তুষারের কথামতই হল। চিন্ময়ী চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায় যখন তুষার দ্বিতীয় জনকে অন্তত সাত-আট গজ পিছনে ফেলে ফিতে ছেঁড়ে। অভিনন্দন বাক্য ও পিঠে কয়েকটা চাপড় নিয়ে সে ফিরে এল হাঁফাতে হাঁফাতে।
”ছেলের হারের শোধ নেওয়া হল তো? এর মধ্যে বয়স ভাঁড়ানো টাড়ানো নেই, ক্লিন অ্যান্ড অনেস্ট ব্যাপার।”
”আর তো কিছু তোমার করার নেই, তাহলে প্যান্টটা পরে নাও, হাসি পায় বুড়োদের হাফ প্যান্ট পরা দেখলে।”
খাবারের প্যাকেট বিলি করা হচ্ছে। তুষার প্যাকেট আনল।
”বাবা খাব?”
”না এখানে নয়, বাড়ি গিয়ে।” চিন্ময়ী প্যাকেট তিনটি ব্যাগে ভরল।
”বাবা তুমি বলেছিলে একদিন চাইনিজ খাওয়াবে।”
”কবে বলেছি?” তুষার না জানার ভান করল। হিমুকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি সে কখনো ভোলে না।
”বারে, ভুলে গেলে! মা, তুমি বললে না আজ বাবাকে মনে করিয়ে দিতে।”
”আমি আবার কখন বললুম।” অপ্রতিভ মুখটা ঘুরিয়ে চিন্ময়ী দেখল মিউজিক্যাল চেয়ারের জন্য বউয়েরা কোমরের শাড়ি গোছাচ্ছে।
”নামবে তো চলে যাও।” তুষার পিঠে ঠেলা দিল।
”নাহ।”
”না কেন, ভালো প্রাইজ আছে।”
”নাম দেওয়া নেই এখন আমায় নামতে দেবে কেন?” চিন্ময়ীর স্বর অনিশ্চিত কিন্তু প্রায় রাজি।
”এখানে আজ যারা হাজির হয় তাদের নিয়েই এটা করা হয়, সে জন্য আগে নাম দেবার দরকার হয় না। আমি তোমার নামটা বলে আসছি।” তুষার নাম নেওয়ার লোককে খুঁজতে গেল। একটু পরেই দশটি চেয়ারকে ঘিরে এগারোজন দৌড়বে, আসল জোরে হাঁটা শুরু করল, লাউডস্পিকারের রেকর্ডে বাজছে জ্যাজের সুর। হঠাৎ রেকর্ড বন্ধ হতেই হুড়োহুড়ি চেয়ারে বসার জন্য। একজন বসতে পারল না। একটা চেয়ার কমিয়ে দেওয়া হল। চিন্ময়ী দশজনের মধ্যে রয়েছে।
”চেয়ার থেকে আরও দূর দিয়ে ঘোরা উচিত, এত কাছে কাছে থাকলে তো ব্যাপারটা জমে না। অ্যানাউন্স করে এটা ওদের জানিয়ে দিল।”
”জানালেও কিছু হবে না। সব জায়গাতেই এই হয়, চেয়ারের কাছাকাছি দৌড়ের নামে হাঁটবে আর ধাক্কাধাক্কি করবে। মেয়ে-ছেলেদের কাণ্ড তো, যে করে হোক জিততে চায়।” খুবই সুচিন্তিত একটা মন্তব্য করতে পেরে লোকটি হাসল। তুষার পিছনেই দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছে চিন্ময়ীকে। শেষ তিনজনের মধ্যে ও আসতে পারবে বলে তার মনে হচ্ছে। অশেষ মুখুজ্জের বউ গত দু’বার জিতেছে এবারও সবাই ধরে নিয়েছে জিতবে।
রেকর্ড বন্ধ হল। প্রতিযোগিতাকে ঘিরে থাকা ছোকরা কর্মীদের জনতা হইহই করে উঠল। তার প্রধান কারণ, দু’জন বয়স্কা গৃহিণী চেয়ারে বসতে গিয়ে অন্যের পাছার ধাক্কায় মাটিতে গড়িয়ে পড়েছে।
”ফাউল ফাউল।…ডিসকোয়ালিফাই করুন…পুশ করেছে।”
”পুশ কি চার্জ করেছে বল..হিপ চার্জ!”
