”বোধহয় না। আমার তো পাসটাসের কোনো সার্টিফিকেট নেই, আর চাকরি পাবার সময় ওসবের দরকারও লাগেনি।” তরুণ অনায়াস স্বরে বলল কণার দিতে তাকিয়ে। ”টেনেটুনে ক্লাস নাইন পর্যন্ত উঠেছিলাম। তবে মেজদাও বি-এ পাস, ওর ম্যাট্রিক সার্টিফিকেটে বয়স লেখা আছে।”
দু’হাতে রেকাব নিয়ে ছোটকাকি এলেন। ঠান্ডা সিঙ্গারা আর দুরকম মিষ্টি প্রতিটিতে। বোধহয় আগে কিনে রাখা ছিল। কোনো ওজর না তুলে কণা খেতে শুরু করল। তার বা তাদের সম্পর্কে ছোটকাকির ধারণাটায় কোনো নতুন রং লাগুক সেটা সে চায় না।
”বউমা, আমি কিছু খাব না, শরীরটা ভালো নেই।” তুষার কেমন এক ম্লান স্বরে বলল।
”কেন, কী হল?” বৃদ্ধা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলেন।
”অম্বল আছে নাকি? আমার কাছে কোবরেজি ওষুধ আছে, দেব?”
”না থাক। শরীরটা এমনিই ভালো লাগছে না।”
”রাতে খাবি তো? চক্কোবত্তি মশাই আর দুগ্গা ভটচাযকে খেতে বলেছি, তোদেরও তো খাবার কথা, চিঠিতে তো বলে দিয়েছি, বলিনি?” বৃদ্ধা ব্যাকুল হয়ে কণার দিকে তাকালেন। ”হ্যাঁরে কণা খাবার কথা বলিনি?”
”আমি তো চিঠি দেখিনি। তবে রান্না হয়ে থাকলে আমি তো খাবই।” সে লক্ষ্য করল, তার কথায় ছোটকাকার মুখে খুশির ছোঁয়া লাগল।
”কণা, তাহলে তুই তাড়াতাড়ি খেয়ে নে, অনেকটা তো যেতে হবে…ট্রেন, বাস আবার ট্রেন, সময় লাগবে।” তুষার ধীরে ধীরে বলল অসুস্থের মতো। কণার মনে হল বাবা যেন হঠাৎই বদলে গেল। শরীর সম্পর্কে কোনোরকম অভিযোগ গত চব্বিশ ঘণ্টায় সে শোনেনি আর এই মুহূর্তে কী এমন ঘটল?
”এখনি খাবে কি, সবে তো সন্ধে হল!” ছোটকাকি অনুচ্চচ স্বরে বললেন।
”রাতের খাওয়া আমরা সাতটা-আটটার মধ্যেই সেরেনি।” কণা খুব সহজেই মিথ্যাটা বলল। ”আমরা উঠিও খুব ভোরে।”
”তাহলে ময়দাটা মেখে ফেল বউমা। হ্যাঁরে তুষু একটুও কিছু কি খাবি না?”
তুষার মাথা নাড়ল। কণার মনে হচ্ছে, বাবা সত্যিই অসুস্থ। পীড়াপীড়িতেও সে কিছু খেতে রাজি হল না। কণার খিদে নেই তবু সে জোর করেই খেল। কাকার ছেলেদুটিকে একবার সে দেখল রান্নাঘরে ঢুকে কিছু একটা মুখে পুরে বেরিয়ে গেল। জ্যাঠাদের সম্পর্কে বিন্দুমাত্র আগ্রহও নেই। কণার মনে হল, কয়েক বছর পর দেখা হলে ওরা তাকে চিনতে পারবে না।
ঠাকুমা রাস্তায় দাঁড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে উঠলেন। ”আর কবে দেখা হবে…তুই এসে এক আধবার দেখে যাস আমায়। আমি তো আর কারুর কোনো দরকারে লাগি না, এখন বোঝা হয়ে গেছি।”
”আসব, নিশ্চয় আসব।” কণার চোখেও জল এসে গেছে। পঞ্চাশ বছর আগে তরুণী বিধবা তিনটি ছেলেকে নিয়ে লড়াইয়ে নেমেছিলেন। আজ তিনি বলছেন, কারুর কোনো দরকারে লাগি না। আঁচল দিয়ে চোখ মুছছেন। কণা রাস্তার আলোয় হাতটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অবাক হয়ে গেল। ঠিক এই এইরকম একটা শুকনো, চামড়া-কোঁচকানো হাত সে যেন কোথায় দেখেছে?
