”অ্যাই, আমাদের কত হয়েছে?”
প্রিয়ব্রত প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে উঠে দাঁড়াল। মাইনের টাকা বাঁ পকেটে রেখেছে। ভৌমিক বলেছিল, পকেটমাররা নাকি ডান পকেটকেই টার্গেট করে। অফিসের ড্রয়ারে খামটা নিশ্চয় কাল পর্যন্ত থাকবে। ফণী পাল কাল নিশ্চয়ই আসবে।
”ঠাট্টা করে বললুম, কিছু মনে করিস না।”
”না না মনে করব কেন।” বলার সময় প্রিয়ব্রত চট করে নিরুপমার মুখটা দেখে নিল। অশ্লীল কথাবার্তা শুনলে অল্পবয়সি মেয়েদের মুখে অদ্ভুত একটা অসহায়তা ফুটে ওঠে, না শোনার ভান করে। কিন্তু সে দেখল নিরুপমার ঠোঁটের কোণে মোচড়ানো হাসি। তার মনে হল, হাসিটা যেন বাবাকে লক্ষ করেই।
অন্যান্য দিনের তুলনায় বাসস্টপে ভিড় বেশি নয়। এখন সব বাসেই একই রকম ঠাসাঠাসি, সুতরাং স্বচ্ছন্দে দাঁড়িয়ে যাবার মতো বাসের জন্য অপেক্ষা করে লাভ নেই। তিনজনে যে বাসটায় উঠল তাতে দাঁড়িয়ে যাওয়াও কষ্টকর। মেয়েদের সব আসনই ভর্তি, উপরের রড ধরার জন্যে একমুঠো জায়গাও কোথাও নেই।
নিরুপমা ঠেলেঠুলে এগিয়ে মেয়েদের আসনের সামনে দাঁড়াল। ওরা দুজন ভিড়ের মধ্যিখানে বাসের চালে হাত রেখে মানুষের চাপের মাঝে নিজেদের দাঁড় করিয়ে রাখল। শেয়ালদার উত্তর-দক্ষিণ প্রান্ত ছুঁয়ে রয়েছে ফ্লাইওভার। বাসটা হু হু করে ফ্লাইওভার দিয়ে চলেছে। উত্তর স্টেশনে ট্রেন ধরার যাত্রীরা এগোচ্ছে দরজার দিকে। তাইতে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হলেও বাসের মাঝামাঝি ভিড়টা সামান্য পাতলা হয়েছে। প্রিয়ব্রত বাঁ পকেট চেপে সেইদিকে সরে গিয়ে নিরুপমার গা ঘেঁষে দাঁড়াল। তার পিছনেই সরে এল খুদিকেলো।
প্রিয়ব্রত নিচু গলায় নিরুপমাকে বলল, ”পকেটে টাকা রয়েছে, তুমি একটু আমার বাঁদিকটা চেপে দাঁড়াও।”
বাম ঊরুতে সে কোমল একটা চাপ পেল। আপনা থেকেই সঙ্গে সঙ্গে সে পিছিয়ে যেতে গিয়ে খুদিকেলোর পা মাড়াল। মেয়ে শরীরের স্পর্শ মঙ্গলার পর এই প্রথম, বারো বছর পর।
নিরুপমা মুখ ফিরিয়ে তাকাল। কথামতো কাজটা করতে পেরেছে কিনা জানার ইচ্ছাটা ওর চোখে। প্রিয়ব্রত ছোট্ট করে ঘাড় নেড়ে এবং চাহনিকে উজ্জ্বল করে জানিয়ে দিল, এইরকমই সে চেয়েছিল। নিরুপমা আশ্বস্ত চোখে জানলার বাইরে তাকাল।
ফ্লাইওভারের উত্তরের স্টপে যত লোক নামল প্রায় তত লোকই বাসে উঠল। প্রিয়ব্রত তাঁর জায়গা থেকে নড়ল না। মেয়েদের আসন থেকে একজন উঠেছিল কিন্তু নিরুপমা বসার জন্য চেষ্টা করেনি।
হঠাৎ থামা এবং চলা শুরুর জন্য, ব্রেক কষার বা রাস্তার গর্তে চাকা পড়ায় ঝাঁকানির জন্য প্রিয়ব্রতর ঊরুর উপর চাপটার কমবেশি হচ্ছে। প্রথমে যে অস্বস্তিটা জেগেছিল ধীরে ধীরে সেটা কেটে যাচ্ছে। বারবার সে নিরুপমার মুখভাব লক্ষ করে, এমন একটা ক্ষীণ চিহ্নও খুঁজে পেল না যাতে মনে করা যায় এই স্পর্শটা সম্পর্কে সে সচেতন।
কিন্তু প্রিয়ব্রত একটু বেশিভাবেই সচেতন হতে শুরু করেছে। কিছু একটা তার শরীরে ঘটছে, চাপা উল্লাস বা ছমছমে ভাব, যা তাকে গোপন অপরাধীর মতো কুঁকড়ে রাখছে। সে এটুকু বুঝছে, কোনোরকম অপরাধই তার দ্বারা ঘটানো হচ্ছে না। কিন্তু শরীরটা এমন তাজা লাগছে কেন? এটা কি তার মনেও সংক্রমিত হবে?
