শুভা খাবার টেবলে বসে স্কুলের কাজ করছিল। জানলাগুলো বন্ধ। মশা মারার ধূপ জ্বলছে। মুখ তুলে দুজনকে দেখে নিয়ে বলল, ”কণা, দুধটা খেয়ে নিও।”
দুধ টেবলেই গ্লাসে ঢাকা দেওয়া রয়েছে। কণা এক চুমুকে শেষ করে উপরে যাবার আগে, শোবার ঘরে বাবাকে জামা খুলতে দেখল। স্পোর্টসে নিশ্চয় কিছু একটা প্রাইজ পেয়েছে। সেটা এবার তাহলে হিমুই পেল। কণার মনে হল, তার সঙ্গে বাবার কি একটা বন্ধন যেন ছিঁড়ে গেল।
আলো নিভিয়ে তুষার শুয়ে ঘরে। শুভা ঘরের বাইরে এখনো স্কুলের কাজে মগ্ন। মায়ের কথাগুলো মনের মধ্যে সে রেকর্ডারের মতো চালিয়ে শুনছে। একসময় বিরক্ত হয়ে উঠে বসল। আমি কী করতে পারি? কেন অবিরত প্রতিটি অনুভূতি, অনুভবকে কেটেচিরে বিচার, বিশ্লেষণ করার ইচ্ছে হয়? এ এক যন্ত্রণা, নিজেকে নিজে এভাবে কয়েদ করে ফেলা! বাবার মৃত্যুর দেড় বছর পর আমি জন্মেছি? তাহলে আমার মা…? ‘তোর ছেলে আমাকে অনেক ধন্যবাদ দেবে আমার দূরদৃষ্টির জন্য।’ হায় মূর্খ! কি ভয়ঙ্কর একটা দমবন্ধ করা অবস্থায় ফেলে দিল এই দূরদৃষ্টি। আমি বেজন্মা হয়ে রয়েছি সেই স্কুল জীবন থেকে। ‘চাকরিবাকরি পেতে কম বয়স দেখবি কী সাহায্য করবে।’ আর সেজন্য আমাকে জন্ম দেওয়ানো হল এমন একটা বছরে যখন বৈধ বাবার পক্ষে সম্ভব ছিল না পিতৃত্বের দাবি প্রতিষ্ঠার। কেউ জানে না, তাতে কী হয়েছে? আমি তো জানলাম, একটা ইতর চালাকি আমাকে দেড় বছর বেশি চাকরি করার লাভটুকু দেবে। অনেকেই তো বয়স কমায়, এটা নিয়ে কেউ কি ব্যস্ত হয়ে ওঠে। তাহলে আমি কেন একটা অসহনীয় অবস্থা মনের মধ্যে তৈরি করছি? আমার কি বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পাচ্ছে?
তুষার দেবাই পুকুরে অন্ধকার ঘরে বসে নিজেকে নিয়ে যখন ছটফট করছে তখন হাজার মাইল দূরে নিদ্রামগ্ন এক শহরের আকাশ খুশি গ্যাসের মেঘে ছেয়ে গিয়ে, ধীরে ধীরে টিপে ধরছিল হাজার হাজার কলিজা। ঘুমের মধ্যেই তারা-কোলের শিশু, মা, বাবা, ঠাকুমা, ঠাকুরদা, জোয়ান বৃদ্ধ-মৃত্যুর মুঠিতে নিষ্পেষিত হতে হতে মারা যাচ্ছিল বিষাক্ত মিথ গ্যাসে। লাখে লাখে মানুষ নিঃশ্বাস নেবার জন্য নির্মল বাতাসের সন্ধানে দিশাহারা হয়ে চিৎকার করে ছুটে বেড়াচ্ছিল। তুষারও ঠিক সেই সময় একটা ক্ষুদ্র ভোপাল তার চেতনার মধ্যে তৈরি করে অন্ধ হয়ে যাচ্ছিল, নির্মল বাতাসের জন্য নিজেকে বার করে আনতে চাইছিল।
পরদিন অফিসে ড্রয়ার থেকে একটা সাদা কাগজ বার করে তুষার তার টেবলে রাখল। অনেকক্ষণ একদৃষ্টে কাগজটার দিকে তাকিয়ে থেকে কলমটা তুলে নিয়ে ঝুঁকে পড়ল।
”শুভা,
একটা কথা বলার জন্য এই চিঠি। মুখেও সেটা বলতে পারতাম। কিন্তু ভেবে দেখলাম মুখে সবসময় গুছিয়ে সব কথা বলা যায় না। অনেক কিছু বলব ভেবেও বহুবার দেখেছি অনেক কথা মনের মধ্যেই হারিয়ে যায়। তাছাড়া কথাগুলো তোমাকে আঘাত করবে, সুতরাং সাবধানে বলা দরকার। মনকে উদঘাটন করতে হলে ভিতর থেকে টেনেটেনে নিজেকে বার করে আনতে হয়। সময় লাগে। ঠিক জায়গায় ঠিক শব্দটি লাগাতে চিন্তা করতে হয়। যে কথাটা বলতে যাচ্ছি সেটা আমাদের উভয়ের জীবনের পক্ষেই গুরুত্বপূর্ণ।
