-তুই কবিতা লেখা ছাড়লি কেন?
-কি হবে লিখে। এ্যাদ্দিন লিখলুম, দু’চারজন ছাড়া কেউ পড়েও না, চেনেও না। তাছাড়া পয়সাও পাওয়া যায় না। আমার পয়সার দরকার চিনু।
-তাই বলে কবিতা লেখা বন্ধ করবি কেন?
-ঈশ্বর, মেয়েমানুষ, সমাজ, অস্তিত্ব,-এই সবগুলোকে চুলচেরা বিচার করে, অনেক হীরে-জহরতই তো দেখলুম, কিন্তু একটাও গয়না গড়াতে পারলুম না। আসলে তছনছ করতেই আমরা পারি, গড়তে পারি না। যদি নিজেকে গুছোতে পারি, জীবনকে পরিপূর্ণ করতে পারি তাহলেই একটা কিছু করতে পারব। সব আগে সংসারের ভাবনা থেকে রেহাই পেতে চাই, একটা চাকরি চাই। চিনু তুই আমার কথা শুনছিস না?
-শুনছি।
চিনু বাসের জানলা থেকে, চোখটা অমলের চোখে রাখল। জ্বলছে চোখজোড়া। সারা মুখটাও। সরু বুক বাতাসের চাপে চুপসে যাচ্ছে, আবার ফুলে উঠছে দ্বিগুণ হয়ে।
মুখ ফিরিয়ে চিনু আবার ডবল ডেকার দেখতে থাকল। অমল ভাবে নির্লিপ্ত না হলে কবি হওয়া যায় না। সংসারের কথা অত ভাবলে কি করে কবি হবে? কবিতে আর সাধারণ মানুষে তফাত কি? আমাতে আর অমলে কি তফাত? ও সুন্দর করে একটা কথা লিখতে পারে, আমি পারি না। গুছিয়ে কিছু করতে পারাটাই যদি কবি হওয়ার উপায় হয়, তাহলে ব্যাঙ্কে টাকা জমিয়ে যে লোক মরে সেও কবি। এযুগে কি কেউ নির্লিপ্ত থাকতে পারে? তার মানে কি, এযুগে বড় কবি জন্মাবে না!
-অমল হাঁটবি একটু।
-কোন দিকে, শ্যামবাজারে?
-হ্যাঁ।
-তুই মণীষের সঙ্গে গেলি না?
কাঁধঝাঁকুনি দিয়ে চিনু বলল:
-ক্লান্তি লাগে। চিরকালতো আর এমন গা ভাসিয়ে চলা যায় না। মেয়েমানুষের গল্প করেই সময় কাটল, কোন মেয়ে আর জীবনে এল না।
দুজনেই হাসল। অন্য ফুটে ভিড় কম। দুজনে রাস্তা পার হয়ে এল।
-চারটে পয়সা আছে? তাহলে আলুর চপ কেন।
-দুটো আছে। ভাগাভাগি করে খাওয়া যাবে।
অমল আলুর চপ কিনে আধখানা ভেঙে দিল।
-দুপুরে ভাত খাওয়ার পর এই খাচ্ছি। ভীষণ ক্ষিদে পায়। রোজ পায়। মণীষটা আজ আধখানা কেকও খাওয়াল না। মিছিমিছি গালাগাল হজম করলুম।
অমলের আধখানা আলুর চপ খাওয়া দেখল চিনু। মুখে পুরে গিলে ফেলল, আবার তুলে এনে চিবুতে লাগল। চোখাচোখি হতেই হাসল চোখ বুজে।
-বেশ করে।
-তুই এটাও খা।
-নাঃ। কাল যখন বাড়িতে ঢুকলুম উনুনে হাঁড়িচাপান। বাবা তক্ষুনি চাল কিনে এনেছে। বোনগুলো চুপচাপ ব’সে। দেখে কষ্ট হল। ভাবলুম বলি খাব না, বন্ধুর বাড়ি নেমন্তন্ন খেয়ে এসেছি। বলতে পারলুম না। ক্ষুধার্তের কানে নেমন্তন্ন শব্দটা ভয়ানক। খালি পেটে ডিম ভাঙার শব্দ শুনে দেখিস!
এই নিয়েই তো লিখতে পারিস।
-তোর জানাশুনো টিউশনি আছে?
-না। পেলেতো আমিই করি।
-দুটো টাকা দিতে পারিস?
-কোথায় পাব টাকা।
-তবে এতটা পথ হাঁটালি কেন?
