বাতাস ও বৃষ্টির প্রাথমিক দাপট কেটে গেছে। অসমান পেভমেন্টে এখানে ওখানে জল জমেছে। তার উপর বৃষ্টির জলের লাফানি দেখে প্রিয়ব্রত আন্দাজ করল এখন হাঁটা যায় তবে বাস ধরার আগে ভিজে যেতে হবে। রাস্তায় হাঁটাচলা শুরু হয়ে গেছে। তাদের পাশের কয়েকজনও বেরিয়ে পড়ল।
”আর দাঁড়িয়ে থেকে কি লাভ।” খুদিকেলো মেয়েকে বলল, ”চল এগোই। আচ্ছা…প্রিয়ব্রতের উদ্দেশ্যে।
”আমিও যাব।”
তিনজনে রাস্তা পার হয়ে এগোতে লাগল শেয়ালদার দিকে। মেঘলা আকাশ। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, মেঘ ডাকছে। অন্ধকার ভাব জড়িয়ে রয়েছে ভেজা বাড়িগুলোয়, রাস্তায়, পথচারীদের ভেজা পোশাকেও। বৃষ্টিতে ধুলো মুছে যাওয়া গাছের পাতাগুলো পর্যন্ত কালচে দেখাচ্ছে। পেভমেন্টে ফেরিওয়ালাদের সামগ্রী কালো আর নীল প্লাস্টিক চাদরে মোড়া। এক একটা বসা গোরুর মতো চলাচলের পথ সরু হয়ে যাওয়ায় ধাক্কাধাক্কি হচ্ছে। প্রিয়ব্রত দু-হাত পিছিয়ে পড়েছে।
মেয়েটির পায়ে হাওয়াই চটি। গোড়ালি ক্ষয়ে চটিটা ছোটো হয়ে গেছে। পা তোলার সঙ্গে কাদাজল ছিটকে উঠে শাড়ির পিছনে কালো কালো বুটি ধরাচ্ছে। ফিকে হলুদ খোলের কচি কলাপাতা রঙের পাড়। বয়স্করাই এমন শাড়ি পরে, হয়তো এটা ওর মায়ের। ভিটামিনের অভাব গায়ের চামড়ায়। ব্লাউজের বাইরে ঘাড়ের উপর ফুলে রয়েছে মেরুদণ্ডের হাড়। সরু কাঁধদুটো সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে ভেজার পরিমাণটা কমাতে চাইছে।
প্রিয়ব্রত পা চালিয়ে খুদিকেলোর পাশাপাশি হয়ে বলল, ”আচ্ছা বিডন স্ট্রিটে এক মামার দর্জির দোকান ছিল না!”
”হ্যাঁ, তার কাছেই গেছলুম। আমার তো ওই একটাই মামা। দোকানটা অনেকদিন আগেই বিক্রি করে দিয়েছে, এখন ওটা মাড়োয়ারির খাবারের দোকান। আমি মামার দোকানেই কাজ শিখেছি।”
সারি দিয়ে প্রচুর রুটের বাস আসে শেয়ালদার এই জায়গায়। লরেটো ডে স্কুলের সামনেই সাধারণত বাসগুলো থামে। সেখানে অপেক্ষা করছে বহু লোক।
”অতুলবাবু যে, বাড়ি চললেন?”
প্রিয়ব্রত চমকে পাশে তাকাল। বাসের জন্য অপেক্ষমাণদের মধ্যে অফিসের সুবিনয় মাইতি। দোতলায়, এস্ট্যাবলিশমেন্টের। তার মতোই পুরনো লোক। কখনোসখনো দেখা হয়ে যায়। দুজনেই তখন হেসে মাথা কাত করে। সুবিনয় কাজের মানুষ, কথা কম বলে।
প্রিয়ব্রত চকিতে দেখে নিল খুদিকেলোর মুখ। না, অবাক হবার মতো কোনো চিহ্ন তাতে নেই। চাহনি, ভুরু, কপাল কোনোটাই কুঁচকে যায়নি।
”হ্যাঁ বাড়ির দিকেই তবে…প্রিয়ব্রত মুখ ফিরিয়ে খুদিকেলোর দিকে তাকিয়ে বলল, ”এর সঙ্গে এখন একটা কাজে এই কাছেই যাব,…কেলো আয়, তাড়াতাড়ি…চলি সুবিনয়বাবু।”
খুদিকেলোর বাহু ধরে সে ছোট্ট টান দিল। সুবিনয়ের সঙ্গে এই ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে কথা বলার কোনো দরকার নেই। কথা বললেও ‘অতুলবাবু’ শব্দটা ওর মুখ থেকে হয়তো আর বোরোবে না। কিন্তু তবুও…প্রিয়ব্রত দশ-বারো গজ হাঁটার পর বুঝতে পারল সে খুদিকেলোর বাহুটা ছাড়েনি।
”তোর অফিসের?”
