বাস থেকে নামার সময় প্রিয়ব্রত নিরুপমার দিকে ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল, ”থ্যাঙ্ক ইউ।”
মেয়েটির মুখ হাসিতে উজ্জ্বল হল। তারা গ্রে স্ট্রিট ধরে হাতিবাগানের দিকে হাঁটতে শুরু করল।
”তুই কি বাড়ি থেকে এতটা হেঁটে এসে বাসে উঠিস নাকি?”
”না না বাসে আসি। অফিস যাবার সময় কি হেঁটে সময় নষ্ট করা যায়? ফেরার সময়টাতেই হাঁটি।”
”ভালোই করিস। এমনিতেই তো তুই একটু থপথপে ধরনের, স্লো। কবাডি খেলায় কেউ তোকে দলে নিতে চাইত না। ফুটবলে তো চোখ বুজে তোকে কাটাতুম।”
প্রিয়ব্রত হাসল। একটা রাগ দপ করে উঠেই নিভে গিয়ে ক্ষীণ জ্বালা রেখে দিল। নিরুপমা ঠিক তার পিছনেই। হয়তো শুনতে পাচ্ছে তাদের কথা। উত্তর কলকাতার ব্যবসা-বাণিজ্যের বড়ো একটা বাজার এই অঞ্চল। ভিড়ে হাঁটা যাচ্ছে না একটানা। বারবার সামনে লোক, নয়তো রিকশা বা টেম্পো। দোতলা বাস থেকে সাইকেল, দুই থেকে চার চাকার সবরকমের গাড়িতে রাস্তাটা সরু হয়ে গেছে। পেভমেন্টেও হাঁটা কঠিন নানা ধরনের অস্থায়ী দোকানের জন্য।
খুদিকেলো ঠিকই বলেছে। এত বছর পরও এসব ব্যাপার ও মনে করে রেখে দিয়েছে অথচ সে কিনা ভুলে গেছিল। সে ব্যাকে খেলত। খুদিকেলো একবার তাকে বোকা বানিয়ে চতুর্থ গোলটা দেবার পরই গোলকিপার গৌর ছুটে এসে তার পাছায় লাথি কষিয়েছিল। ‘খেলতে হবে না তোকে। বেরো, ব্যাটা একটা ভোঁদড়।’ তার মনে পড়ল, বোকার মতো সে তখন হেসেছিল। খুদিকেলো হয়তো এবার সেটাই বলবে। তার মনে হচ্ছে, ওর এসব বলার উদ্দেশ্য মেয়েকে শোনানোর জন্য।
”আমি এখন বাড়ির দিকে যাব না।” প্রিয়ব্রত দাঁড়িয়ে পড়ল। ”ডাক্তারবাবুর কাছে যাব, এই রংমহলের পাশেই।”
”কী অসুখ তোর?”
”ডাক্তার ধরতে পারছে না…আচ্ছা চলি।” প্রিয়ব্রত কবজি তুলে ঘড়িটা দেখে, মাথা হেলিয়ে নিরুপমার দিকেও তাকাল। মেয়েটি হাসল কিনা দেখার জন্য সে আর দাঁড়াল না।
খুদিকেলোটাকে তার অসহ্য লাগছে। ওর সঙ্গ এড়াবার জন্য এর থেকে আর কি-ই বা করা যেত। আসলে বৃষ্টিতে দোকানে দাঁড়িয়ে থাকার সময় কথা না বলে ঠোঁটটা টেনেই দায় এড়াতে পারত। কথা দিয়ে পরিচয়টাকে টেনে এতদূর পর্যন্ত নিয়ে আসার কোনো দরকারই ছিল না। খুদিকেলোর সঙ্গে আবার কখন দেখা হবে কে জানে!