”হিপ হিপ হুররে?”
চিন্ময়ী ধাক্কা দেয়নি, তুষারের কাছে এটাই স্বস্তির। আদি রসে চোবান যা সব মন্তব্য অফিসেও এই নিয়ে হবে তা তো সে জানেই। হিমু ভিড়ের আগে দাঁড়িয়ে দু’হাত মুঠো করা, মুখটা লালচে, ঘন ঘন ঢোঁক গিলছে।
উত্তেজনাটা তুঙ্গে উঠল শেষ রাউন্ডে। চিন্ময়ী আর অশেষের বউ, চেয়ার মাত্র একটি। কি একটা আপত্তি তুলে চিন্ময়ী স্পোর্টসের এক কর্তাকে হাত দিয়ে জমিতে একটা বৃত্ত তৈরি করার জন্য বলছে। ছোকরারা হইহই করে উঠল। ”সার্কল করে দিন…দাগ কেটে গণ্ডি করে দিন, তার বাইরে দিয়ে, হাঁটা নয় দৌড়তে হবে।” কে একজন বলল, ”এটাতো আগেই করা উচিত ছিল, এখন তাহলে কেন? ফাইনালে নতুন নিয়ম চালু করা যায় না।”
কিছুক্ষণ তর্কাতর্কির পর ফিনান্সিয়াল কন্ট্রোলারের পরামর্শে শাদা রং করা কয়েকটা মাটির গ্লাস উল্টে বসিয়ে চেয়ারকে কেন্দ্র করে পাঁচ গজ ব্যাসার্ধের একটা বৃত্ত রচিত হল। ‘কাম অন চিনু, কাম অন,’ তুষার ফিস ফিস করল। হিমু হাত ঝাঁকিয়ে চিৎকার করছে। চিন্ময়ী হাত নেড়ে হিমুকে চুপ করতে বলল। দূর থেকে ওর চোখ আর চেপে বসা চৌকো চোয়ালের পেশী দেখতে দেখতে তুষারের মনে পড়ল, যখন সে বলেছিল, ‘চিনু এটা খুব কষ্টের জীবন হবে, পারবে? আমাদের সম্পর্কটা কিন্তু সবার কাছে প্রশ্ন হয়ে উঠবে।’
তখন চিনুর মুখটা এমন কঠিন হয়ে উঠেছিল। ওর মনের প্রকাশের ধরনটা কিন্তু এখনো বদলায়নি! কাঠিন্যটা ওকে আলাদা একটা রূপ দেয়। ‘বহু প্রশ্ন তো আমিও করতে পারি সবার কাছে।’ সে দিনের স্বরটা তুষার এত বছরেও দ্বিতীয়বার কখনো ওর মুখ থেকে আর শুনতে পায়নি। অমোঘ, চূড়ান্ত।
‘সকাল ন’টায় কোন্নগর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ভর্তি লোক, তিনটে ছেলে এসে একটি কলেজ ছাত্রকে ছোরার পর ছোরা মারতে লাগল। চেঁচাচ্ছিল ছেলেটি, বাঁচাও বাঁচাও। একটি লোকও এগোল না। তিনজন ধীরেসুস্থে চলে গেল লাসটা ফেলে রেখে। ট্রেন এল, সবাই ঝাঁপিয়ে ট্রেনে উঠে পড়ল, অফিসে লেট যেন না হয়! এরাই তো তোমার সবাই, এরাই তো প্রশ্ন করবে?’
চিনুর কথাগুলোয় ছিল রোমান্টিক যুক্তি কিন্তু সেদিন সে ওর কাছ থেকে যা জানতে চেয়েছিল তা পেয়ে গেছিল, তুচ্ছ করার মতো সাহস ওর চোয়ালে চেপে বসে ছিল। সেটাই আবার দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু এখানে কি চিনু কোনো কিছু তুচ্ছ করতে বদ্ধপরিকর?
হুইসল বাজছে। হঠাৎ একটা নৈঃশব্দ্য নেমে এল। রেকর্ডে জ্যাজ বেজে উঠল আর তুষার চোখ বন্ধ করে দু’হাতে কান ঢেকে ঘুরে দাঁড়াল।
