শুভা একসময় শুতে এল। আলো নিভিয়ে সে ব্লাউজ খুলবে। বিছানায় শুয়ে ভাঁজকরা চাদরটা খুলে শরীরের উপরে বিছিয়ে নেবে। তুষার অপেক্ষায় রইল।
”ওটা পড়লে?”
তুষার নিশ্বাস বন্ধ করে রইল উত্তরের জন্য।
”কণাকে পড়তে দিয়েছি।”
”কেন? ওকে কেন?” তুষার অস্ফুট আর্তনাদ করে বালিশ থেকে মাথা তুলে ফেলেছে। অপ্রত্যাশিত উত্তরটা সোজা একটা ঘুঁষির মতো এসেছে। শুভা যে এমন একটা কাজ করতে পারে, এই সম্ভাবনাটা একদমই তার চিন্তায় ছিল না। সে বিব্রত হয়ে বলল, ”কণাকে পড়তে দেওয়ার কী দরকার, ওটা তো তোমায় লেখা!”
”আমি চিঠির মালিক, আমি পড়তে দিয়েছি…একটা গল্প ছাড়া ওতে আমার জন্য কিছু নেই। আমার জীবন আমিই কন্ট্রোল করব, বরাবর তাইই করে এসেছি। কেউ নাক গলাক তা আমি চাই না।”
তুষার পাশ ফেরার শব্দ পেল। তার শুধু একটিই প্রশ্ন ছিল: কণা কী বলল? কিন্তু জানে, করে কোনো লাভ নেই। শুভা ‘আমি’ আর ‘আমার’ ছাড়া অন্য কিছুতে আগ্রহী নয়।
সকালে খাবার টেবলে কণা কাগজ পড়ছিল। তুষার চেয়ারে বসতেই কাগজটা তাড়াতাড়ি এগিয়ে দিল।
”কি ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ভূপালে হয়েছে দেখেছ? গ্যাসে আড়াই হাজারের মতো লোক মারা গেছে।” কণার স্বর আটকে গেল উত্তেজনায়।
তুষার কাগজটা হাত থেকে নেবার সময় তীক্ষ্ন তদন্ত করল কণার মুখটাকে। চিঠির কোনো ছাপ খুঁজে পেল না। আড়াই হাজার লোকের মৃত্যু যন্ত্রণা ওর চোখ দুটো ঘোলাটে করে দিয়েছে।
”মিথাইল আইসোসায়ানেট একটা বিষাক্ত কেমিক্যাল, পেস্টিসাইডস তৈরিতে লাগে। ছোঁয়া বাঁচিয়ে ভীষণ সাবধানে কাজ করতে হয়।” বাইরে ভিজে কাপড় মেলতে মেলতে শুভা ক্লাসে পড়াবার মতো টানা স্বরে বলল এবং অবশ্যই কণাকে উদ্দেশ্য করে।
তুষার অস্বস্তি ভরে, মৃত্যুর বিবরণ পড়ায় ব্যস্ত কণার মুখের দিকে আড়চোখে কয়েকবার তাকাল। কিছু একটা ঘটেছে ওর মধ্যে। কী সেটা? ভোপাল না তার চিঠি? কে এখন জুড়ে আছে ওর মন? ও কি কিছু বলবে?
অফিসে যাবার জন্য বেরোচ্ছে সেই সময় শুভা তার হাতে একটা বড় খাম দিয়ে বলল, ”কণা এটা তোমায় দিতে বলল, পৌঁছে দেবার জন্য?”
”কোথায়…কাকে?”
