মিনিট কুড়ি সময় লাগল বেলঘরিয়া পৌঁছতে। তুষার একটা মিষ্টির দোকান থেকে পনেরো টাকার সন্দেশ কিনল, কণাকে দশ টাকা দিল। সে তিনটে চকোলেট বার কিনে নিল।
সাইকেল রিকশায় বারো মিনিট লাগল। বাস রাস্তা থেকে ডান দিকে নেমে কাঁচা পথ। একতলা ছোট ছোট বাড়ি। অঞ্চলটি বছর তিরিশের কিন্তু বাড়িগুলির চেহারায় মনে হবে ষাট-সত্তর বছরের। অনেকগুলিরই প্লাস্টার নেই। বোধহয় অর্থাভাবে কিংবা বাহুল্য মনে করে বাড়িগুলোকে সুশ্রী করার কাজ সম্পূর্ণ করা হয়নি।
বাড়ি বিক্রির টাকা সমান তিনভাগে ভাগ করা হয়। তরুণ সেই টাকায় তিনকাঠা জমি কিনে একখানা ঘর তুলে বউ, কোলের বাচ্চচা আর মাকে নিয়ে এখানে চলে আসে। কণা তার এক বছর পর জন্মায়। তরুণের এখন তিনটি ছেলে। ঘর বাড়িয়েছে দুটি। রান্না ঘর ও কলঘরের ছাদ পাকা করেছে। কারখানায় সে ইউনিয়নের নিচের সারির নেতা। বড় ছেলেটি পড়া ছেড়ে দিয়েছে ফুটবলের জন্য। দু’বছর ধরে এরিয়ান্সে খেলছে। তুষার দু’তিনবার কাগজে তপেন সেনগুপ্ত নামটা দেখেছে। অফিসে রবি তাকে বলেছিল, ‘আপনার ভাই’পো, গেঁজে যদি না যায়, ইন্ডিয়া খেলবে। ইস্টবেঙ্গল ওকে টার্গেট করেছে, সামনের বছর তুলে নেবে। পঞ্চাশ হাজার দর ইজি পাবে।’ শুনে সে আত্মপ্রসাদ অনুভব করেছিল। শেষবার মাকে প্রণাম করতে এসে তপেনকে দেখতে পায়নি। তরুণের আর দুটি ছেলে স্কুলে পড়ে।
বাইরের দাওয়ার একদিক গ্রিল দেওয়া এবং সেটাই এখন বসার জন্য ব্যবহৃত। একধারে পুরনো একটা সাইকেল। দুটো নতুন বেতের চেয়ার ছাড়া আর কোনো আসবাব নেই। তরুণের হাতে স্লিংয়ে ঝোলানো। লুঙ্গি আর সবুজ খদ্দরের পাঞ্জাবি, পায়ে হাওয়াই চটি। সে ওদের দেখে এগিয়ে এল।
”হাত কেমন আছে?”
”ভালো। অল্পের ওপর দিয়ে গেছে।”
”সাইকেলটা এবার ছাড়। রাস্তায় যা দেখলাম, না চালানোই ভালো। নিয়ম মেনে কিছুই চলে না।”
কণা প্রণাম করল, তরুণকে।
”এত বড় হয়ে গেছে! শেষ দেখেছি যখন…এসো ভেতরে এসো।”
তুষার সন্দেশের বাক্স মার হাতে দিল। ছোটখাট শীর্ণ দেহ। এখনো কাঁচা রয়েছে অনেক চুল। খোঁপাটা গত দশ বছর একই নুনের পুটলির আকারেই রয়ে গেছে। পরিষ্কার থান পরনে। কণাকে দেখে তিনি তো অভিভূত। বংশে এখন সেই একমাত্র মেয়ে। তুষারের সেজ ভাই তুহিনের একটিই ছেলে।
কণার দুই গালে, চুলে, পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে তিনি বললেন, ”কি লক্ষ্মীমন্ত মেয়েগো!…বিয়ের সম্বন্ধ করছিস?”
‘এখনই কি, আগে পড়া শেষ করুক।” তুষার প্রসঙ্গটা এড়াবার জন্য সঙ্গে সঙ্গে বলল, ”এ দুটি কে, তরুণ তোর ছেলে?’
