দোকানের ছেলেটা এসে দাঁড়িয়েছে। ”কী দোব?”
”দুটো করে শিঙাড়া।”
প্রিয়ব্রত ধরেই নিয়েছিল খুদিকেলো, ‘না না, শুধুই চা’ বা এই ধরনের কিছু একটা বলে উঠবে। কিন্তু ওর মুখ দেখে মনে হচ্ছে যেন খুশিই হল। নিরু আড়চোখে তার বাবার দিকে একবার তাকাল।
”আমি খাব না, খিদে নেই।”
”সে কি, দুটো তো মাত্র!” প্রিয়ব্রত হালকা স্বরে বলল। নিরুর বয়স কত্ত? হিতুরই বয়সি বা ছোটোই হবে। হিতু চাকরিতে ঢোকার পর দিনদিন গম্ভীর, স্বল্পবাক হয়ে পড়েছে। এমনও সময় গেছে তিন-চারদিন তাদের মধ্যে একটা কথাও হয় না। সারা দিনে দেখাও তো হয় খুব কম। হিতুর পর একটা মেয়ে হয়েছিল, বেঁচেছিল তিনদিন।
”তোমার বাবার আমি ছেলেবেলার বন্ধু, এই প্রথম তোমার সঙ্গে পরিচয় হল, আজ না বলতে পারবে না। অন্য কোনোদিন বরং খিদে নেই বোলো কিন্তু আজ খেতে হবে।” প্রিয়ব্রত তাকাল খুদিকেলোর দিকে। ওর চোখে অনুমোদনের চারপাশে একটা খুশির আভাও সে দেখতে পেল। হয়তো বন্ধু বলার মতো কোনো লোক খুদিকেলোর এখন আর নেই।
ছেলেবেলায় কেউ বন্ধু থাকলেই কি সে চিরকালের জন্য তাই রয়ে যাবে? প্রিয়ব্রতকে খোঁচা দিল একটা অস্বস্তি। দুজনের মধ্যে অর্থ, শিক্ষা, রুচি, মর্যাদা নিয়ে গড়া অনেকগুলো সামাজিক স্তর জমে গেছে তাইতে খুদিকেলোর অনেকটাই সে দেখতে পাচ্ছে না।
তিনজনের সামনে শিঙাড়ার প্লেট বসিয়ে দিয়ে গেল ছেলেটা।
”তাড়াতাড়ি খেয়ে নে।”
”একটা খাব, তুমি একটা তুলে নাও।”
খুদিকেলা নিরুর প্লেট থেকে একটা শিঙাড়া সহজভাবেই তুলে নিল। প্রিয়ব্রত না দেখার ভান করতে মুখ পিছনে ফিরিয়ে ব্যস্ত স্বরে বলল, ”তিনটে চা দিয়ো।” তারপর নিরুকে বলল, ”চা খাবে তো?”
নিরু মাথা হেলাবার সময় হাসল। এই প্রথম প্রিয়ব্রতর মনে হল, ওকে বেশ ভালোই দেখতে।
”তোর ছেলেকে দেখলুম মোটর সাইকেল চেপে যাচ্ছে। তুই কিনে দিয়েছিস না নিজে কিনেছে?”
”কেনার টাকা অফিস থেকে দিয়েছে। মাসে মাসে মাইনে থেকে কাটিয়ে পাঁচ বছরে শোধ করতে হবে। তেমনি আবার মাসে পেট্রল খরচটাও অফিস দেয়।”
”কত?”
”চারশো।”
”কেনার জন্য কত দিয়েছে?”
