”আর কাউকে অ্যাটেম্পট না করে ওর ব্যাগটাকেই টার্গেট করল, তার মানে জানত!” প্রিয়ব্রতর পাশের লোকটা বলেছিল।
”এত টাকা সঙ্গে থাকলে তার সাবধান হওয়া উচিত ছিল।” আর একজন প্রিয়ব্রতকে ফিসফিস করে শোনায়।
খোলা ড্রয়ারে খামটা রাখার সময় সে আড়চোখে তাকাল। ওরা দুজন নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।
”তাহলে পারলেন না। আপনি হচ্ছেন ইলেভেনথ, এবার দেখি অতুলদা টুয়েলফথ হন কিনা!”
প্রিয়ব্রত ড্রয়ার বন্ধ করে গা ঝাড়া দিয়ে সোজা হয়ে বসল।
”ভৌমিকদা পারলেন না বলতে।” স্বদেশ টেবিলে দু হাত রেখে একই ভঙ্গিতে ঝুঁকে দাঁড়াল। ”অতুলদা এবার আপনার পালা। বাবর হল প্রথম মোগল বাদশা তাহলে বাহাদুর শা জাফর কততম মোগল বাদশা?”
”হঠাৎ এমন বেয়াড়া প্রশ্ন?” প্রিয়ব্রতর স্বরে কোনো ঔৎসুক্য নেই।
”কারণ আছে, পরে বলছি। খুবই কঠিন প্রশ্ন। বাহাদুর শা-র নাম নিশ্চয় শুনেছেন। আঠারশো সাঁইত্রিশ সালে তেষট্টি বছর বয়সে দিল্লির মসনদে বসে কুড়ি বছর রাজত্ব করেছিল। তারপর সিপাই বিদ্রোহের সময় ইংরেজরা ওকে বউ-ছেলেসমেত ধরে রেঙ্গুনে চালান করে দেয়। ওরই দরবারে ছিল মির্জা গালিব, যার নামে এখন ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। যাক গে, ওসব কথা, এখন বলুন বাহাদুর শা কততম মোগল বাদশা?”
”জানি না।”
”বলেছি তো কঠিন প্রশ্ন।” স্বদেশের মুখ জ্বলজ্বলে হয়ে উঠল। কঠিন প্রশ্ন যারা করে তারা যে খুব সাধারণ বুদ্ধির লোক নয় এটা সে সবাইকে জানাতে চেষ্টা করে।
”বাহাদুর শা-কে নিয়ে এখন মাথা ঘামাবার কোনো দরকার আছে কি?” ভৌমিক দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়েই ছড়ানো চিঠি আর মেমো আঁটতে শুরু করল পিন দিয়ে।
”দরকার নেই মানে? তিনশো বছরেরও ওপর ভারতে রাজত্ব করল যারা সেই বংশের শেষ বাদশার কোনো গুরুত্ব নেই? কি বলছেন ভৌমিকদা! জানেন মোগল বংশের শেষ পুরুষ মানুষটি, বাহাদুর শা’র পুতি মানে নাতির ছেলে, নীলরতন সরকার হাসপাতালের ফ্রি বেডে মারা গেছে উনিশশো আশিতে?”
