”তুমি আমার পাশে পাশে চলো।”
সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পার হয়ে অন্ধকার গুপি বসাক লেনে ঢোকার আগে প্রিয়ব্রত প্রায় এক মিনিট দাঁড়াল চোখ সইয়ে নিতে। রাস্তাটা তার মুখস্থ কিন্তু নিরুর নয়। বৃষ্টিটা এখানে কতটা হয়েছে সে জানে না। যদি জোরে হয়ে থাকে তাহলে কোথায় কোথায় জল জমবে সে জানে। কয়েকদিন আগে জলের ফেরুল বদলাতে কর্পোরেশনের লোকেরা পাঁচের-এক নম্বর বাড়ির সামনে রাস্তা খুঁড়েছিল। জায়গাটায় মাটির ঢিপি হয়ে আছে। বৃষ্টিতে কাদা হবেই।
”তুমি আমার পেছনে এসো।…রাস্তায় ঢিপি আর গত্তো আছে।”
নিরু তার পিছনে এল। প্রিয়ব্রত মন্থর এবং সতর্ক হয়ে হাঁটছে। কুকুর শুয়ে থাকতে পারে, সামনে থেকে আসা মানুষের সঙ্গে ধাক্কা লাগতে পারে। কয়েকটা বাড়ির বাইরে রক, তাতে মানুষ বসে। ওরা তেরো নম্বর বস্তি বাড়ির নয়তো পাকা বাড়ির একতলায় এক ঘর নিয়ে বাস করা পরিবারের লোক। লোডশেডিং হলে মেয়েরাও রকে এসে বসে। লাল টিপের মতো একবিন্দু আগুন উজ্জ্বল হয়ে উঠেই ঝিমিয়ে পড়ল। লোকটি পাশ দিয়ে যাবার সময় প্রিয়ব্রত বিড়ির গন্ধ পেল।
মোমবাতির আলো কয়েকটা বাড়ির জানালা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে কিন্তু রাস্তা পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে না। জানলার সামনে হাঁটা লোকের গায়ে পড়ে শুধু একটু কেঁপে উঠছে।
নিরু রেপড হয়েছে, ধর্ষিতা।…পাশবিক অত্যাচার, বলাৎকার…আট মাস হয়ে গেল অথচ সে জানে না। ওকে দেখেও তো মনে হয়নি। অবশ্য মনে হবার কথাও না। এত দিন পর কোনো মেয়েকে ঘণ্টাখানেক দেখেই কি এসব মরচে ফেলা যায়? প্রিয়ব্রত নিজেকে বোকা মনে করল। মুখে চোখে ‘রেপড হয়েছি’ বিজ্ঞাপন ঝুলিয়ে কেউ কি বাইরে বেরোয়? এতবড়ো একটা কাণ্ড এত অল্প বয়সে জীবনে ঘটল, তার উপর মামলা, জান খতমের হুমকি…এখন ওর মনের মধ্যে কী ঘটছে?…ফণী পাল আজ এল না, কুড়ি বছরে এই প্রথম! তার নিজের মনেইবা কী ঘটছে?
”কেরোসিনের দোকানে খবর নিলুম, কাল দুপুরে আসবে বলল।”
”রোজই তো তাই বলে!” অন্ধকারে রকে স্বামী-স্ত্রীর আলাপ।
তার রান্না হয় কয়লার উনুনে। কিন্তু স্টোভের জন্য কেরোসিন দরকার হয়। খবরটা তিলুকে দিয়ে রাখতে হবে। এবার পাঁচের-এক আসছে।
”এই জায়গাটায় একটি ঢিপি আছে…আচ্ছা আমার হাতটা ধরো।”
অন্ধকারে প্রিয়ব্রত হাত বাড়াল। নিরুপমার বাঁহাতের পাঁচটা আঙুল সে মুঠোর মধ্যে পেল। ঘষে ঘষে পা এগিয়ে জায়গাটা পার হয়েই প্রিয়ব্রত থমকে গেল। কয়েকটা ছায়ামূর্তি সামনে থেকে আসছে। মুঠোয় ধরা আঙুলগুলো হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল। নিরু তার পিঠ ঘেঁষে সরে এসে ডান হাত দিয়ে বাহু আঁকড়ে ধরল। মরচে ধরা কবজা খোলার মতো একটা শব্দ বেরিয়ে এল ওর মুখ থেকে।
প্রিয়ব্রত বাড়ির দেয়াল ঘেঁষে সরে এল নিরুকে একহাতে জড়িয়ে। তার বাঁদিকে একটা খোলা জানলা, ঘরের ভিতরটা অন্ধকার। জানলায় একটা শিশুর ছায়া।
