পাড়াটার একপ্রান্ত পড়েছে কালীমোহন মিত্র স্ট্রিটে, আর একপ্রান্ত গুপী বসাক লেনে। মলমূত্র এবং বাড়ি থেকে ফেলা আবর্জনা মাড়িয়ে ও ডিঙিয়ে চোর-পুলিশ খেলতে খেলতেই প্রিয়ব্রত প্রথম দেখেছিল শুকনো রক্তমাখা ভাঁজ করা পুঁটলি। তার সঙ্গে ছিল খুদিকেলো। ছুটতে ছুটতেই প্রিয়ব্রত জিজ্ঞেস করেছিল, ”ওটা কি বল তো?” ”আর জোরে ছোট, বাঁয়ে গুপী বসাক দিয়ে চলে যা আমি সোজা সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ দিয়ে ঘুরে যাব…ওটা হল মেয়েদের ন্যাকড়া, প্রত্যেক মাসে হয়।”
ক্লাস সেভেনে পড়া প্রিয়ব্রত চমৎকৃত হয়েছিল। তারই বয়সি অথচ তার থেকে কত বেশি জানে! শ্যামবর্ণ, মিষ্টি মুখ, ভালো স্বাস্থ্য, সমবয়সিদের থেকে সামান্য বেঁটে এবং মুখ খারাপ করা খুদিকেলো কর্পোরেশন স্কুলে তিন বছর কাটিয়ে পড়া ছেড়ে দিয়েছিল। কাবাডি খেলত দারুণ। ওর রেইড করাটা দেখার মতো ব্যাপার ছিল। একই সঙ্গে হাত ছুঁড়ে আর পিছনে পা তুলে মারত। সাপের ছোবলের মতো আর ঘোড়ার লাথির মতো! মেরেই আঙুল দিয়ে মোর হওয়াদের দেখাতে দেখাতে ফিরে আসত নিজের কোর্টে। প্রিয়ব্রত এটা নকল করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু হাত আর পা, একই সঙ্গে অত দ্রুতগতিতে সে মেলাতে পারত না। খুদিকেলো গলিতে ক্যাম্বিস বলে ফুটবল খেলাতেও ছিল দুর্ধর্ষ। দেওয়ালে বল মেরে রিবাউন্ড-এ সেই বল ধরায় ওর জুড়ি ছিল না। এইভাবে পরপর চারজনকে কাটিয়ে সে বহু গোল করেছে। প্রিয়ব্রত এটাও নকল করতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি। অনেক পাড়ার টিমই খুদিকেলোকে হায়ার করে নিয়ে খেলত। তবে দেওয়াল না পেলে কানা হয়ে যেত ওর গোল করার ক্ষমতা। বড়ো বল নিয়ে খোলা মাঠে সে কখনো খেলেনি।
খুদিকেলোর ভালো নাম যে শিবপ্রসাদ দাস এটা প্রিয়ব্রত জানতে পারে পাড়ার দুর্গাপুজোর বার্ষিক বিবরণ ও চাঁদাদাতাদের নামের বই থেকে। স্বেচ্ছাসেবকদের নামের তালিকায় প্রিয়ব্রতর নামের পরেই ছিল ওই নামটা। এই নামে পাড়ায় কে আছে জানার জন্য সে জ্যাঠতুতো সেজদাকে জিজ্ঞাসা করেছিল। সেজদা ছিল সর্বজনীন পুজোর যুগ্ম সহ-সম্পাদক। ‘ও তো খুদিকেলো’ শুনে প্রিয়ব্রত অবাক হয়ে যায়।
এখন মৌলালির মোড়ে দমকা বাতাসে ওড়া ধুলোর ঝাপটার মধ্যে হঠাৎ খুদিকেলোকে গা ঘেঁষে দাঁড়ানো দেখে প্রিয়ব্রত পঁয়ত্রিশ বছর আগে অবাক হওয়ার স্বাদটা পেল।
সে বলতে চাইল ‘কেমন আছিস?’ কিন্তু তুই না তুমি, কোনটা দিয়ে সম্বোধন করা উচিত ঠিক করতে না পেরে বলল, ”কোত্থেকে?”
খুদিকেলোও যেন দ্বিধায় পড়ল। চোখ নামিয়ে বলল, ”এই এখানেই…মামার কাছে।”
”এখন কি বাড়ির দিকে?”
ওকে তো তুই-ই বলতাম!