”তোর দোতলার ভাড়াটে করে কি?” খুদিকেলো কথা শুরু করল। প্রিয়ব্রত তার চিন্তায় ছেদ টানার সুযোগ পেয়ে স্বস্তি বোধ করল।
”চাকরি করে, পি অ্যান্ড টি-তে।”
”লোক কেমন?”
”ভালোই তো! ঝামেলা করে না, খুব ভদ্র। বউটিও তাই।”
”আমার কাছ থেকে বউয়ের জন্য দুটো ব্লাউজ করিয়েছে। যে ব্লাউজটার মাপে করার জন্য দিয়েছিল, সেই মাপেই করে দিয়েছিলুম। তারপর দুবার আমাকে কেটে ছোটো করতে হয়েছে, নাকি ঢলঢল করছে, হাত নাকি বড়ো হয়ে গেছে, তলাটায় আরও ঝুল বাড়াতে হবে, পেট নাকি দেখা যাচ্ছে! সে হাজার বায়নাক্কা। তারপরও মজুরি দেবার সময় এক টাকা কমাবার জন্য আধঘণ্টা ধরে ঝুলোঝুলি।”
”অশোকবাবু এমন লোক তা তো জানতাম না।”
”জেনে রাখ। দেখবি একদিন জলকল নিয়ে, কি সদর দরজা খোলা নিয়ে, কি ছাদে কাপড় শুকোতে যাওয়া নিয়ে শুরু করে দেবে। ওদের টিভি আছে?”
”না, নেই।”
”যাক, অ্যান্টেনার ঝামেলাটা তাহলে নেই। তোর তো আছে?”
”আছে।”
”কালার?”
”না।”
”ফ্রিজ?”
”নেই।”
”কিনে ফেল, খুব দরকারি জিনিস।”
প্রিয়ব্রত বলতে যাচ্ছিল, তোর ফ্রিজ আছে? বললে ব্যঙ্গের মতো শোনাবে তাই চুপ করে রইল। অশোকবাবুরা এতই নির্বিরোধী, স্তিমিত যে, সে জানে কোনোদিনই ওদের সঙ্গে মনোমালিন্য হবে না। খুদিকেলো উপকার করার ইচ্ছাতেই খবর দিয়ে হুঁশিয়ার করছে। কেন ওকে হতাশ করা! ওর দোকান থেকে সে একটা রুমালও করাবে না কোনোদিন। ফ্রিজ তার আছে কিন্তু সেটা বললে দুজনের মধ্যে স্বাচ্ছন্দ্যের স্তরটা অসমান হয়ে যাবে, নেই বলাতে খুদিকেলো নিশ্চয় অনেক সহজ রয়ে গেল।
”ভাবছি এবার কিনব।”
”কিনলে বলিস। হাতিবাগানে আমার বন্ধুর দোকান আছে, বললে দুশো-আড়াইশো কমিয়ে দেবে।”
একইভাবে চাপটা তার ঊরুতে লেগে রয়েছে। দুজনের দেহের দুটো অংশ একঘেঁষে ছুঁয়ে থাকলে একসময় অসাড় লাগে। মঙ্গলা আর সে এক বিছানায় শুতো। একটা সময় এল যখন কিছুই মনে হত না। যান্ত্রিকভাবে, নিয়ম মানার মতোই কাজটা করত।
এখন পা-টা সে সরিয়ে নিতে পারে, মানিকতলা পেরিয়ে গেছে এবার তো নামার জায়গাটা আসছে। কিন্তু প্রিয়ব্রত ইচ্ছে করছে না পিছিয়ে বা সরে দাঁড়াতে। নিরুপমার শরীরের কোন অংশটা তার ঊরুতে চাপ দিয়ে রয়েছে সে জানে। কিন্তু ওর মুখে কোনো ব্যাপার নেই। বাবার বন্ধু? তার বয়সটা যদি কম হত,…হিতুর বয়স হলে কি মেয়েটি পাছাটা এত জোরে চেপে রাখত!