”কে বলল তোমায়?” ভৌমিক ঈষৎ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল। স্বদেশের মুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল।
”জানতে হয়, বুঝলেন খবর রাখতে হয়। এই লাস্ট মুঘলের নাম হল প্রিন্স বেদার বখত, অফিসিয়ালি রেকগনাইজড লাস্ট মুঘল মেল ডিসেনডেন্ট। ইন্ডিয়া গাবমেন্ট মাসে আড়াইশো টাকা পেনসন দিত। ওর পাঁচটি মেয়ে, কোনো ছেলে নেই। অতএব মোগল বংশ নীলরতনের ফ্রি বেডেই খতম।” স্বদেশের মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে এই তথ্যটি জানাবার জন্যই এতক্ষণ সে ভূমিকা ফাঁদছিল।
”বুঝলেন অতুলদা,” ভৌমিক ফাইলের দিকে তাকিয়ে ফিতে বাঁধার কাজে ব্যস্ত থেকেই বলল, ”যত রাজ্যের লুকোনো খবর, হাঁড়ির খবর, গোপন ব্যাপার জানার জন্য স্বদেশের এই আগ্রহটা কিন্তু একদমই ভালো নয়। এরপর কোনোদিন হয়তো এসে বলবে, ”আচ্ছা বলুন তো আমাদের অফিসে কারা কারা বয়স কমিয়ে চাকরি করছে?”…ডেঞ্জারাস লোক এই স্বদেশ সরকার।”
ভৌমিক বা স্বদেশ যদি লক্ষ করত তাহলে দেখতে পেত প্রিয়ব্রতর মুখ থেকে রক্ত সরে গিয়ে সেখানে মৃতের পাণ্ডুরতা।
”আমি ডেঞ্জারাস লোক! দুঃখ দিলেন ভৌমিকদা, আমায় আপনি দুঃখ দিলেন। পৃথিবীতে কোন লোকের না গোপন ব্যাপার আছে বলুন? আমার আছে, আপনার আছে, অতুলদারও আছে। ঠিক বলছি কিনা?” স্বদেশ সমর্থনের আশায় প্রিয়ব্রতর দিকে তাকাল।
ঠোঁটটা টেনে রেখে সে শুধু ফিকে হাসল। সঙ্গে সঙ্গে বুঝতেও পারল তার হাসিটা যথাযথই হয়েছে। কথা না বললে যে লোক কথা বলে না, তার কাছ থেকে এইটুকুর বেশি হাসি আশা করা যায় না। কিন্তু সে জানে এইটুকু হাসার জন্যও তাকে চেষ্টা করতে হয়েছে। স্বদেশের ”অতুলদারও আছে” কথাটা তার মস্তিষ্কের গভীর জায়গায় হাতুড়ির দুটো ঘা মেরে অসাড় করে দিয়েছে।
স্বদেশ কথাটা কেন বলল? ও কি কিছু আন্দাজ করেছে? ফণী পাল আজ আর এল না। ওর সঙ্গে কি স্বদেশের পরিচয় আছে? কখনো কি দুজনকে কথা বলতে দেখেছি বা চোখাচোখি হলে পরিচিতের হাসি? ফণীকে সে অফিসের কারুর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। তবে সবাই দেখেছে একটা লোক প্রতি মাসে মাইনের দিন আসে, তার সামনে বসে, একটা সাদা খাম নিয়ে চলে যায়। মাসের পর মাস, কুড়ি বছর ধরে। ফণী পালের ব্যাপারটা চোখে পড়া স্বাভাবিকই। এই ঘরে কুড়ি বছরের বেশিকাল চাকরি, তাকে বাদ দিলে আর মাত্র দুজন করছে। ভৌমিকের ষোলো বছর, স্বদেশের সাত বছর চাকরির বয়স।
প্রিয়ব্রত ড্রয়ারে চাবি ঘোরাল। টেনে দেখল, তালাবন্ধ হয়েছে কিনা। দেয়াল ঘড়ি দেখল। পাঁচটা বাজতে পাঁচ।
”উঠলেন নাকি অতুলদা?” স্বদেশ বলল।
”হ্যাঁ, আজ একটু তাড়াতাড়িই…।” দুটো ফাইল হাতে প্রিয়ব্রত উঠে দাঁড়াল। চেয়ারের পিছনে স্টিল আলমারিতে সে দুটো রেখে পাল্লা বন্ধ করে চাবি দিল।
”অতুলদার কাছে ওর এক জ্ঞাতি দাদা প্রতি মাসের পয়লায় আসেন টাকা নিতে…সাহায্য। আজ আসেননি, তাইতে দাদার মন খুব ডিস্টার্বড, স্বাভাবিকই।”
ভৌমিকের দিকে তাকিয়ে প্রিয়ব্রত হাসার চেষ্টা করল। স্বদেশের চোখে নম্র ছায়া। শ্রদ্ধার মতো। গোপন ব্যাপার জানার জন্য কৌতূহল লুকিয়ে আছে ওই চোখের আড়ালে। সে আলমারির হাতল টানল চাবি বন্ধ হয়েছে কিনা জানার জন্য।
সেকশ্যনাল ম্যানেজার সজল দত্তর টেবিলে থাকে হাজিরা খাতা। পাঁচ মিনিট আগে সই করলে কিছু বলবে না। কিন্তু এটা সে মনে করে রেখে দেবে। প্রিয়ব্রত চায় না কোনোভাবে কেউ অফিসে তাকে মনে রাখুক। একটা ধূসর ছায়ার মতো সে ছাব্বিশ বছর এই অফিসে থেকেছে, রিটায়ার করা পর্যন্ত তাই থেকে যেতে চায়।