”হ্যাঁ।”
”আমিও।”
এত বছর কথা না বলায় অপরিচিতের মতো লাগছে। তুই বলাটা কি ঠিক হবে? অবশ্য ও তাতে কিছু মনে করবে না।
তারা রাস্তার দিকে তাকাল। আরও কিছু লোক দোকানের দরজার সামনে এসে আশ্রয় নিয়েছে। বড়ো বড়ো বৃষ্টি ফোঁটায় পেভমেন্টে পটপট শব্দ উঠছে। হাওয়ায় বৃষ্টির ঝাপটা দোকানের দিকে দু-তিনবার ঘুরে আসতেই দাঁড়ানো মানুষগুলো ঘন হয়ে সরে এল। কয়েকজন উঠেপড়ল দরজার ধাপে। রাস্তার ওপারের বাড়িটার তিনতলায় একটা হলুদ সাইনবোর্ড দড়িতে ঝুলছে আর দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে।
খুদিকেলোর গায়ের সঙ্গে গা লাগছে। প্রিয়ব্রত ঘাম আর নারকেল তেলের গন্ধ পেল। জামার কলারের ভিতরে ময়লা, ঘাড়ে পাকা চুল, চাঁদিতে টাক, গলার চামড়া ঢিলে, কোঁচকানো। ওকে একটা ছোটো দর্জির দোকানে কাজ করতে দেখেছে। দোকানটা ওরই।
পূর্ব-পশ্চিম ট্র্যাফিক এখন বন্ধ। অপেক্ষমাণ গাড়িগুলোর ফাঁক দিয়ে ধর্মতলা স্ট্রিটটা পার হওয়া যায়, কিন্তু তাতে কী লাভ। বাসে ওঠার আগেই কাকভেজা হয়ে যেতে হবে। এখন কোথাও আচ্ছাদনের নীচে দাঁড়াবার জায়গা পাওয়া যাবে না।
”গরমটা এবার কমবে।”
খুদিকেলো তাকেই বলল। প্রিয়ব্রতও কথা বলতে চায়। বহু বছর ছোটোবেলার কোনো বন্ধুর সঙ্গে সে কথা বলেনি।
”আজকের মতো কমবে, তারপর যে-কে সেই। লাভের মধ্যে এখন বাসে ওঠা শক্ত হয়ে পড়ল।”
”এ বৃষ্টি বেশিক্ষণ থাকবে না। যা বাতাস, মেঘটেঘ উড়িয়ে নিয়ে যাবে!”
প্রিয়ব্রত মুখ ফিরিয়ে কথা বলছিল। মেয়েটির চোখ আধবোজা। বৃষ্টির কণা বাতাসে উঠে মুখে লাগছে। তাতে চামড়ায় যে শিরশিরে ভাব জাগে বোধহয় সেটাই উপভোগ করছে। গালের ঠিক মাঝে ছোট্ট একটা তিল। নাকটা লম্বা, শক্ত চৌকো চোয়াল। চাপা থুতনি। মাথায় বাপেরি সমান। খুদিকেলো রীতিমতো বেঁটেই।
”এটা ঠিক কালবোশেখি নয়।”
প্রিয়ব্রত খবরের কাগজে হেডিংটা শুধু দেখে বাজারে বেরিয়ে গেছিল। তারপর আর কাগজ পড়া হয়নি। রোজই তাই হয়, অফিস থেকে ফিরে এসে পড়ে। তার ছেলে হিতব্রত ‘দ্য মেইল’ ইংরিজি খবরের কাগজের রিপোর্টার। ওই কাগজটাই সে পড়ে।
মেয়েটি আড়চোখে তাকাতেই তার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। মুখ ফিরিয়ে নিল। চোখের মণিটা বেশ বড়ো আর ধূসর। ওর কাছে একদম অপরিচিত সে নয়। প্রিয়ব্রতর তিনতলার ঘরের জানলা বা ছাদ থেকে খুদিকলোর দোতলা বাড়ির ছাদের সবটাই দেখা যায়। মেয়েটিকে সে ছাদের বছর দশেক আগেও এক্কা-দোক্কা খেলতে দেখেছে। তাকেও নিশ্চয় দেখেছে। পাঁচিলে তোশক শুকোতে দেবার সময় দেখে থাকবে কিংবা ঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে সে মাঝে মাঝে যখন আকাশে তাকিয়ে থাকে।