”আঠারো। নাহ ভুল বললাম, কুড়ি হাজার।”
খুদিকেলো খাওয়ায় মন দিল। প্রিয়ব্রত অপেক্ষা করল, হিতুর মাইনে কত জানতে চেয়ে এইবার নিশ্চয় প্রশ্ন আসবে। মোটর সাইকেল কিনতে কত দিয়েছে বা অ্যালাওন্স হিসেবে কত টাকা অফিস দিচ্ছে সেটা হিতুর কাছে শুনেছিল, কিন্তু সঠিক অঙ্কটা এখন আর মনে নেই। অনেক কিছুই এখন তার মনে থাকে না। বয়স হওয়ার লক্ষণ। কিংবা চিন্তার চাপে স্মৃতি থেকে অনেক জিনিসই ছিটকে বেরিয়ে গেছে। মঙ্গলবার ছবিটা দেয়ালে টাঙানো আছে বলেই ওকে মনে পড়ে।
ফণী পাল আজ এল না। কুড়ি বছরে এই প্রথমবার পয়লা তারিখে ওকে দেখা গেল না। ট্রামের নীচে যেতে পারে কি? রাতে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করেছিল তিনকড়ি যেন দুর্ঘটনায় পড়ে। কিন্তু তার আগে বিকেলেই ওর পা কাটা যায়। কাল কাগজ খুলে দেখতে পাবে কি, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র বা আচার্য জগদীশচন্দ্র রোডে ট্রাম থেকে নামতে গিয়ে এক বৃদ্ধ দুর্ঘটনায় পড়েন। নীলরতন সরকার হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মাইনের টাকাটা পকেটে রয়েছে। বাড়ি পৌঁছনো পর্যন্ত হুঁশিয়ার থাকতে হবে। আজ রাতে কি সে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করবে!
”তোর বউ কত বছর মারা গেছে?”
”বারো বছর।” প্রিয়ব্রত চায়ে চুমুক দিল। বড্ড বেশি মিষ্টি দিয়েছে। শুধু খুদিকেলোই প্রশ্ন করে যাচ্ছে। লেখাপড়া না করার, শিক্ষিত লোকেদের সঙ্গে না মেলামেশার জন্যই যে এমন অভব্য কৌতূহল তৈরি হয়েছে, প্রিয়ব্রত তাতে কোনো সন্দেহ রাখছে না। ওকে একটু তফাতে রাখতে হবে। অবশ্য আবার কবে ওর সঙ্গে দেখা হবে কে জানে। খুদিকেলোর বাড়ির রাস্তা কালীমোহন মিত্র স্ট্রিট আর তার হাঁটাচলা গুপি বসাক লেন দিয়ে, তাও শুধু বাজার আর অফিস করার জন্য।
”তুই বিয়ে করলি না কেন, করা উচিত ছিল।”
প্রিয়ব্রত হাসল। তাছাড়া আর কি-ই বা করতে পারে। মঙ্গলা মারা যাবার পর এই ধরনের কথা সে পাঁচ-ছজনের কাছে শুনেছে। হিতুর বয়স তখন এগারো, তার তখন উনচল্লিশ। এই বয়সে অনেকে প্রথমবার বিয়ে করে। সামনের বাড়ির জ্যাঠতুতো বউদি একদিন এসে বলল, ”রাজি থাকো তো বলো মেয়ে দেখি। এইটুকু ছেলেকে কে দেখবে? কে সংসার চালাবে?” সে শুধু মাথা নেড়ে গেছে। না, না, আমিই দেখব, আমিই চালাব। সবাই ধরে নিয়েছিল মঙ্গলার জন্য ভালোবাসায় সে আর কোনো স্ত্রীলোককে ঘরে আনতে চায় না। মৃত স্ত্রীর স্মৃতি বুকে নিয়েই সারাজীবন কাটিয়ে যাবে। তখন সে রোজ বাজার থেকে রজনীগন্ধার মালা এনে মঙ্গলার ছবিতে পরিয়ে দিত। বছর দুই পর বন্ধ করে দেয়। মঙ্গলা খুব ভালো মেয়ে, ভালো বউ ছিল। প্রিয়ব্রত সত্যিই ওকে ভালোবাসত।
আবার কেন বিয়ে করেনি সে? কারণটা সে শুধু মঙ্গলাকেই বলতে পারত। ও মারা গিয়ে প্রিয়ব্রত একটা জিনিস চিরতরে হারিয়েছে। অতি গোপন কথা গচ্ছিত রাখার মানুষ তার আর কেউ নেই।
চায়ের কাপ মুখে উপুড় করে তলানিটুকু পর্যন্ত খেয়ে খুদিকেলো ঠোঁট চাটল। ”ব্যাটারা এত চিনি দিয়েছে!…বিয়ে না করে ভালোই করেছিস, বোকারাই বিয়ে করে। এখনও তো ইয়ং আছিস, মেয়েমানুষ রেখেছিস?”
