ঘরের বাইরে বারান্দা। তারপর একটু খোলা পাঁচিলঘেরা জমি, লোহার ফটক। উত্তরবঙ্গের এক বড়ো জমিদারের আবাস ছিল এই বাড়িটা। অফিস হবার মতো আকৃতি বা অবস্থান ঘরগুলোর নয়। দোতলা আর তিনতলার বড়ো দালান ঘরদুটোয় কাঠের পার্টিশান দিয়ে কয়েকটা খোপ, অফিসাররা বসে। ময়লা পর্দা ঝোলে সেগুলোর দরজায়।
এই খোপগুলোরই একপ্রান্তে ঘরের কোণায় পাশাপাশি দুটো টেবিলে বসে প্রিয়ব্রত আর ভৌমিক। পার্টিশান না থাকলেও ঘরের মতোই জায়গাটা। মেঘলা দিনে টেবল ল্যাম্প জ্বালিয়ে কাজ করতে হয়। মোটা দেয়ালের জন্য গরমের দিন ভিতরটা ঠান্ডা থাকে। চার তলার ছাদেও অ্যাসবেস্টস চালা দিয়ে হালকা গাঁথুনির কয়েকটা ঘর করে নেওয়া হয়েছে।
তিনতলার সিঁড়ির চওড়া ল্যান্ডিংয়ে ছোটো একটা টেবিলে শ্যামসুন্দরের ক্যান্টিন। তোলা উনুনে চা, ওমলেট তৈরি হয়। পাঁউরুটি আর বাড়ির তৈরি ঘুঘনিও পাওয়া যায়। একটা বাচ্চচা টেবিলে ঘুরে ঘুরে খাবার, চা দিয়ে আসে। ময়লা একটা খাতায় শ্যামসুন্দর ধারের হিসাব রাখে। প্রিয়ব্রত গত মাসের জন্য তিপ্পান্ন টাকা আজই ওকে দিয়েছে।
বারান্দায় এসেই আকাশে তার চোখ পড়ল। ফটকের দুধারে চারটে পাম গাছ। তার উপরে ঘোমটার মতো আকাশে বিছিয়ে রয়েছে ঘন কালো মেঘ। কখন যে জমেছে ভিতরে বসে সে টের পায়নি। অবাক হয়ে সে তাকিয়ে রইল। গত চারদিন কলকাতার তাপ সাঁইত্রিশ-আটত্রিশ ডিগ্রির মধ্যে রয়েছে। দুপুরটায় অফিসের ভিতরে থাকার জন্য সে বুঝতে পারে না বাইরে রোদের তাত কতটা কষ্টকর। বাইরে থেকে যারা ঘুরে আসে শুধু তাদের মুখেই শুনতে পায় কী অসহ্য হয়ে উঠেছে গরমটা।
.
ভৌমিক বলেছিল, ”এসব হচ্ছে আদিখ্যিতে। গরমদেশের মানুষের মুখে গরম নিয়ে কমপ্লেন মানায় না।” কথাটা ঠিক। বাসে ফেরার সময় ভ্যাপসা গুমোটে নির্বিকার গাদাগাদির মধ্যে একটা লোকও গরম নিয়ে অভিযোগ তোলে না। থুতনি থেকে কনুই থেকে ঘাম ঝরে পড়ে সিটে বসা লোকের কপালে বা হাতে। তারা রেগে ওঠে না শুধু কাঁচুমাচু হওয়া মুখের দিকে কড়া চোখে একবার তাকিয়ে বিড়বিড় করে ঘামের ফোঁটা মুছে নেয়।
বারান্দার পাঁচিলে হাত রেখেই প্রিয়ব্রত তুলে নিল। রোদ সরে গেছে কিন্তু এখনও জুড়োয়নি। আকাশের এদিকটা ফিকে নীল, রোদ্দুরও রয়েছে। কিন্তু ওই ঘন মেঘটা গুটিগুটি এগিয়ে আসবে। বছরের প্রথম কালবৈশাখী আজ এলেও আসতে পারে। তাড়াতাড়ি বাস ধরতে পারলে অন্তত হাতিবাগান পর্যন্ত কিংবা মানিকতলা অবধি বৃষ্টিকে পিছনে ফেলে রাখা যাবে। ফণী পালের খবর আজ আর বোধহয় নেওয়া যাবে না।
