চীৎকার করে হরিবোল দিল কারা! মুখ ফেরাল দিনেশ। মানুষ দেখা যায় না। রাস্তাটা বেশ উঁচুতে। আবার হরিবোল দিল। দিনেশ জলের দিকে মুখ ফেরাল।
কষ্ট হচ্ছে। মানুষ মরলে কষ্ট হয়। এ কষ্ট আমাদের সময়েও পেয়েছি। কিন্তু তফাত আছে যেন কোথায়। ‘আমাদের সময়’, এই কথাটা বলার কি মানে হয়? যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণই তো আমাদের সময়, আমার সময়। তবে কি বয়স বেড়েছে! না হলে তফাত গড়ে উঠবে কেন? সুখকেই মানুষ চায়। নিজের ভাবে। যৌবনের সঙ্গেই সুখের সম্পর্ক। বুড়ো বয়সের এই দিনগুলোকে অস্বীকার করতে ইচ্ছে করে। জোয়ান বয়সই আমার সময়। আমার সুখের সময়। এ যৌবন আর ফিরবে না। আর ফিরবে না। সুখ আর আসবে না। আর আসবে না।
জলে পা ডোবাল দিনেশ। ঢেউয়ের ধাক্কায় শিরশির করে উঠল পা’টা। ছোটবেলায় ভয় করত। কামঠে নাকি পা কেটে নিয়ে যায়। টেরটিও পাওয়া যাবে না। যন্ত্রণাও হবে না। এমন নাকি অনেকের হাঁটু থেকে কেটে নিয়ে গেছে। কিন্তু এমন পা’ কাটা একটা লোকও আজ পর্যন্ত দেখলুম না।
পা তুলে তাকিয়ে রইল দিনেশ। গোটাই আছে। আলতো হাত বুলোল। লোমগুলো লেপটে সরু দেখাচ্ছে, পা’টাকে অদ্ভুত লাগছে। যেন আর কারুর পা।
জেটিতে ভেড়ার সময় স্টীমারে অদ্ভুত এক শব্দ করে। শব্দটা একটুও বদলায় নি। ছোটবেলায় ঝাঁপ খেতুম স্টীমার থেকে। খালাসিরা দেখলে তাড়া করত। ঝপাঝপ লাফিয়ে পড়তুম দল বেঁধে। মাঝ গঙ্গা থেকে এক দমে পাড়ে আসতুম।
আজ আর পারব না। বয়স হয়েছে। ভয় করবে। তবু ঝাঁপাতে সাঁতরাতে পারব? দশ হাত। বিশ হাত। ওই নৌকোটা চলে যাবে। ওটা কি ধরতে পারব!
চেষ্টা করে দেখলে কেমন হয়। জোয়ার এসেছে। খাড়াই সাঁতরিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। ফিরে আসার দম নেই। জোয়ান বয়স হলে পারতুম। এখন বুদ্ধি খাটাতে হবে। পোর্ট কমিশনার্সের টোলটার কাছ থেকে যদি জলে নামি। অল্প সাঁতরে, ভেসে থাকলে স্রোতের টানে নৌকোটার কাছে যেতে পারব। তারপর একটু সাঁতরালেই হালটা ধরা যাবে।
কাপড় জামা ভিজে যাবে। খুলে রেখে নামলে যদি চুরি হয়ে যায়! অন্ধকার জায়গাটা চোর কি দেখতে পাবে? কি আর এমন পকেটে আছে। তাছাড়া জল থেকে তো দেখাই যাবে। চীৎকার করলে চোর পালাবে।
ঠাণ্ডা লাগবে কি! বেশ ঠাণ্ডা জলটা। নিউমোনিয়া না ধরলেও সর্দি হবে নির্ঘাত। জ্বর হতে পারে। অফিসে এ সময়ে ছুটি নেওয়া কি উচিত। ছুটি পাওনা আছে তবুও কাজের চাপ পুজোর মুখেই বেশি। অফিসারকে চটিয়ে লাভ কি। ছাঁটাইয়ের গুজব উঠেছে। কুড়ি বছর চাকরি করেও রেহাই পায়নি এমন লোকও আছে।
নৌকোটা জোয়ারে গা ভাসিয়ে অনেক দূর চলে গেছে। অস্পষ্ট কতকগুলো ছায়া সমান তালে সামনে-পিছে দুলছে। দাঁড় টানছে। বোধ হয় খুব তাড়াতাড়ি আছে।
আমার বয়স হয়েছে। আমি ভয় পাচ্ছি। হিসেবি হয়ে গেছি। জোয়ান বয়স হলে কি এত ভাবতুম। সিধে সাঁতরে গিয়ে নৌকোটাকে ধরে ফেলতুম। ভয়ে জলে নামতে পারলুম না। ভয়টা কি বুড়ো বয়সের, না কি এই দুঃসময়ের। চিনু কি পারবে জোয়ার ভেঙ্গে সাঁতরাতে?