তোমার হয়তো মনে আছে বছর বারো আগে একটি মেয়ে বাড়িতে এসেছিল তোমার স্কুলে একটা চাকরির জন্য। লিভ ভেকেন্সিতে একজন টিচার নেওয়া হতে পারে শুনে উমেদার হয়ে এসেছিল। সেদিন ছিল রথযাত্রা, তুমি বাড়ি ছিলে না। তখন তার সঙ্গে আমার আলাপ হয়…।”
এই পর্যন্ত লেখার পরই তুষার কলম থামাল। টেবলের কাছ দিয়ে অনেকে যাতায়াত করছে। সাদা কাগজে কিছু লিখছে দেখলে কেউ হয়তো, কোনো ছুতোয় কাছে দাঁড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করবে। লেখাটা ভাঁজ করে সে পকেটে রাখল। বাড়িতে বসে লিখবে। যখন শুভা রান্নাঘরে কিংবা স্কুলের কাজ নিয়ে অথবা বই লেখায় ব্যস্ত থাকবে, সেই সময় ঘরে বসে চিঠিটা লিখে ফেলবে।
অফিস ছুটির পর সে দেবাই পুকুরে ফিরে এল। শুভা স্কুলের দুটি মেয়ের সঙ্গে বসার ঘরে, কিছু একটা বুঝিয়ে দেওয়ায় ব্যস্ত। সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে ছাদের দরজার কাছে আলো দেখে বুঝল, কণা তার ঘরে। সন্তর্পণে শোবার ঘরে এসে নিজের খাটে তুষার শুয়ে পড়ল। আধঘণ্টা পর আলো জ্বেলে সে চিঠিটা সম্পূর্ণ করতে বসল।
বসার ঘর থেকে আর কথার আওয়াজ আসছে না। মেয়েদুটি চলে গেছে। কাগজটা ভাঁজ করে তুষার বসার ঘরের দরজায় এসে দেখল শুভা গভীর মনোযোগে খাতা দেখছে। হাতে লাল কলম।
”একটা চিঠি লিখেছি তোমাকে দেব বলে।”
তুষার ভাঁজ করা কাগজটা শুভার সামনে রাখল। ভ্রূ কুঁচকে চশমার ফাঁক দিয়ে তুষারের মুখে একবার তাকিয়ে সে চিঠির দিকে হাত বাড়াল। তুষার ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
কত মিনিট কত ঘণ্টা কেটে গেছে তুষার তা হিসাব রাখেনি। অন্ধকার ঘরে সে চোখ বুজে শুয়ে থেকে শুনে গেছে পায়ের শব্দ। শুভা রান্নাঘরে গেল, কোনো দরকারে একবার শোবার ঘরেও এল, আলো জ্বালল। আলমারি খোলা-বন্ধের শব্দ হল। আবার দীর্ঘক্ষণ নৈঃশব্দ্য একসময় শুভা চেঁচিয়ে কণাকে ডাকল খাবার জন্য। দুজনের কথার শব্দ অস্পষ্টভাবে তার কানে এল। ঘরের দরজার কাছ থেকে কণা ডাকল, ”বাবা, খাবে এস।”
”শরীরটা ভালো নেই, পরে খাব।”
সত্যিই যেন শরীর ভালো লাগছে না। জ্বরের মতো একটা ঘোর তাকে পেয়ে বসেছে। শুভা নিশ্চয়ই এতক্ষণে পড়ে ফেলেছে। যতটা সম্ভব আবেগ, ভাবপ্রণতা থেকে নিজেকে দূরে রেখে সে শুধু কিছু তথ্য ও ঘটনাই লিখেছে। নিজের পক্ষ নিয়ে বা কাউকে দায়ী করে একটি কথাও লেখেনি। শুভাকে প্রভাবিত করা সহজ কথা নয়। তবু ওর প্রতিক্রিয়া না জানা পর্যন্ত সে অসুস্থতার মধ্যে থাকবে। কান্নাকাটি বা রাগারাগি, চিৎকার ঝগড়া কিছু একটা হোক তাহলে এই ঘোরটা কেটে গিয়ে সে সুস্থ হতে পারবে।
