বোধহয় আধ মিনিট। তুষারের কাছে সেটা তার সমগ্র জীবনের পরিধি কালের মতো। একদম শূন্য হয়ে গেছে তার চেতনা। শুধু একটা শারীরিক দপদপানি এখন তাকে জানান দিচ্ছে সে বেঁচে আছে।
দুই তালু ভেদ করে বিরাট হর্ষধ্বনি তার কানে ঢোকা মাত্রই মাথা নেড়ে তুষার যন্ত্রণা-কাতর স্বরে বলল, ”হায় ভগবান।” চোখ খুলে সে ধীরে ধীরে ঘুরে দেখল চিন্ময়ী চেয়ারে বসে। হিমু ছুটে যাচ্ছে। মুখ কালো করে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে গেল অশেষের বউ। চিন্ময়ীকে ট্রেনে তুলে দিতে গিয়ে হঠাৎই ট্রেনে উঠে পড়ার মতো তুষার হঠাৎই কাজটা করে ফেলল। ছুটে গিয়ে সে দু’হাতে চিন্ময়ীকে তুলে বনবনিয়ে চার পাক ঘুরে নামিয়ে দিল। তাই দেখে হইহই উঠল, হাততালি পড়ল।
”আমি ভেবেছিলাম তুমি পারবে না, বিলিভ মি!”
লজ্জিত চিন্ময়ী মুখ নিচু করে, সামিয়ানার দিকে এগিয়ে যাওয়া ভিড়ের সঙ্গে চলতে চলতে বলল, ”তোমার কি কাণ্ডজ্ঞান নেই? এত লোকের মাঝে…”
”কে পরোয়া করে লোককে?” বুকটা ঠেলে চিতিয়ে দিয়ে তুষার বীরপুরুষ সেজে দু’পাশে দেহটা ঘোরালো।
অনির্বাণ খুব ব্যস্ত কিন্তু তা সত্ত্বেও মুচকি হেসে বলল, ”দাদার দেখছি আজ বয়সটা পঁচিশ বছর কমে গেছে!”
প্রৌঢ় একজন তুষারের পিঠ চাপড়ে মৃদু অনুযোগ করলেন, ”বউ-তো আমাদেরও আছে, তাই বলে এত লোকের মাঝে কি ওভাবে পাঁজাকোলা করে ঘোরাব? হল কী তোমার?”
কী হয়েছে সেটা তুষার বুঝতে পারছে না। অনেক দিনের অনেক না করতে পারা কাজ, নিজেকে বিকশিত হতে দেখার ইচ্ছা, কুঁকড়ে থাকা ব্যক্তিত্ব, সব যেন নিমেষে পূর্ণতা পেয়ে যাচ্ছে। অনুভব করছে অফুরন্ত একটা উদ্যম তার কোষগুলোকে ফুলিয়ে তুলেছে যার ফলে সে চিন্তাহীন, ভারবিহীন একটা মাথা নিয়ে উত্ত্যক্ত অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে।
”বাবা তুমি দেখেছিলে মা কীরকম লাফ দিয়ে চেয়ারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল! আর একটু হলেই চেয়ার থেকে কিন্তু পড়ে যাচ্ছিল, দেখেছিলে?”
”না দেখিনি, বাড়ি গিয়ে আমাকে করে দেখাবে।”
বাচ্চচাদের পুরস্কারগুলো আগে দেওয়া হল। পরাজিতরাও সান্ত্বনা হিসাবে পেল এক প্যাকেট বেলুন আর রং পেন্সিলের বাক্স। হাতে নিয়ে হিমঘ্ন সেনগুপ্ত অসম্ভব খুশি। তার জীবনের প্রথম পাওয়া পুরস্কার আঁকড়ে সে ছুটে এসে মায়ের কোলে মুখ লুকোল। তুষার পেল ব্যাটারিচালিত দেয়াল ঘড়ি। ডিম্বাকৃতি শাদা প্লাসিক কেস, সোনালি ধাতুর পাড় দেওয়া, কাঁটাগুলি রুপোলি। কালো ডায়াল। তার মনে হল শ’দুয়েক টাকা হবে!
”বাবা এটা আমাদের ঘরে থাকবে?”