প্রিয়ব্রত হাঁফ ছাড়ল সুবিনয়কে এড়িয়ে যেতে পেরে আর সম্বোধন সমস্যাটা আপনা থেকেই মিটে যাওয়ায়। সে হালকাও বোধ করছে, বহু বছর পর সমবয়সি একজনকে তুই বলতে পারল। ‘শিবপ্রসাদ এসো’ না বলে ‘কেলো আয়’ আপনা থেকেই মুখে এসে গেল বোধহয় নার্ভাস হওয়ার জন্য। আর খুদিকেলোও চট করে ‘তোর’ বলে ফেলল ‘তোমার’ না বলে। হয়তো ও অপেক্ষা করছিল তুই না তুমি-র দেয়ালটা টপকে আসতে পারি কিনা দেখার জন্য।
”এড়িয়ে গেলি যে, ভ্যান্তারা পার্টি বোধহয়?”
”হ্যাঁ, যত্তোসব আজেবাজে বিষয় নিয়ে ননস্টপ বকে যাবে। চা খাবি?”
প্রিয়ব্রত দাঁড়িয়ে পড়ল। মেয়ের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে খুদিকেলো বলল, ”দেরি হয়ে যাবে ফিরতে। অন্ধকার হয়ে গেলে আমাদের রাস্তাটায় চলাফেরা বেশ বিপদের।”
”আরে কলকাতার কোন রাস্তায় বিপদ নেই শুনি? অন্ধকার আর আলোয় কোনো তফাত আছে কি, চল চল, এই তো সামনেই দোকান, চা খেতে কতক্ষণ আর লাগবে?”
আবার সে বাহু ধরে এগোল। ধরতে ভালো লাগছে। খুদিকেলো একসময় পাড়ার ছেলেদেরই নয় তারও হিরো ছিল। ওকে ছোঁয়া মানে জীবনের একটা খণ্ডকে অনুভব করা, তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়কে স্মৃতিতে জাগিয়ে তোলা।
খাবারের দোকান, সঙ্গে চা-ও বিক্রি করে। ঘেঁষাঘেঁষি টেবল আর সরু চেয়ার। অপরিচ্ছন্ন মেঝে, দেওয়াল এবং কর্মচারীদের পোশাকও। পাখা ঘুরলেও ভ্যাপসা গরমের সঙ্গে জমে রয়েছে বাদাম তেল আর চিনির রসের গন্ধ। ওরা দোকানে ঢোকার সঙ্গেই একটা টেবল থেকে চারজন উঠল।
”কেলো দেরি করিসনি, বসে পড়।”
বাবা-মেয়ে পাশাপাশি, তাদের মুখোমুখি বসল প্রিয়ব্রত। মেয়েটি ফিসফিস করে বাবাকে কিছু বলতেই খুদিকেলো মাথা নেড়ে চাপা স্বরে বলল, ”তাড়াতাড়িই উঠব।”
”কেন এত তাড়া কীসের?” প্রিয়ব্রত মেয়েটির দিকে সোজা তাকাল। ”নাম কী তোমার?”
মাথা নিচু করে বলল, ”নিরুপমা।”
”তার মানে তুমি হলে নিরু। তোমাদের বাড়ি থেকে চেঁচিয়ে ডাকাডাকি করলে আমার ঘর থেকে শোনা যায়। তরু, নিরু, অরু তারপর আরও কী কী নাম যেন?”
”বরু আর সরু। সবাই ওর ছোটো। পাঁচটা মেয়ে, নিরুপমা, তরুলতা, অরুণা, বরুণা, সরলা।”
খুদিকেলো বলল ”মিলগুলো তো হল না, নিরুপমার পর তো অনুপমা হবে?”
