কণা নড়ে উঠল, পারিবারিক কথাবার্তা তার ভালো লাগে না, এড়িয়ে চলে। তাছাড়া বাড়িতেও কখনো তার সামনে আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে বাবা-মা কথা বলে না।
”এসব ব্যাপারে আমি মাথা ঘামাই না।” যতটা সম্ভব নরম স্বরে কণা বলল। বাইরে কাকা, ঠাকুমার সঙ্গে বাবা কথা বলছে। টুকরো যা কানে আসছে তাতে মনে হল ছেলেদের ছোটবেলার গল্প ঠাকুমা করছেন।
”তোমাদের বাড়িতে ঘর কটা? টি ভি আছে?”
”দু’খানা ঘর, না টিভি নেই।” কণা ঠিক করে ফেলেছে ছোট কাকিকে তৃপ্ত করবে।
”তপু বলেছে কিনবে, আগে কালার টিভি কিনবে, তারপর ফ্রিজ, তারপর সোফা-টোফা। লোকজন আসে তো! তোমাদের ফ্রিজ আছে?”
”নেই।”
”তোমরা দু’বেলাই মাছ খাও?”
”না, একবেলা।”
”তপু হপ্তায় একদিন মাংস আনে। খরচের হাত বড্ড! তোমাদের বাসন মাজার লোক আছে?”
”না, আমি আর মা মাজি, ঘর মোছাটোছাও আমরাই করি। বাবা বাজার করেন।”
”তোমার মা’তো হেডমাস্টার, ভালো মাইনেই তো তাহলে পায়, তবে লোক রাখে না কেন? মেয়ের বিয়ের জন্য পয়সা জমাচ্ছে?….এটা অবশ্য ভালো। লোকজন রাখা আমিও পছন্দ করি না। তোমার মামার বাড়ি তো বেশ পয়সাওলা, পুজোয় মামা কি দিল? মা’কে এখনো দেয় টেয়?”
”মামা একশো টাকা দিয়ে বলেছেন, পছন্দ মতো কিনে নিস।’
”মোটে একশো! তপু আমাকে ফরেন জাপানি সিল্কের শাড়ি কিনে দিয়েছে। শিলিগুড়ি খেলতে গিয়ে কিনে এনেছিল। ভাইয়েদের একটা করে প্যান্ট, বাবাকে গরদের পাঞ্জাবি।”
ঘরে ঢুকলেন ছোটকাকা।
”একটু চা করে দাও। ওরা কখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছে খিদেও তো পেয়েছে। শীতকালের বেলা, এই দেখ সন্ধে হয়ে এল।”
সন্দেশের বাক্সটা তুলে নিয়ে ছোটকাকি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। কণা গ্রিল ঘেরা বাইরের দাওয়ায় এল।
”আয় দিদিভাই, ছেলের সঙ্গে শুধু গপ্পোই করছি। নাতনিকে কীরকম ভুলে গেছি দেখেছিস।”
ঠাকুমা মেঝেয় বসে, ছোটকাকা একটা মোড়া এনে নিজে তাতে বসে খালি চেয়ারটা কণার দিকে ঠেলে দিলেন।
”এই যা দেখে গেলি আমায়, পরের বার এসে আর দেখতে পাবি না। কম কষ্ট করেছি সারা জীবন, এবার শ্রীধরজীর ডাকের জন্য অপেক্ষা করছি।”
”কি আর এমন বয়স আপনার, খুব ভালোই তো স্বাস্থ্য রয়েছে।” কণা যতটা সম্ভব গলায় সজীবতা আনার চেষ্টা করল।
”অসুখে অসুখে ভেতরে আর কিছু নেই রে। তোর ঠাকুরদা বলতেন, মনের শান্তি, সংসারের শান্তি, দুনিয়ার শান্তি সব ঠিক থাকবে যদি শরীরে রোগ-ভোগ না থাকে। তা উনি যদ্দিন ছিলেন আমার কি তোর বাবার কোনোদিন অসুখ করেনি, তুহিনেরও না। তরুণকে তো চোখে দেখারই সুযোগ পেলেন না।”
”কেন?”
