প্রিয়ব্রতর মুখটা যখন হালকা লাগা গাছের পাতার মতো কুঁকড়ে যাচ্ছে তখনই একটা ”হা-আ-আ” রব তুলে লোডশেডিং হল। চারদিক অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার সঙ্গেই ভেসে উঠল নৈঃশব্দ্য। তখন সে বাড়ির ভিতর থেকে ভেসে আসা, বিনিয়ে বিনিয়ে কান্নার মতো তানপুরার ক্ষীণ সুর শুনতে পেল।
২
প্রায় হাতড়ে সে গলির মধ্যে দিয়ে হেঁটে এসে পড়ল সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ে। অনেক দোকানেই জেনারেটরে তৈরি আলো জ্বলছে তবে তেজ কম। পেভমেন্টের অনেক জায়গায়ই আবছা আলো। মেট্রো রেলের জন্য রাস্তার মাঝ বরাবর খোঁড়া হয়েছিল। লোহার কড়ি পুঁতে তার উপর ছোটো ছোটো চৌকো কংক্রিটের স্ল্যাব বসিয়ে গর্ত ঢেকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাস্তাটা এখনও পরিষ্কার করা হয়নি। বড়ো বড়ো লোহার কড়ি, শিক আর রাবিশ পড়ে আছে। এরই মাঝখান দিয়ে রাস্তা পারাপারের পথ। একপাশ দিয়ে যাতায়াত করছে যানবাহন।
ঠিক ওপারেই গুপি বসাক লেন। তার বাঁদিকে সওয়াশো’ বছরের পুরনো মিত্তিরদের বিরাট বাড়ি। বাড়ির বাঁদিক ঘেঁষে পূর্বপুরুষ কারুর নামেই কালীমোহন মিত্র লেন। দুটি গলিই বাড়িটার দুপাশ দিয়ে নানান ভঙ্গিতে মোড় নিতে নিতে সমান্তরালভাবে পশ্চিমে চলে গেছে চিৎপুর রোড পর্যন্ত। প্রিয়ব্রত সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ পার হবার জন্য আলোজ্বলা ‘নিউ মেডিকো’ নামের ওষুধের দোকানটার সামনে দাঁড়াল। আলোয় যথেষ্ট জোর নেই, ছায়া পর্যন্ত পড়ছে না। এখান থেকেই তাকে রাস্তা পেরোতে হবে।
”প্রিয়…অ্যাই প্রিয়।”
চমকে উঠল প্রিয়ব্রত। বাঁদিকে অন্ধকার থেকে চাপা গলায় কেউ ডাকল। নজর তীক্ষ্ন করে সে যাকে আঁচ করতে পারল তাকে সে আশা করেনি।
”কেলো তুই! বাড়ি যাসনি?” প্রিয়ব্রত এগিয়ে এসে খুদিকেলোর সামনে দাঁড়াল। ”অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছিস কেন, নিরু কোথায়?”
”বলছি। নিরু ওই যে, ওইখানে…একটা বিপদে পড়ে গেছি তোকে একটু সাহায্য করতে হবে।”
খুদিকেলোর মুখের ভাব বোঝা যাচ্ছে না কিন্তু গলার স্বরে চাপা ত্রাস প্রিয়ব্রত মুখ ফিরিয়ে দেখল একটু দূরে বাড়ির দেয়ালের ধারে মানুষের ছায়া, নিরু দাঁড়িয়ে।
”লোডশেডিংটা না হলে চলে যেতুম। কিন্তু কালকেই ভয় দেখিয়ে থ্রেট করে গেছে।”
”কে থ্রেট করেছে?”
”ওরা।”
”ওরা কে?”
”যারা নিরুকে রেপ করেছে। এখন জামিনে ছাড়া রয়েছে,…তিনজন। তুই কাগজে দেখিসনি?”
”রে এএ এপ! তিনজন?…কাগজে কই দেখিনি তো!”