আর একটি কথাও না বলে অমল উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করে দিল।
.লজেঞ্জুস ক’টা শেষ হয়ে গেছে। দিনেশ এধার ওধার তাকাল। রেলের গুদাম। মালগাড়ি। ভিখিরি। কতকগুলো ঝকঝকে পানের দোকান।
এধারে রেলিং, স্টীমারঘাট। ওপারে আলো। ডানদিকটা ঘুটঘুটে। বাঁদিকে আলোর সরলরেখা, হাওড়াপুল। নিমতলা শ্মশান, কুকুর, পুলিশ। পাগল। মড়াকান্না। মাংসপোড়ার গন্ধ। ভূতনাথের মন্দির। স্তোত্রপাঠ।
আর দুপয়সার লজেঞ্জুস কিনে আনলে হয়। উঠবে বলে মন ঠিক করেও দিনেশ উঠল না। জোয়ার আসছে। ঢেউয়ের শব্দ হচ্ছে। সমুদ্র দেখিনি। এর কতগুণ বড় ঢেউ আর শব্দ সেখানে! অনেকদিন চান করিনি গঙ্গায়। বাড়ি থেকে বেশ দূরে, চান করে ফিরে আবার বাড়িতে চান করতে হয়। তবু ছোট বেলায় আসতুম। জেটি থেকে ঝাঁপ খেতুম। এখান থেকে উত্তরে আরো মিনিট দশ। হাঁটলে দেখা যাবে। যাবে কি?
আছে কি এখনো জেটিটা! একবার দেখে এলে হয়। অনেকদিন আসি না গঙ্গায়। মা’কে পুড়িয়েছিলুম কাশি মিত্তির ঘাটে। বাবাকেও। সেই শেষ আসা। জেটি থেকে ঝাঁপ খেতে গিয়ে পশুপতি মারা গেল। জেটির তলায় শেকলে জড়িয়ে গেছল। সেদিন থেকেই গঙ্গায় চান করা হয়ে গেছে। পশুপতি বানের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে ভেসে গিয়ে উঠত বরানগর কি দক্ষিণেশ্বরে। এটা তার খেলা ছিল। সে মারা যেতেই ভয় পেলুম। গুরুজনের নিষেধ সেদিন প্রথম মান্য করলুম।
জলের ধারে নেমে এসে মাথায় জল ছিটোল দিনেশ। গাঁজা খাচ্ছে দুটো লোক। আর একটু ওপাশে গ্যাসবাতি জ্বালিয়ে কেত্তন হচ্ছে। বুড়ীগুলোকে এতদূর থেকেও ঠিক চেনা যায়। ওদের বসার কায়দাটাই অদ্ভুত।
বয়স হলে ধর্মকথা শুনতে ইচ্ছে করে। কেন করে কে জানে। ভয়েতে বোধ হয়। মৃত্যুর পর বিচার হবে ইহলোকে কাজ-কম্মের। বিচারে ঠিক হবে কে স্বর্গে আর কে নরকে যাবে। স্বর্গে খুব সুখ। শুনলে স্বর্গে যেতে লোভ হয়। বুড়োরা খুব লোভী হয়। খেতে আর গালাগালি দিতে ওরা খুব ভালবাসে।
আমি কি লোভী হয়ে পড়ছি! আমার কি বয়স বাড়ল। বাবু হয়ে জলের ধার ঘেঁষে দিনেশ বসে পড়ল। এখন ঘাড় ফেরালে তিন দিকে শুধু সিঁড়ি দেখা যাবে আর সামনে জল।
আমি কি বুড়ো হয়েছি? আমার কি সব ফুরিয়ে গেছে? ঘণ্টা-দিন-মাসের হিসেবে আমার শরীরের বয়স বেড়েছে। আর কি বেড়েছে? পৃথিবীটা একটু বদলেছে। আর কি? মানুষ!
আমাদের ছোটবেলার-দেখা মানুষ আর আজকের-চোখে দেখা মানুষে তফাত হয়েছে। পশুপতির বাবা নিমাই কাকা রাত্তিরে বাড়ি থাকত না। ভাইরা সম্পত্তি ঠকিয়ে নিল। ছোট ভাই কলেরায় মারা যেতে তার সংসারটাও যেচে ঘাড়ে নিল। নিমাই কাকা দেনা রেখে মরল। আজকের দিনে এমন গল্প শুনলে কেউ বিশ্বাস করবে না। নিমাই কাকা যখন মরে তখন আমাদের জোয়ান বয়স। সৎকার সমিতি ওকে পোড়ায়। দেখে কষ্ট হয়েছিল। জোয়ান বয়সের কষ্ট বড় বেশি অন্তরে বেঁধে। জোয়ান বয়সের সুখও বড় আন্তরিক।