এ যুগের জোয়ানদের তাড়াতাড়ি বয়স বেড়েছে। দম ফুরিয়ে গেছে। চিনু রেস খেলেছে। বিনা আয়াসে টাকা রোজগার করতে চায়। লড়বার সাহস ওর নেই। লড়ে জিততে পারলেই সুখ। সুখ চিনু পেল না। ও একদিন বুড়ো হবে। সেদিন অবস্থা আরো ভয়ঙ্কর হবে। আমার মতন তখন হয়ত একদিন গঙ্গার ঘাটে বসে ভাববে। কি ভাববে? আমাদের সময়ে বেশি সুখ ছিল? কি করে বসবে চিনু। সুখ কোথায়। ওর বুড়ো বয়সে ও কোন দিনের কথা ভাববে! জোয়ান বয়সেই হেরে বসে আছে। পরিবেশে সুখ পাবে না। স্মৃতিতেও পাবে না। কি ভয়ঙ্কর দিন আসছে ওর জীবনে! কেমন করে বাঁচবে!
আমি কি ভয় পেয়েছি? আমি কি হিসেবি হয়ে গেছি? ওই কেত্তনের দলে গিয়ে কি আমায় বসতে হবে? বৈরেগি হয়ে কি ওই গেঁজেল দুটোর কাছে ধরনা দোব? আমি কি করতে পারি! আমার দরকার কি ফুরিয়েছে?
জল ছুটছে। উত্তর দিকে অন্ধকার, ওই দিকে জল ছুটছে। দক্ষিণে হাওড়ার পুল। গমগম শব্দ আসছে ট্রাম চলার। আলোর টানা লাইন। ওপারে আলো। লাউডস্পীকারের গান এপারেও শোনা যাচ্ছে। জেটিতে ভেড়ার সময় স্টীমারের বিদঘুটে আওয়াজ হচ্ছে। আলো পড়ছে জলে। জল ছুটছে। জলের আলো কাঁপছে। দিনেশ জলের দিকে তাকিয়ে বসে রইল।
ছোট্ট একটা ছেলে সিঁড়ি বেয়ে জলের ধারে এসে দাঁড়াল। দিনেশ ওর দিকে তাকাল।
কতটুকু আর, সানুর বয়সী হবে। ফিতে দেওয়া জুতো, পায়ে মোজা। হাতে একটা থলি। কাপড় রয়েছে থলিতে। একা ও কেন জলের ধারে এল? পিছু ফিরে দেখল দিনেশ। কেউ নেই।
-কোথায় যাচ্ছ খোকা?
ছেলেটা একধাপ উঠে দাঁড়াল।
-কার সঙ্গে এসেছ?
-বাবার সঙ্গে।
-বাবা কোথায়!
থুতনি ঘুরিয়ে দেখাল ছেলেটা। ওদিকে নিমতলা শ্মশান-ঘাট। অনুমান করল দিনেশ, হয়তো কোন আত্মীয় মারা গেছে।
-ওতে বুঝি বাবার কাপড় আছে?
-না, মার জন্য লিচু।
-বেড়াতে বেরিয়েছিলে?
-না, মাকে দেখতে গেছলুম।
-কোথায়?
-হাসপাতালে।
-কি হয়েছে?
-অসুখ করেছিল।
দিনেশ তীক্ষ্ন চোখে ওর মুখের দিকে তাকাল। সানুর বয়সী। কচি মুখ। মুখটা ফেটে যাচ্ছে। পলিমাটি যেমন চড়া রোদে ফেটে যায়। ঠোঁটের পাশ দিয়ে চোখের কোল পর্যন্ত আঁকাবাঁকা কতকগুলো ফাটল ধরেছে। গাল দুটো ডেবে গেল। চাপা শব্দ উঠছে গলা থেকে। জল জমেছে চোখে। খোসা ছাড়ান রসাল লিচুর মত ভাসছে চোখের সাদা অংশটা।