”হ্যাঁ’, বলেই তুষারের মনে পড়ল, প্রতিবার সে প্রাইজ কণার হাতে তুলে দিয়েছে। এবার আর দেওয়া হবে না।
একটা বিরাট উল্লাস জমা ছিল মিউজিক্যাল চেয়ারের বিজয়িনীর জন্য। ছবি তুলছিল একজন, সে তুষারকে টেনে আনল, পাশাপাশি দু’জনকে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলবে বলে। স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে নাকি কখনো এই অফিসের স্পোর্টসে ফার্স্ট হয়নি!
কাঁধে ঝোলাবার ফোমের ঘিয়ে রঙের ব্যাগটা নেবার সময় চিন্ময়ীর মুখ লজ্জায় নিচু হয়ে ছিল। মুখ নিচু করে রইল ছবি তোলার সময়ও। একটা জেদের বশে নেমে পড়ে হঠাৎ সফল হয়ে যাওয়ার ধাক্কাটা এইবার সে পাচ্ছে।
”প্রাইজ দুটো কাজে দেবে।” ফেরার সময় হাঁটতে হাঁটতে তুষার মন্তব্য করল। রাস্তার দিকে না গিয়ে ওরা গড়ের মাঠের ভিতরের দিকে যাচ্ছে।
”আমারটা কাজে দেবে না?”
”সব থেকে বেশি দেবে। অত বেলুন ফোলাতে ফোলাতে ফুসফুসের যা এক্সারসাইজ হবে না!…এখন আমরা একটু বেড়িয়ে নিয়ে তারপর কোথায় যাব হিমু?”
”বাড়ি?”
”চাইনিজ খেতে।” চিন্ময়ী বলে ফেলল গম্ভীর স্বরে নিশ্চিত ভঙ্গিতে। ”আমি টাকা দেব।”
”খুব উৎফুল্ল মনে হচ্ছে যেন।”
”হিমুর জন্য। অন্যায় কম্পিটিশনে ও হেরেছে, আমি তার শোধ নিতে চেয়েছিলাম। টেরিয়ে বেঁকিয়ে অনেক কথাই শুনিয়েছিল…হিমুর মুখ ছাড়া আর কিছু তখন আমার চোখের সামনে ছিল না।”
সাত
কণার মুখের দিকে তাকিয়েই তুষার চোখ সরিয়ে নিল। ”হ্যাঁ, ঘড়ি একটা কেনা দরকার।” প্রায় স্বগত স্বরে সে বলল।
”কিনতে হবে কেন, সারিয়ে নেওয়া যায় তো! অনেকদিন অয়েল করা হয়নি।”
”শেয়ালদা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে ওরা কথা বলছে। ট্রেন নেই। যদিও ট্রেন ছাড়ার সময় পার হয়ে গেছে। প্ল্যাটফর্মের বড় দুটো ঘড়ি দেখে কণার মনে পড়ে গেছে, বাড়ির দেয়াল ঘড়িটা মাঝে মাঝেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাই বলেছিল, ”বড্ড পুরনো হয়ে গেছে, ওটাকে দোকানে পাঠানো দরকার। কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে।”
প্রাইজ এবার আর বাড়িতে আনা হয়নি। তুষারের মনের মধ্যে খচখচ করছে। চায়ের স্টলে গিয়ে সে দু’কাপ দিতে বলল। দু’জনে সবে খাওয়া শেষ করেছে তখন একটা ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকল। ছুটির দিন হলেও ভিড় রয়েছে, ওরা জানলার ধারে বসার জায়গা পেল না।
”বেশিক্ষনের পথ নয়, আমাদের হিন্দমোটরের মতই ডিসট্যান্স। যতদূর মনে পড়ছে একই সময় লাগে।”
”কিছু একটা কিনে নিয়ে গেলে ভালো হয়। তুমি তো তবু বছরে বছরে যাও, আমি তো পাঁচ-ছ বছর পর যাচ্ছি।”
”নেমে সন্দেশ কিনে নেব। তুই বরং তরুণের ছোট ছেলের জন্য একটা কিছু কিনে নিস।”
”চকোলেট পেলে কিনব, ঠাকুরমার জন্যও।”
”এই বয়সে!” তুষার হেসে ফেলল।
