ভান করে প্রশ্ন করাটা নিষ্ঠুরতারই শামিল হবে। ও নিজের থেকে যদি কিছু বলে তো বলুক।
”বাবা বলল, আমার মেয়ের তো কোনো দোষ নেই তাহলে তোমাদের কেন বদনামের এত ভয়? আর ব্যাপারটা জানেই বা কে? কাকিমা বলল তার বাপের বাড়ির লোকেরা জানে!”
”আশ্চর্য তো! এতে বদনামের কি আছে? এটা তো একটা পরোপকার…কর্তব্য, গর্বের জিনিস! আমি হলে তো বলতাম থেকে যাও।”
প্রিয়ব্রত বুঝতে পারছে না কেন সে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠল। কিন্তু কথাগুলো বলে তার নিজেকে ভালো লাগছে। নিরুর চোখে ভরসা পাবার মতো একটা ছায়া যেন সে ভেসে যেতে দেখল। এইরকম একটা ছায়া সে নিজের চোখেও তো পেতে চায়!
”তাছাড়া ওদের ওখানে থাকলে তুমি নিরাপদও হতে। এখানে যে বিপদ-” প্রিয়ব্রত অসম্পূর্ণ রয়ে গেল। বিপদের কথা এখন নিরুকে মনে করিয়ে দেওয়া উচিত হবে না।
”বাবা তো সেইজন্যই আমাকে নিয়ে গেছিল।”
তাহলে সেবা করাটা উদ্দেশ্য ছিল না। খুদিকেলোর কাছে অবশ্য এখন মেয়ের, নিজেদের জীবন বাঁচানোই বড়ো প্রশ্ন। তবু প্রিয়ব্রত একটু দমে গেল।
”তুমি জানো তোমার বিপদ কতটা?”
”হ্যাঁ।” নিরুর মাথাটা হেলে গেল।
ওর কি ভয় করছে না? হয়তো ঘরের মধ্যে বসে থেকে জীবনের সুন্দর দিকটা সম্পর্কে কোনো ধারণাই ওর মধ্যে তৈরি হয়নি। সুখের স্বাদ পেলে ভয় পেত।
প্রিয়ব্রত দরজার দিকে তাকাল। তিলু রান্নাঘরে। কেউ কথা বললে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ওর শোনার অভ্যাসটা বহুবার বলেও ছাড়ানো যায়নি। আলোটা আরও যেন স্তিমিত হয়ে এসেছে। পলতে উসকে দেবার জন্য হাত বাড়িয়েও সে টেনে নিল। নিরু ম্লান হয়েই থাক এখন।
”কি বিপদ বল তো? তুমি কি জান…।”
”ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। সেই লোকটা, যে সেদিন আমাকে…” নিরু জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। সব কি খুলে বলতে হবে ধরনের প্রশ্ন ওর চাহনিতে।
”বুঝেছি। সেই লোকটা…তারপর কি?”
”হপ্তাখানেক আগে দুপুরে এসেছিল। আমি সদর দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বললুম। মা তখন ঘুমোচ্ছিল। বাবা ছিল না। লোকটার নাম অমর। বলল, যা হবার হয়ে গেছে এই নিয়ে আর বেশি ঘোঁট পাকিয়ো না, তাতে শুধু ক্ষতিই হবে। দু’হাজার টাকা দোব, চুপ মেরে থাকো।
”অমরের সঙ্গে আর কেউ ছিল?”
”হ্যাঁ, গুলে নামে একটা ছেলে ছিল। ওকেও পুলিশে ধরে।”
”শুধু এই কথা বলতেই এসেছিল?”
”বলল কোর্টে যখন কেস উঠেছেই তখন একটা কিছু তো ব্যবস্থা বাঁচার জন্য করতে হবে।” আমাকে অমর বলল, ‘যখন আমাদের দেখিয়ে কোর্টে তোমাকে জিজ্ঞাসা করবে এরা এরাই কি সেদিন সন্ধেবেলায় কারখানা ঘরে তোমার ওপর অত্যাচার করেছিল? তুমি বলবে না…এরা নয় অন্য লোক।’ বলল, ”এতেই কেস কেঁচে যাবে।”
”কারখানা!…কীসের কারখানা?”
”কাডবোর্ড বাসকো তৈরির কারখানা, বউবাজারে। সবে দেড় মাস কাজে ঢুকেছি, তখনই এটা হল।”
”ওরা সেখানে কাজ করত?”
”শুধু বাচ্চচা বলে ছেলেটা কাজ করত। অমর আর গুলে কারখানা বন্ধ হবার পর আসত। ওখানে বসে মদ খেত, জুয়া খেলত। ওখানে বোমা রাখতেও দেখেছি।”
”তুমি কি পুলিশের কাছে এদের নাম বলেছিলে?”
”হ্যাঁ, তিনজনের নাম বলেছিলুম।”
”তারপর?”
তারপর অমর বলল, ‘তখন মাথার ঠিক ছিল না তাই ভুল করে ওদের নাম বলে ফেলেছি বলবে। মোট কথা তুমি আমাদের চেনো না, জানো না এটাই জজকে বুঝিয়ে দেবে।’ আমি তখন বললুম, আপনারা যে মেয়েটার সব্বোনাশ করলেন তার জীবন নষ্ট করে শেষ করে দিলেন আর এখন নিজেদের বাঁচাবার জন্য তাকে দিয়েই মিথ্যে কথা বলাবেন? তাইতে অমর বলল, ‘তোমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে এখন তক্কো করার সময় নেই। দু হাজার টাকা পাবে, প্রাণটাও বাঁচবে, আবার কি চাও?’ তারপরই একটা ছুরি বার করল। স্প্রিং টিপতেই অ্যাত্তো বড়ো ফলা বেরোল। আমার পেট ঠেকিয়ে বলল, ‘বাঁচার ইচ্ছে সব মানুষেরই আছে। আমার আছে তোমারও আছে। এই বাড়ির মধ্যেই তোমায় শেষ করে দিয়ে যাব, কেউ টেরও পাবে না। যা বললুম সেই ভাবে কোর্টে বলবে, দু হাজার এই বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যাব’ এই বলেই ওরা চলে গেল।”
”তুমি বাবাকে বলেছ?”
”হ্যাঁ। বাবা, মা, বোনেরা খুব ভয় পেয়ে গেছে। মা বলেছে ‘কোর্টে যেতে হবে না, টাকারও দরকার নেই, কোথাও পালিয়ে গিয়ে থাক।’ কিন্তু কোথায় আমি পালিয়ে গিয়ে থাকব? আমাদের তেমন কোনো আত্মীয়স্বজন তো নেই।”
