প্রিয়ব্রত ততক্ষণে একতলায় নেমে এসেছে। সে হাত ধরে হিতুকে বাড়ির মধ্যে টেনে এনে দরজা বন্ধ করে দেয়। নয়তো হাতাহাতিতে ঝগড়াটা গড়াত। বাবু আর হিতু একই বয়সি। বাবু যখন হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দ্বিতীয়বার দিল হিতু তখন বি-এ ফাইনালের জন্য তৈরি হচ্ছে। বাবু এখন তার কলেজ ইউনিয়নের সেক্রেটারি।
প্রিয়ব্রত পরদিনই ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ডেকে তিনতলায় কলিং বেল লাগায়।
”তিলু…তিলুউউ।” মুখ তুলে প্রিয়ব্রত চিৎকার করল।
”যা-আ-আ-ই বাবু।” তিনতলা থেকে গলা ভেসে এল। মিনিট খানেকের মধ্যেই দরজা খুলে দিল বছর পনেরোর, হলুদ গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পরা একটি ছেলে। হাতে কেরোসিন ল্যাম্প। নিরুকে দেখে তার চোখ কৌতূহলী হয়ে উঠল।
”এসো।”
নিরু ভিতরে ঢোকার পর প্রিয়ব্রতই দরজায় খিল দিল। ”হ্যাঁরে এখানে জলঝড় হয়েছে?”
”হয়েছে। পাঁচ-দশ মিনিট খুব বাতাস চলল, বৃষ্টি তেমন হয়নি।”
একতলায় কল-পায়খানা আর দুটি ঘর। দেড় বছর আগেও ঘর দুটি ভাড়া দেওয়া ছিল এক বই বাঁধাইওয়ালাকে। বউ আর দুটি ছেলেও বাঁধাইয়ের কাজে তার সঙ্গে হাত লাগাত। ব্যবসা টিমটিম করে চলত। সাত মাসের ভাড়া বাকি রেখে লোকটা যক্ষ্মায় হাসপাতালে মারা যাবার পরও প্রিয়ব্রত দু’মাস ওদের থাকতে দিয়েছিল। তারপর অনেকেই ভাড়া নিতে এসেছিল। কিন্তু কোথা থেকে যে শুনল ওই ঘরের ভাড়াটে যক্ষ্মায় মারা গেছে, আর তারা কথা বলতে দ্বিতীয়বার আসেনি। প্রিয়ব্রত’র স্থির বিশ্বাস জ্যাঠামশাইদের বাড়ির কেউই ভাঙচিটা দিয়েছে।
হিতু বলেছিল, ‘খালিই থাক, দরকার নেই আর ভাড়াটে বসিয়ে। দুজনের রোজগারই তো যথেষ্ট!’
‘না, আমার টাকার দরকার।’
‘কেন? কীজন্য?’
হিতুকে সে বলতে পারেনি কেন টাকা তার কাছে এত দরকারি। শুধু মঙ্গলাকেই সে বলেছিল।
কিন্তু ভাড়াটে বসিয়ে সে হিতুকে অখুশি করতে পারেনি। ঘরদুটো তালা দেওয়াই রয়ে গেছে। হিতু ছাড়া তার আর কেউ নেই।
”তুমি খাটেই বোস।”
প্রিয়ব্রত ল্যাম্পটা টেবিলে রাখল। নিরু খাটের ধারে পা ঝুলিয়ে বসল। চেয়ারটা ঘুরিয়ে মুখোমুখি বসে সে ঘরের সর্বত্র চোখ বুলিয়ে বলল, ”আমি আসবাব দিয়ে ঘর বোঝাই করা একদম পছন্দ করি না। এই টেবিল, একটা চেয়ার, খাট, আলনা আর দেয়াল আলমারি।”
নিরু কি স্বচ্ছন্দ হবে এইসব শুনে? ওদের ঘরে খাট যদিও বা থাকে নিশ্চয় টেবিল-চেয়ার নেই। মঙ্গলার স্টিলের আলমারিটা এখন হিতুর ঘরে। তার আর ওটা দরকার হয় না।
”ওহো, একটা টিভি সেট রয়েছে।”
নিরু টিভি-টা থেকে দৃষ্টি দেয়ালে মঙ্গলার ছবিতে রাখল। দেয়াল আলমারির উপরের তাকটায় কাচ লাগাল তা ছাড়া পাল্লাদুটো কাঠের। কাচের ওপাশে কয়েকটা বাঁধানো বই। বিয়েতে পাওয়া বই মঙ্গলা যত্ন করে রেখেছিল। এখনও যত্নেই আছে।
”এসব তোমার কাকিমার।” প্রিয়ব্রত বইগুলোর দিকে তাকিয়ে বলল।
তিলু দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। হিতুরই বাতিল পুরনো প্যান্টটা এর মধ্যে পরে নিয়েছে। চোখেমুখে দায়িত্ববোধ ও বয়স্ক হবার চেষ্টা।
”চা করব?”