অফিস থেকে বেরিয়ে প্রিয়ব্রত দ্রুত হাঁটতে শুরু করল। শেয়ালদায় প্রাচী সিনেমার স্টপে বাস থেকে অনেক লোক নামে ট্রেন ধরতে। ওইখান থেকে বাসে ওঠার সময় ধাক্কাধাক্কি করতে হয় না, দাঁড়াবার জন্য একটু ভালো জায়গাও ভিতর দিকে পাওয়া যায়, তাছাড়া ওখান থেকে বাসে উঠলে শ্যামবাজার পর্যন্ত ভাড়া পঞ্চাশ পয়সা। অফিস থেকে এই বাস স্টপে পৌঁছতে প্রিয়ব্রতকে জোর বারো মিনিট হাঁটতে হয়। ঘড়িতে সে সময় নিয়ে দেখেছে।
মৌলালির মোড়ে তাকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল। পূর্ব-পশ্চিম ট্র্যাফিক চলাচল হচ্ছে। উত্তর-দক্ষিণ এখন থেমে রয়েছে। সে যাবে উত্তরে। পেভমেন্ট থেকে রাস্তায় নেমে আবার উঠে এল। হঠাৎ একটা ঠান্ডা বাতাস দমক দিয়ে মৌলালির মোড়ের গাছগুলোর পাতা ঝাঁকিয়ে দিল। পথচারীরা চমকে উঠেই মুখে ছড়িয়ে দিল তৃপ্তির হাসি। প্রিয়ব্রতর মতো অনেকেই আকাশের দিকে তাকাল। রোদ নেই শুধু একটা ছাই রঙের আলো যাতে কোনোকিছুরই ছায়া পড়ে না।
এই সময় তার নজরে পড়ল ওই দুজন। রাস্তা পার হবার জন্য ওরাও অপেক্ষা করছে। বাপ আর মেয়ে। খুদিকেলো, আর…কিন্তু মেয়েটির নাম সে জানে না। তিরু বা নিরু বা অরু, এর মধ্যেই একটা কোনো নাম হবে। এই নামগুলোই তার কানে মাঝেমাঝে আসে যখন সে ছাদে থাকে। খুদিকেলোর পাঁচ মেয়ে।
আবার একটা দমকা বাতাস। রাস্তায় পড়ে থাকা শুকনো পাতা, কাগজ উড়িয়ে ধুলোর ঝড় উঠল। কুঁজো হয়ে বাতাসের বিরুদ্ধে পিঠ ফিরিয়ে প্রিয়ব্রত চোখ বন্ধ করল। চুলের মধ্যে ধুলো ঢুকছে, ঘাড়ে আর হাতের অনাবৃত অংশে ধুলোর ঝাপটায় চামড়া চিড়বিড় করে উঠল। টিনের চালা বা দোকানের সাইনবোর্ড এইরকম ঝড়েই উড়ে আছে। প্রিয়ব্রত দ্রুত পা চালিয়ে একটা লেদ মেশিন দোকানের দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আঙুল ঢুকিয়ে চুল ঠিক করতে করতে দেখল তার পাশেই খুদিকেলো এবং তার মেয়ে।
প্রিয়ব্রত ওর দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে অনিশ্চিতভাবে হাসল। অন্তত পঁচিশ বা তিরিশ বছর তারা কথা বলেনি, যদিও কৈশোর পর্যন্ত একসঙ্গে খেলা করেছে।
তাদের বাড়িও পিঠোপিঠি। দুই বাড়িরই খিড়কি দরজা খুললে চারফুট চওড়া আর প্রায় চল্লিশ গজ লম্বা বেলে পাথরের একটা পগাড়। তার দুধারে গোটা বারো বাড়ির খিড়কি। যখন খাটা পায়খানা ছিল তখন এই পগাড় দিয়েই মেথররা পরিষ্কারের কাজ করত। প্রিয়ব্রত অবশ্য খাটা পায়খানা দেখেনি। ছোটোবেলায় চোর-পুলিশ খেলার সময় পগাড়টা ছেলেদের কাজে লাগত। তখন সে একটা বাড়ির দেয়ালে ঢালাই লোহায় লেখা ‘সিউয়ার্ড ডিচ’ কথাটা আঁটা দেখেছিল। একটা গ্যাসবাতি ছিল তাদেরই খিড়কি দরজার উপর।