”ভেতরে লেখা আছে।”
খামটা টেনে নিয়ে তুষার প্রায় হনহনিয়ে স্টেশনে রওনা হল। ন’টা-বারো ধরতে না পারলে অফিসে লেট হবে। লেট হওয়াটাকে সে কোনোদিন বরদাস্ত করেনি।
প্ল্যাটফর্মে সে এবং ন’টা-বারো প্রায় একসঙ্গেই পৌঁছল। প্রতিদিনের মতই ভিড় এবং প্রতিদিনের মতই ধাক্কা এবং চাপের দ্বারা সে কামরার ভিতরে ঢুকে গেল। হাওড়ায় নেমে লঞ্চ ঘাটের দিকে ঊর্ধ্বশ্বাসে যাবার সময় তার হাতের খামটা সম্পর্কে খেয়াল হল। দুমড়ে মুচড়ে বিশ্রী হয়ে গেছে।
ঘাটের দিকে আসা লঞ্চটা মাঝ গঙ্গায়। তুষার সময় পেয়ে সেই ফাঁকে খামের মধ্য থেকে কাগজটা বার করে দেখল, একটা স্কেচ। মুখটা দোমড়ান সত্ত্বেও হিমুকে চিনতে তার কোনো বিঘ্ন হল না। চোখ দুটিতে বড় স্বচ্ছ দৃষ্টি। তুষারের মনে হল অনেক দূরে, যেন ভবিষ্যতকে খুঁজছে, এই রকম একটা অর্থ দৃষ্টি থেকে বার করে নেওয়া যায়। স্কেচের নিচে লেখা: হিমুকে-দিদি।
এখন গঙ্গার হাওয়া, তার খুবই সৎ এবং নির্মল লাগল।
সাদা খাম
সাদা খাম – মতি নন্দী – উপন্যাস
১
সে আবার সামনের দেওয়াল ঘড়িটার দিকে তাকাল তারপর নিজের হাতঘড়িটায়, বহুদিনের অভ্যাস। ভুল সময় জানিয়ে তাকে ঠকাবে এমন ধারণা থেকে সে এটা করে না। অফিসের ঘড়ির সঙ্গে নিজের ঘড়িটা তার মেলানই। প্রতিদিনই ছুটির সময় সে একবার মেলায়। পঁচিশ বছর আগে বিয়েতে পাওয়া ওমেগা ঘড়িটা এখনও এক মিনিটও স্লো বা ফাস্ট হয় না। তবুও। অফিসের ঘড়ি যদি আধ নিমিট ফাস্ট হয়, সেও তার ওমেগাকে আধ মিনিট ফাস্ট করে দেবে। নিজের ঘড়ির দিকে চোখ রেখে আসলে সে নিশ্চিত হতে চায় পরদিন অফিসে যেন লেট না হয়ে যায়। সময়ের ঠেলাঠেলিতে নিজের জায়গা থেকে সরে যায়নি, এই বোধটা তার কেন যে পাওয়া দরকার তা সে জানে না।
ছাব্বিশ বছরের এই চাকরিতে সে একদিনও দেরিতে পৌঁছয়নি। স্কুলেও সে তাই ছিল।
ক্লাসটাকে তিনভাগ করে যাতায়াতের দুটো সরু পথ। একটা পথের ধারে শেষ বেঞ্চে সে বসত আরও তিনজনের সঙ্গে। তার পাশেই বসত লম্বা, মোটাসোটা একটি ছেলে, নাম ছিল তিনকড়ি। ঠাকুমা মারা যাওয়ায় তিনদিন কামাই করে স্কুলে গিয়ে দেখে তিনকড়ি তার জায়গায় বসে। প্রথমে সে মৃদু প্রতিবাদ করেছিল। তাইতে তিনকড়ি বলে, ”এটা কি তোর বাবার কেনা জায়গা?” ক্লাসে মাস্টারমশাই আসতেই সে নালিশ জানায়। তিনকড়ি জায়গা ছেড়ে বসার সময় চাপা গলায় বলেছিল, ”ছুটি হোক, লাথি মেরে তোর বিচি ফাটাব।”
ছুটির ঘণ্টা বাজার পরও সে ক্লাসে বসে থাকে। ক্লাস ফাঁকা হয়, স্কুলও ফাঁকা হয়, সে ভয়ে বেরোয়নি। ঘরের দরজা বন্ধ করতে এসে বেয়ারা তাকে দেখে অবাক হয়ে বসেছিল, ”এখনও বসে!” সে স্কুল থেকে বেরিয়েছিল আরও একঘণ্টা পর, যখন গেটের কাছ থেকে হাতছানি দিয়ে ডেকে বেয়ারা চেঁচাল, ”কেউ নেই, এইবার বাড়ি যাও।” তবু সে তিনকড়ির ভয়ে প্রতিদিনের রাস্তা দিয়ে না গিয়ে ঘুরপথে বাড়ি ফিরেছিল। পরদিন তিনকড়ি কখন তাকে লাথিটা ঠিক ওই জায়গাটায় মারবে সেই ভাবনায় সারা রাত তার ঘুম হয়নি। বছরের মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ কেন তিনকড়ির বেঞ্চের ধারে বসার ইচ্ছা হল, তাই নিয়েও সে ভাবে। অবশেষে সে সিদ্ধান্তে পৌঁছয়, একটা মারাত্মক দুর্ঘটনায় পড়ে তিনকড়ির স্কুলে আসা বন্ধ না হলে তার বাঁচার আর কোনো উপায় নেই। ভগবানের কাছে সে প্রার্থনা জানিয়েছিল তিনকড়ির জন্য একটা ব্যবস্থা করার।