”মা, দুটো ভূত আমাদের জানলায়। দেখবে এসো।”
”সারা দুপুর দুষ্টুমি করলে ভূত আসবেই তো।” ভেতর থেকে ভেসে এল মায়ের গলা। ”এবার ধরে নিয়ে যাবে তোমায়।”
তিন-চারটি লোক তাদের পাশ দিয়ে চলে গেল। নিজেদের মধ্যে কিছু বলাবলিও করছে না। পায়ের শব্দগুলো মিলিয়ে যাবার পর প্রিয়ব্রত বুঝতে পারল একহাতে সে নিরুকে বুকের কাছে টেনে চেপে ধরে রয়েছে আর নিরু একহাতে শক্ত করে ধরে আছে তার কোমর।
জানলায় শিশুর ছায়াটি নেই। বোধহয় ভূতের ভয়ে মা’র কাছে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে।
”ভয় নেই…ওরা নয়। এই ঘুরেই দুটো বাড়ি গেলেই…।”
ধীরে ধীরে নিরুর হাতটা তার কোমর থেকে ঝুলে পড়ল। প্রিয়ব্রত তার হাতটাও তুলে নিল ওর কাঁধ থেকে। কথা না বলে তারা সমকোণে বাঁকা রাস্তা ঘুরে দুটো বাড়ি পার হয়ে দাঁড়াল।
”এই সরু গলির শেষের বাড়িটা।”
দু’পাশে দেয়াল তার মাঝের সরু পথের দিকে প্রিয়ব্রত আঙুল দিয়ে দেখাল। গুপি বসাক লেনের থেকেও অন্ধকার আরও ঘন এই গলিটায়। এখানে ওরা অপেক্ষা করে থাকে যদি? প্রিয়ব্রত অনিশ্চিতভাবে বলল, ”আর কী, এবার এসে গেছি। আমার পেছনে এসো।”
ঠাসা অন্ধকার ঠেলে ঢোকার মতো দু হাত বাড়িয়ে পা ফেলে ফেলে সে এগোচ্ছে। পিছনে নিরুর পায়ের শব্দ পাচ্ছে না। সামনে থেকে কিংবা পাস থেকে আচমকা আক্রমণ হলে সে কী করবে? ওরা কি মাথায় লাঠি কষাবে? তাহলে সে চেঁচিয়ে উঠবে। লোকজন ছুটে আসতে কতক্ষণ সময় নেবে? ততক্ষণে নিরুকে তুলে নিয়ে যাবার যথেষ্ট সময় পাবে।
যদি বুঝতে পারে চিৎকারটা তার তাহলে জ্যাঠামশায়ের বাড়ি থেকে কেউ বেরিয়ে আসবে না। ওদের সঙ্গে তার বা হিতুর এখন বাক্যালাপ নেই।
”বাঁদিকের এই দরজাটা আমার জ্যাঠামশাইদের, এখনও বেঁচে আছেন…আর ওইটে আমার।”
কলিং বেলের সুইচের জন্য প্রিয়ব্রত দরজার মাথায় হাত তুলেই নামিয়ে নিল। লোডশেডিং হলে মানুষ অনেক রকম ভুল করে। দরজায় কড়া নাড়তে গিয়ে সে ইতস্তত করল। এখন তিলু তিনতলায়। কড়া নেড়ে অতদূর পর্যন্ত শব্দটা পৌঁছে দিতে হবে।
অফিস থেকে হিতুর ফিরতে রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা বেজে যায়। কড়া নাড়লে নিস্তব্ধ রাতে যে শব্দটা হয় সেটা কানে একটু বেশিই বাজে। এক রাতে হিতু কড়া নাড়তেই জ্যাঠামশাইয়ের বাড়ি থেকে মেয়ে গলায়, বোধহয় মেজোছেলের বউ, গজগজ করে বেশ জোরেই বলে ওঠে, ‘এই এক জ্বালা হয়েছে, রাতদুপুরে রোজ রোজ লোকের ঘুম ভাঙিয়ে কড়া নাড়া!’ সঙ্গে সঙ্গে মেজদার ছোটোছেলে বাবু দোতলার বারান্দা থেকে চেঁচিয়ে উঠেছিল, ‘মাথায় এক বালতি জল ঢেলে দিলে ঠিক হবে।’ হিতু চুপ করে থাকেনি। পালটা উত্তর দেয়, ‘ঢেলে দ্যাখ না একবার।’ বাবু দোতলা থেকে নেমে দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছিল। ‘কি করবি তুই? হ্যাঁ, জল ঢালব। খবরের কাগজের রিপোর্টার হয়েছিস বলে কি রাত্তিরে লোককে জ্বালাতন করার রাইট জন্মেছে?…নাড় আর একবার কড়া, দ্যাখ কি করি?’
