পরদিন সে ক্লাসে গিয়ে দেখল ছেলেদের একটা জটলা। তাকে দেখেই উত্তেজিতভাবে একজন বলল, ”প্রিয় তোর বিচিটা বেঁচে গেল। কাল তিনকড়ির একটা পা ট্রামে কাটা গেছে। কন্ডাক্টার টিকিট চাইতেই চলন্ত ট্রাম থেকে লাফিয়ে নামতে গিয়ে পা পিছলে ট্রামের তলায়…।”
প্রিয়ব্রত আবার ঘড়ি দেখল। গত কুড়ি বছরে এই প্রথম ফণী পালের দেরি হচ্ছে। প্রত্যেক মাসের পয়লায়, মাইনের দিনে ঠিক সাড়ে চারটেয় ফণী আসে। তিনকড়ি আর কখনো স্কুলে আসেনি। সে কেন যে হঠাৎ বেঞ্চের ধারে বসতে চেয়েছিল আজও তা জানা হয়নি।
মিহি ধুতি, আদ্দির পাঞ্জাবি, কখনোই আধময়লা বা ইস্ত্রি ছাড়া নয়। বোধহয় এখানে আসবে বলেই ফণী কাচানো ধুতিপাঞ্জাবির পাট ভাঙে। মাথার সিঁথিকাটা চকচকে চুলের সঙ্গে যেন মানাবার জন্যই পরে কালো পাম্প শু। ফণীর বয়স কমপক্ষে পঁয়ষট্টি। সুতরাং কলপ ছাড়া চুল অত কালো হবার কথা নয়। ফণী শৌখিন মানুষ। বাঁ হাতের তিন আঙুলে তিনটি আংটি। একটি তামার, একটিতে পলা এবং অন্যটিতে তিনরঙের পাথর।
তাহলে আজ আর বোধহয় আসবে না। তিনকড়ির মতো ট্রামের তলায় বা ওইরকম কোনো দুর্ঘটনায় যদি ফণীর পা কাটা যায় তাহলে কী হতে পারে? অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু আংটিগুলো কি গ্রহের ফের থেকে ওকে বাঁচাবে না? সেইজন্যই তো ওগুলো পরা। বছর দেড়েক আগে মোটা ছড়িটা হাতে নিয়ে প্রথমবার ফণী এসেছিল। রাস্তায় কুমড়োর খোসায় পা পড়ে পিছলে যায়। মুচকে গেছিল বাঁ পায়ের গোছ। ”বুঝলে হে, এই ছড়িটা কেন নিয়েছি বলতে পার?” ফণী পাল ভ্রু তুলে চোখ ছোটো করে তাকিয়ে থেকে হাসছিল। ”বলবে, পিছলে পড়া থেকে নিজেকে সামলাবার জন্য লাঠি নিয়েছি, তাই তো? আরে দেহের পতন কি লাঠিসাঠি দিয়ে রোধ করা যায়! এটা হাতে নিয়েছি পতনের কারণগুলোকে চলার পথ থেকে সরিয়ে দেবার জন্য! এই তো আমার অফিসের দোড়গোড়ায় দেখলুম একটা এঁটো শালপাতা, সরিয়ে দিলুম একধারে।”
ফণী পালের কথাগুলো শুনতে শুনতে সে প্রতি মাসের পয়লা তারিখে যেভাবে একটা সাদা খাম এগিয়ে দেয়, সেইভাবেই ড্রায়ার থেকে তুলে টেবলে ছড়ানো তিনটি আংটির সামনে খাম রেখে দিয়েছিল। ফণী খামটাকে গ্রাহ্যের মধ্যে না এনে উৎকণ্ঠিত স্বরে বলেছিল, ”একটা কিছু ভরসা হাতে নিয়ে চলা খুব দরকার,…ভেরি ডেঞ্জারাস টাইম এখন ভেরি ডেঞ্জারাস!”