”আমি আসব।” কণা হৃদয়ের গভীর থেকে বলল।
আট
কণার কাছে তুষার কৃতজ্ঞ হয়ে রইল হিন্দমোটর স্টেশনে ট্রেন থেকে নামা পর্যন্ত। পথে সে একবারও জিজ্ঞাসা করেনি হঠাৎ কেন তার শরীর খারাপ হল, কী এমন হল যে একটা মিষ্টিও মুখে দিতে পারলে না? তখন পেটটা এমনই ঘুলিয়ে ওঠে যে একগ্লাস জল খেতেও সে ভয় পেয়েছিল। বমি করে ফেলবে মনে হচ্ছিল। শরীরের এই ভাবটা আস্তে আস্তে থিতিয়ে স্বাভাবিক হয়ে আসে শেয়ালদা স্টেশনে নেমে। কিন্তু তারপরই শুরু হয় মানসিক অস্থিরতা। এখন থেকেই সে তীক্ষ্ন একটা যন্ত্রণা মাথার মধ্যে অনুভব করে চলেছে। এটাকে উপড়ে ফেলার জন্য সে এখন কথা বলতে চায়। কণা একটা নীরবতাকে অদ্ভুত ধৈর্যে এতক্ষণ ধরে আঁকড়ে রয়েছে। কেন? ও বুদ্ধি ধরে, নিশ্চয় বুঝেছে বাবার শরীর খারাপ হয়নি।
”মা এমন একটা কথা তখন বলল…” তুষার হাঁটতে হাঁটতে পাশে তাকাল। মুখ নিচু করে কণা পা ফেলছে। রাস্তাটায় গর্ত রয়েছে, একবার পা মচকে দু’দিন সে বাড়িতে বন্দি ছিল।
”আমার জন্ম সালটা এতবছরে একবারও মনে পড়েনি। অদ্ভুত ব্যাপার নয় কি? রবীন্দ্রনাথ কি নেতাজীরটা কিন্তু মনে আছে!”
”ওঁদের জন্মদিন বছর বছর পালন করা হয় বলেই।”
”জন্মদিন পালনের অভ্যাসটা আমাদের নেই, থাকলে ধরে ফেলতে পারতাম।” তুষার নির্জন রাস্তায় নিজেদের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। বাড়িগুলোর দরজা-জানলা বন্ধ। বেল বাজিয়ে একটা সাইকেল-রিকশা তাদের কাটিয়ে এগিয়ে গেল। চাপ ধোঁয়াশার মধ্যে রিকশাটা ঢুকে যাবার পর সে আর একবার বলল, ”জন্মদিন পালন করলে মনে থাকত আমার ঠিক বয়সটা কত।”
”হঠাৎ এসব কথা তোমার মনে পড়ল কেন?”
”অফিসে স্পোর্টসে পঞ্চাশ বছরের নিচের গ্রুপে দৌড়েছি।”
”কবে?”
”কাল।”
”সে কি, জানি না তো!…বলোনি তো!…প্রাইজ পেয়েছ কিছু?”
তুষার কথাগুলোকে অগ্রাহ্য করে দমবন্ধ হওয়া স্বরে দ্রুত বলল, ”আমার আসল বয়সের থেকে আড়াই বছর কম ধরে আমি সুযোগটা নিয়ে যাচ্ছি এতদিন। ব্যাপারটা অফিসিয়ালিই হচ্ছে কেননা ম্যাট্রিক সার্টিফিকেটে তাই লেখা, অফিসের সার্ভিস বুকেও তাই লেখা! আশ্চর্য! আমি এতকাল জানতামই না, খেয়ালই করিনি!”
”এইজন্য তোমার শরীর খারাপ…মন খারাপ হল? কম বয়সিদের গ্রুপে দৌড়েছ, এটা তো কৃতিত্বেরই!”
কী একটা বলতে গিয়ে তুষার প্রাণপণে নিজেকে সংযত করল। মনে মনে শুধু বলল, আর একটা কারণও আছে, বড় ভয়ঙ্কর সেটা।