প্রিয়ব্রত ঠিক করল দর্জিপাড়ার মধ্য দিয়ে, এ গলি-সে গলি করে সময় কাটিয়ে বাড়ি ফিরবে। রংমহল থিয়েটার পর্যন্ত এসে ট্রামরাস্তা পার হয়ে সে একটা গলিতে ঢুকল। এই জায়গাতেই ট্রামে তিনকড়ির পা কাটা গেছিল। এখন সে কোথায় কে জানে! গৌররা বাড়ি বিক্রি করে ভদ্রেশ্বরে চলে গেছে বছর পঁচিশ আগে।
স্কুলের কোনো সহপাঠীর সঙ্গেই তার দেখা হয় না। তাদের নামগুলোও আর মনে নেই। শুধু একটা নাম সে খবরের কাগজে দেখেছিল বছর দুই আগে। ‘বাঙালি বিজ্ঞানীর আন্তর্জাতিক সম্মান।’ ছোটো অক্ষরে হেডিং। জেনিভায় পরিবেশ দূষণ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আলোচনাসভায় ডা. কমলেন্দু চ্যাটার্জি সভাপতিত্ব করেছে। তার পড়াশুনো জীবনের খবরের সঙ্গে ছিল স্কুলের নাম আর স্কুল ফাইনাল পাশের বছর। একই স্কুল, একই বছর। প্রিয়ব্রত অনেক ভেবেও কমলেন্দু চ্যাটার্জিকে স্মৃতি থেকে বার করে আনতে পারেনি। ব্রিলিয়ান্ট যখন, হয়তো এ-ওয়ান সেকশনেই বরাবর পড়ে এসেছে। সে স্কুল ফাইনাল পাশ করে দ্বিতীয় চেষ্টায়।
অফিসে ভৌমিককে বলেছিল কমলেন্দু তার বন্ধু ছিল। খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। সে দেখতে চেয়েছিল, সমীহ, বিস্ময়, ঈর্ষা মেশানো একটা চাহনি। ভৌমিক বলল, ‘অ, তাই নাকি।’ একটু পরে আবার বলে, ”ভাগ্যের কি পরিহাস দেখুন অতুলদা, আজ তিনি কোথায় আর আপনি কোথায়!…না, না, তাই বলে আপনাকে আমি দোষ দিচ্ছি না। এ তো শুধু কপাল নয়, ব্রেনেরও ব্যাপার আছে।”
একসময় এইসব গলি দিয়ে বহুদিন সে স্কুল থেকে ফিরেছে। তখন সে মুখস্থের মতো বলে দিতে পারত, এইবার সে দেখবে ঘুম থেকে ওঠা ফুলো ফুলো চোখ নিয়ে একটা বউ দোতলার বারান্দায় চুলে চিরুনি দিচ্ছে মাথাটা কাত করে…এইবার দেখবে একটা ঝি কলাইয়ের ভাঙা গামলায় আস্তাকুঁড়ে জঞ্জাল ফেলে রাস্তায় গামলা ঠুকছে…দুটো বাচ্চচাকে নিয়ে মা রিকশায় ফিরছে…খয়েরি-সাদা একটা নেড়ি কুত্তা মুদির দোকানের সামনে শুয়ে…রকে বসা হজমি-আচার-বিলিতি আমড়া…মিষ্টির দোকানের ছেলেটা রাস্তায় জল ছিটোচ্ছে…।
প্রিয়ব্রত থমকে দাঁড়াল বাড়িটার সামনে। কাঠের বড়ো সদর দরজা। তারপর সিমেন্ট বাঁধানো চওড়া পথ গিয়ে পড়েছে উঠোনে। উঠোনের একধারে শিবমন্দির, তার পাশে বৈঠকখানা। সে একবার ভিতরে গিয়ে দেখে এসেছিল বৈঠকখানা জুড়ে নীল আর ছাই ডোরাকাটা সতরঞ্চি পাতা নীচু তক্তপোশ। একধারে হারমোনিয়াম, বাঁয়া-তবলা, তানপুরা। কাপড়ের খোলে ঢাকা।
সদর দরজার পাশে কাঠের ছোট্ট সাইনবোর্ডটা এখনও একইভাবে দেয়ালে আঁটা, শুধু রঙটাই নতুন করা। রাস্তার আলোয় লেখাগুলো পড়া যাচ্ছে না ঠিকমতো। প্রিয়ব্রত এগিয়ে সাইনবোর্ডটার কাছে দাঁড়াল। ”সঙ্গীতা” নামটা আগের থেকে একটু বড়ো অক্ষরে। তার নীচে তিন লাইনে: ”অভিজ্ঞ ও নামী শিক্ষকদের দ্বারা যত্ন সহকারে ক্ল্যাসিকাল, আধুনিক, পল্লিগীতি ও রবীন্দ্রসংগীত শেখানো হয়। বুধ ও শুক্র। সকাল ৮-১১ ও সন্ধ্যা ৭-৯।” তার নীচে: ”অধ্যক্ষ অতুল চন্দ্র ঘোষ।”