”ও তো তখন পেটে যখন উনি মারা গেলেন! তোর বাবা তখন একবছর পাঁচমাসের, ওর থেকে তুহিন এগারো মাসের ছোট। আর এই ছোটকাকা দু মাসের পেটে। এই তিনটে নাবালক নিয়ে অল্পবয়সি বিধবাকে কী কষ্ট করে যে চলতে হয়েছে, আজ তাই ভাবি আর ভগবানকে বলি মুখ তুমি রেখেছ আর প্রণাম জানাই। তবে মানুষ তো করে তুলেছি।” বৃদ্ধার মুখ চাপা গর্বে ভরে উঠল।
”ঠাকুরদা কতদিন মারা গেছেন?”
”এই তো আজ পঞ্চাশ বছর হল। তোর বাবার এখন একান্ন বছর পাঁচ মাস।”
”বাবার একান্ন হয়ে গেছে!” কণা বিস্মিত ভঙ্গিতে তাকালো তুষারের দিকে। চোখেমুখে তারিফ। ভাবখানা, এত বয়স কিন্তু বোঝা যায় না। ”অফিসের স্পোর্টসে, জানেন ঠাকুমা, বাবা প্রতিবারই ছোটে আর ফার্স্ট হয়। এবারও হবে, তাই তো?”
কণা জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। সে কিন্তু জানে গতকালই স্পোর্টস হয়ে গেছে। কয়েকদিন আগে যখন সে বিকেলে দোতলায় কাকিমাকে সিটিং দেবার জন্য অনুরোধ করছিল তখন হিমু তাকে জানিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু স্পোর্টসে বাবা কোনো প্রাইজ পেয়েছে কিনা সেটা এখনো জানে না।
”বড়দাকে লাস্ট যা দেখেছি, সেই একই রকম রয়ে গেছে।”
”ওকে ছোট থেকেই বয়সের তুলনায় কমবয়সি দেখায়। ছোট মেসোমশাই স্কুলে ভর্তি করাতে নিয়ে গেছলেন তখন ওর বয়স দশটশের মতো। মাস্টারমশাই তো ওকে দেখে বললেন, দশ হতেই পারে না, সাত-আট হবে। তাই শুনে ছোট মেসোমশায়ের মাথায় চট করে বুদ্ধি খেলে গেল, তিনি ওর বয়স আড়াই বছর কমিয়ে ভর্তি করালেন।”
”সে কি?”
কণা এবং তরুণ একসঙ্গে তাকাল তুষারের দিকে। অস্বাভাবিক শুধু কণ্ঠস্বরই নয়, বসার ভঙ্গিটাও। গলা টিপে ধরলে বাতাস টানার জন্য হেঁচকি তোলার মতো শব্দ করে তুষার দুহাতে চেয়ারের হাতল আঁকড়ে সামনে ঝুঁকে পড়েছে। ঠাকুমা সেটা লক্ষ্য করলেন না।
”ছোট মেসোমশাই তো বাড়ি ফিরে বললেন, ‘পরে বুঝবি, তোর ছেলে আমাকে অনেক ধন্যবাদ দেবে আমার দূরদৃষ্টির জন্য। গরমেন্টের চাকরিবাকরি পেতে কমবয়স দেখবি কি সাহায্য করবে! বয়স কম থাকলে অনেকদিন চাকরিও করতে পারবে।’ আমি অবশ্য এসব অতশত বুঝি না। হ্যাঁরে, তুষু, ছোট মেসোমশাই ঠিক বলেছিল তো?”
বৃদ্ধা মুখ তুলে ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসছেন। কণার মনে হল এই মুখের সঙ্গে সেদিন স্কুল বাসে দুটি বাচ্চচাকে জড়িয়ে ধরা ছেলেটির মুখ কোথায় যেন এক হয়ে যাচ্ছে। দুটিতেই ভয়ঙ্কর সারল্য যা একমাত্র প্রকৃতির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। সে হিমুর চোখেও কি বিপর্যয়ের আভাস দেখেছে?
”তুহিন, তরুণ এদেরও কি বয়স কমানো হয়েছে?” তুষার নিচু গলায় বলল।
”তা জানি না। বৃদ্ধা মাথা নাড়লেন।