মুখটা উদ্বিগ্ন রেখেই ফণী খামটা তুলে ভাঁজ করে পাঞ্জাবির বোতাম খুলে ভিতরের বুকপকেটে রাখল। প্রিয়ব্রত আড়চোখে তার বাঁদিকের চেয়ারে বসা দিলীপ ভৌমিককে চট করে একবার দেখে নেয়। ভৌমিক তাকিয়ে আছে ফণীর দিকে। অফিসের সেই ঘরের সবাই জানে মাইনের দিনে এই লোকটা আসে একটা খাম নেবার জন্য। খামের মধ্যে টাকা থাকে। কত টাকা, সেটা আর কেউ জানে না। লোকটার নাকি খুবই অভাব।
মাসের পর মাস ঠিক এইভাবে ফণী বোতাম খোলে, খামটা ভাঁজ করে দুবারের চেষ্টায় পকেটে ঢোকায়। প্রিয়ব্রতর এটাই আশ্চর্য লাগে যে, কুড়ি বছর ধরে একই মাপের খাম সে দিচ্ছে আর একই মাপের পকেটওলা পাঞ্জাবি পরে ফণী আসছে। আর একইভাবে বাঁ হাতের দুটো আঙুল দিয়ে বোতামগুলো লাগিয়ে নিয়েই বলবে, ”এবার এক গ্লাস জল খাওয়াও।”
প্রিয়ব্রত আগে ব্যস্ত হয়ে চেঁচিয়ে জল দিয়ে যাবার জন্য বেয়ারাকে বলত। মাস চারেক পর তার মনে হয় এজন্য ফণী মিনিট দুই সময় বেশি পেয়ে যাচ্ছে তার সামনে বসে থাকার। খামটা ওর হাতে তুলে দেবার সঙ্গে সঙ্গে সে অনুভব করত তার মধ্যে একটা হিংস্র ইচ্ছা গজরে ওঠে। টেবলের ওপর দিয়ে লাফিয়ে পাঞ্জাবিটা ফালাফালা করে দেবার ইচ্ছা। এইটুকুই মাত্র। তাই সে ফণী আসার আগেই এক গ্লাস জল আনিয়ে টেবলে ঢাকা দিয়ে রেখে দিতে শুরু করে। ফণী জল চাওয়ামাত্র গ্লাসটা সে এগিয়ে দেয়। এরপর ফণী আর জল চাইত না, নিজেই ঢাকনা তুলে গ্লাস টেনে নেয়। জল খেয়ে বলে, ”এখন তো তুমি বেরোবে না, আমি তাহলে এগোই।”
প্রিয়ব্রত জলভরা গ্লাসটার দিকে তাকাল। ওটা এভাবেই রয়ে যাবে, নাকি সে খেয়ে নেবে? নির্দিষ্ট ছন্দের মধ্যে আজই প্রথম বেতাল একটা ব্যাপার ঘটায় সে অস্বস্তিতে পড়ে যাচ্ছে। ফণী পাল কি আজ আসবে না? জলটা কি সে খেয়ে নেবে?
”আপনার দাদা এলেন না যে?”
”তাই তো ভাবছি, বুড়োমানুষ। কিছু হলটল নাকি?”
প্রিয়ব্রত চিন্তা নিয়ে ভৌমিকের দিকে তাকিয়ে রইল।
”উনি তো ঘড়ি ধরে ঠিক এই সময়ে আসেন। একবার খোঁজ নিন কোনদিকে থাকেন উনি?”
”আমাদের দিকেই।”
”তাহলে বাড়ি ফেরার পথে একবার ঘুরে যান।”
স্বদেশ সরকার এসে ভৌমিকের টেবিলে দুহাত রেখে ঝুঁকে দাঁড়াল। প্রিয়ব্রত তখন ভাবছে খামটা ড্রয়ারেই রেখে যাবে না সঙ্গে নিয়ে বাড়ি যাবে! ড্রয়ার চাবি দেওয়া থাকে, তাছাড়া খামটা সবার অলক্ষ্যেই রাখবে। তাহলে তালাভাঙার প্রশ্নই ওঠে না। ছাব্বিশ বছরে মাত্র একবার সে ছাতা ফেলে গেছিল, পরদিন এসেই সেটা পেয়ে যায়। বেয়ারা সতীন তুলে রাখে। মিষ্টি খেতে ওকে একটা টাকা দিয়েছিল। চারবছর আগে সে রিটায়ার করে গেছে। কিন্তু সবাই তো আর সতীন নয়!
খামটা পকেটে করে বাড়িতে যাওয়াও নিরাপদ নয়। মৌলালি থেকে রাজাবাজার পর্যন্ত শেয়ালদার এই অঞ্চলটায় বাসগুলোতে পকেটমার থাকবেই। গত মাসের মাঝামাঝি সে তার বয়সিই একজনকে বাসের মধ্যে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠতে দেখেছে। মহাজনকে দেবার জন্য চার হাজার টাকা তার হাতের ছোট্ট ব্যাগটায় ছিল।