”আটমাস আগে বেরিয়েছিল। সব তোকে পরে বলব’খন। ওরা মারাত্মক গুন্ডা, বড়ো একটা গ্যাং আছে, কেস তুলে নিতে বলেছিল। পুলিশই কেস করছে, আমরা কি করে সেটা তুলব? পরশু মামলার ডেট।…প্রিয়, এই অন্ধকার কালীমোহন মিত্তির লেন দিয়ে নিরুর এখন যাওয়াটা ঠিক হবে না, ওকে জানে মেরে দেবে।”
খুদিকেলো দুই মুঠোয় চেপে ধরল প্রিয়ব্রতর ডান কবজি।
”তুই বরং ওকে গুপী বসাক লেন দিয়ে তোর বাড়িতে নিয়ে যা তারপর পগাড়ের খিড়কি দোর দিয়ে ও বাড়ি চলে যাবে।…এই সামান্য উপকারটা তোকে করতেই হবে। বাড়িতে এসে সাতদিন আগে ওরা ছুরি দেখিয়ে গেছে…কাল তিনটে ছেলে দোকানে এসে আমাকে ডেকে নিয়ে বলল, মেয়েকে তুলে নিয়ে যাবে, বোমা মেরে দোকান জ্বালিয়ে দেবে। এসব কথা বাড়িতে বলিনি, বললে তো কান্নাকাটি পড়ে যাবে। দোকান উঠে গেলে সবাইকে খাওয়াব কী?…কী যে অশান্তি আমার।”
”এত ব্যাপার হয়ে গেছে!” প্রিয়ব্রতর মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। ”তুই এখুনি পুলিশে যা।”
”কী লাভ গিয়ে। বলে গেছে, পুলিশের কাছে যেতে পারি কিন্তু তাতে একটার বদলে দুটো লাশ পড়বে। পুলিশ কতক্ষণ, কতদিন আর পাহারা দিয়ে বাঁচাবে?” খুদিকেলো যেন গভীর খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে, শুকনো গলায় কোনোরকম আবেগ নেই।
”পরশুই মামলার ডেট।”
”হ্যাঁ। নিরুকে বোধহয় জেরা করবে উকিল। আসামিদের শনাক্ত করতেও হয়তো বলবে।”
প্রিয়ব্রতর মাথায় অজস্র প্রশ্ন, অথচ এখন প্রশ্ন করে নষ্ট করার সময়ও এটা নয়। সে দু-ধারে এবং সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউয়ের ওপারে মুখ ফেরাল। মোটরের আলোয় মাঝে মাঝে উজ্জ্বল হচ্ছে পেভমেন্ট। মাটন রোল বিক্রির ঠেলা গাড়িটায় হারিকেন জ্বলছে। খদ্দের নেই। সতর্ক পায়ে লোক হেঁটে যাচ্ছে। কিন্তু নিরুকে তুলে নিয়ে যেতে পারে বলে কাউকে মনে হল না। হয়তো তারা কালীমোহন মিত্তির লেনের ভেতরে অপেক্ষা করছে, হয়তো ওদের বাড়ির সদরেই দাঁড়িয়ে আছে। ওখানটায়ই গলিটা বেঁকেছে। সেখানে দুটো বাড়ির দেয়ালের মধ্যে একটা পনেরো গজের মাটির কানা গলি আছে। লুকিয়ে থাকা যায় গলিটাতেও। চোর-পুলিশ খেলার সময় সে নিজে বহুবার ওখানে লুকিয়েছে।
”ঠিক আছে, নিরু আমার সঙ্গেই চলুক।”
খুদিকেলো দ্রুত নিরুর কাছে গিয়ে কথা বলে ওকে সঙ্গে করে আনল।
”তুই কাকাবাবুর সঙ্গে যা, আমি একটু ট্রামরাস্তা দিয়ে ঘুরে দোকানে যাব।”
কথা শেষ করেই খুদিকেলো হনহনিয়ে অন্ধকারে ঢুকে পড়ল। প্রিয়ব্রত হঠাৎ খুব অসহায় বোধ করল। এমন একটা অবস্থার মধ্যে অপ্রত্যাশিত পড়ে গিয়ে সে বুঝে উঠতে পারছে না, তার ভয় পাওয়ার মতো কিছু এতে আছে কি না। বাঁ পকেটে হাত দিয়ে সে মোটা একটা শক্ত জিনিস অনুভব করল। এটা নিরাপদে বাড়ি পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে, সেই সঙ্গে এই মেয়েটিকেও। দুটো কাজ একই ধরনের।