”এই দিদিকে চিনিস?”
”আমাদের পেছনের বাড়িতে থাকে।”
”ওর বাবা আমার ছেলেবেলার বন্ধু। নিরু চা খাবে?”
”না। বাবা ছাড়া আমরা আর কেউ চা খাই না।”
”এক কাপ আমাকে করে দে। আর শোন, কাল দোকানে কেরোসিন আসবে।”
নিরু রেপড হল কোথায়? কীভাবে? কারা সেই লোকগুলো? ওকে কী এই নিয়ে প্রশ্ন করাটা ঠিক হবে? এত মেয়ে থাকতে ওকে কেন? পুরুষদের তপ্ত করার মতো কোনো গুণই তো তার শরীরে নেই!
একটু আগেই রাস্তায় ওকে বুকের কাছে টেনে ধরে রেখেছিল অথচ এমন একটা ব্যাপার তাকে আড়ষ্ট করল না বা নাড়া দিল না, সঙ্গে সঙ্গেই তা ভুলে গেছে। ভয় যে কীভাবে মানুষকে গিলে খায়!
”তোমার বাবার কাছে কি কখনো আমার নাম শুনেছ? কখনো কি আমার কথা বলেছে?”
”শুনেছি। আপনারা ছোটোবেলায় খেলতেন একসঙ্গে। আর, আপনি ভালো গান করতেন।”
প্রিয়ব্রতর মুখে হাসি ছড়াল, রেডিয়োর অনুরোধের আসর শোনার জন্য জ্যাঠামশাইয়ের ঘরে গিয়ে বসত। সেজদার নির্দেশে রেকর্ড থেকে গান টুকতে হত। ঝড়ের মতো সে পেনসিল চালাতে পারত। সেজদার শখ ছিল আধুনিক গাইয়ে হওয়ার। এখন সে চাঁদনিতে একটা ওষুধের দোকানের ক্যাশিয়ার। রাতে যেদিন গলা ছেড়ে গান ধরে সবাই বুঝে যায় ও মদ খেয়ে এসেছে। প্রিয়ব্রত গান তুলত সেজদার কাছে।
”তোমাদের রেডিয়ো আছে?”
”আছে। অনেক দিন ব্যাটারি কেনা হয়নি।”
ওর মুখে প্রাণের ভয়ে ভীত হবার ছাপ কোথাও কি দেখা যাচ্ছে? টিকলো নাকের পাশা থেকে ঠোঁটের কোল পর্যন্ত বসে যাওয়া অংশটা ফ্যাকাসে লাগছে। কোলের উপর হাত দুটো রয়েছে জড়োসড়ো করে। মাঝে মাঝে মুখ নিচু করে ফেলছে। রেপড হবার সময় কি চেঁচিয়েছিল? বাধা দিচ্ছিল? হাত দুটো তো খুবই রুগণ!
”বাবার সঙ্গে গেছিলে কোথায়?”
”দাদুর কাছে, বাবার মামা হন।”
”ওকে আমি ছোটোবেলায় দেখতাম, তোমাদের বাড়িতে আসতেন। কালো রঙ, খুব লম্বা, সামনের দাঁত দুটো উঁচু।”
”নাকটাও তো খুব উঁচু!”
”হ্যাঁ হ্যাঁ, এটাই আগে বলা উচিত ছিল।…এখন তো উনি খুব বুড়োই হবেন?”
”পক্ষাঘাত হয়েছে। বিছানাতেই দিনরাত শুয়ে থাকে।”
”দেখাশোনা করে কে? কে কে আছেন বাড়িতে?”
”ছেলে, ছেলের বউ। ওরা একদমই দেখে না। একটা ঝি আছে, সেও যত্ন করে না। বাবা সেইজন্যই তো আজ আমায় নিয়ে গেছিল। কিন্তু বউটা…মানে কাকিমা আমায় রাখতে রাজি হল না।”