”হ্যাঁ, জ্যাঠাকে প্রণাম করো, আর এ হল তোমাদের দিদি।”
কণা রিকশা থেকে নামার সময় একটু দূরে দু’জনকে রাস্তায় দেখেছে আরও তিনটি ছেলের সঙ্গে চেঁচিয়ে তর্কে ব্যস্ত ছিল। দু’একটা কথা শুনে মনে হয়, বিষয়টা ক্রিকেট। ওরা তাকেও প্রণাম করতে যাচ্ছিল, সে ঝুঁকে হাত চেপে ধরল। জীবনে সে কারুর প্রণাম এখনো পায়নি, লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে সে চকোলেট বার দুটি তাড়াতাড়ি দু’জনের দিকে এগিয়ে ধরল।
”নাও মিষ্টিমুখ করো।”
সামান্য ইতঃস্তত করেই দু’জনে দুটো নিয়ে নিল এবং মিনিট খানেকের মধ্যেই মোড়ক ছিঁড়তে ছিঁড়তে তারা মিলিয়ে গেল। ঠাকুরমাকে আর দেওয়া হল না, এই খেদটা তার মনকে কিছুক্ষণ ধরে রাখল।
”আর তো আমাদের মনেই পড়ে না, গরিব কাকিমা মরল কি রইল কি তো বয়েই গেল।”
ঠিক এইভাবে যে শুরু হবে, কণার তা ধারণায় ছিল না। সে অপ্রতিভ হয়ে গেল। রুগণ, ফ্যাকাসে এবং লম্বা এই ছোট কাকি যে একদা সুন্দরী ছিলেন সেটা মুখের ধ্বংসাবশেষ থেকে অনুমান করে নেওয়া যায়। অভাবের সঙ্গে ঘর করার চিহ্ন ওর ঔজ্জ্বল্য ও পুষ্টি হারানো চুলে, চামড়ায়, নখে বা বাহুতে ছড়িয়ে আছে। দ্রুত কথা বলেন কর্কশ স্বরে।
”মা কেমন আছেন? তার সঙ্গে আমার এত বছরে একবারও দেখা হল না।” ছোট কাকি খুব সাধারণভাবে কথাটা বললেন। কণার তখন ইচ্ছে করল, বাইরে বাবার কাছে গিয়ে বসতে।
হাতলওলা চেয়ারে, হাতে বোনা পশমের আসনে ঠাকুরদার প্রায় একহাত লম্বা ফোটো দাঁড় করানো। তাতে একটা গোড়ের মালা। একটু আগে দুটো ধূপ জ্বেলে দেওয়া হয়েছে। টাকমাথা, সোজা প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে। মোটামুটি সুশ্রী। মুখের গড়নটা, কণার মনে হল, দুই ছেলেই পেয়েছে, কম বয়সেই মারা গেছেন।
”বছরে একবারই ছবিতে মালা দেওয়া!”
ছোট কাকির কথায় বিরক্তির থেকে তাচ্ছিল্যই যেন বেশি। কণা অল্পস্বল্প শুনেছে, দীর্ঘকাল বাপের বাড়িতে থেকে, অনাদর অবহেলা পেয়ে একটু অন্যরকম হয়ে গেছেন। শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে সহ্য করতে পারেন না।
”তুমি এখন কী পড়ছ?”
”আর্ট কলেজে ছবি আঁকা শিখছি।”
”শিখে কী হবে, মেয়েদের কোন কম্মে লাগবে? সেই তো হাঁড়ি ঠেলতে হবে! অবিশ্যি তোমাদের পয়সা আছে, বাপ-মায়ের এক মেয়ে, খরচপাতি করে বিয়ে দেবে। ডাক্তার এঞ্জিনিয়ার ছেলে পেয়ে যাবে।”
কণা আর কী উত্তর দেবে! চুপ করে রইল।
”তপু, আমার বড় ছেলে, তোমার থেকে একটু বড়, ফুটবল খেলে, এখন খুব নাম করেছে। বেলঘরিয়ার সবাই চেনে। রোজ কত লোক যে আসে, এখানে খেলা ওখানে খেলা তো রোজ লেগেই আছে। আজও গেছে খেলতে…তোমরা ঠাকুমাকে নিজের কাছে নিয়ে গিয়ে রাখ না কেন?”
