”তবু ভালো।”
কিন্তু চিন্ময়ীর ‘ভালো’ কিছুক্ষণের মধ্যেই ”এ অন্যায়, এগুলো দেখা উচিত” হয়ে গেল। বিস্কুট রেসের জন্য হিমু যখন জনা দশেকের সঙ্গে স্টার্টিং লাইনে তখন চিন্ময়ী উত্তেজনার বশে মাঠের কিনারে চলে এসেছে। লাইনে দাঁড়ানো প্রতিযোগিদের মধ্যে অন্তত ছয়জন হিমুর থেকে লম্বা। তখন সে তার পাশে দাঁড়ানো একটি বউকে বলে, ”এ অন্যায়, এগুলো দেখা উচিত। বয়স তো দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভাঁড়িয়েছে।”
”কে বয়স ভাঁড়িয়েছে?” বউটি চোখ সরু করে তীক্ষ্ন স্বরে বলল।
”ওই তো প্রথম মেয়েটি, তারপরের, তারপরের তিনজন বাদ দিয়ে তারপরেরটি…”
”আপনি কি জানেন কার কত বয়স, বলছেন যে? লম্বা হলেই বয়স বেশি আর খেঁকুরে হলেই কম বয়স?” কণ্ঠস্বরে ঝগড়ার জন্য আহ্বান। চিন্ময়ী মুখ কঠিন করে নিরুত্তর রইল। এর ছেলে বা মেয়ে নিশ্চয় ওই দশজনে আছে।
”বয়স কমিয়ে সুবিধে নেবার মতো ছোটলোক আমরা নই।”
চিন্ময়ী কথাটা শুনে পায়ে পায়ে সরে গেল।
একটা দড়িতে দশটা বিস্কুট সুতোয় ঝুলিয়ে দুটি লোক ধরে নাড়াচ্ছে। সুতোগুলোও ঠিক সমান মাপের নয়। কয়েকটা বিস্কুট বেশি ঝুলে রয়েছে। বিস্কুট কামড়ে সুতো ছিঁড়ে আরও কিছুটা দৌড়ে শেষ করতে হবে। চিন্ময়ীর নজর তৃতীয় বিস্কুটের উপর, ওটাই বেশি ঝুলে। হিমুর কি নজর পড়বে ওটায়? বুদ্ধি করে কি ওটাকেই চেষ্টা করবে? ওকে এটা জানিয়ে দিলে কেমন হয়! সে দ্রুত স্টার্টিং পয়েন্টে যাচ্ছে সেই সময়ই হুইশল বাজল।
”হিমু থার্ড বিস্কুটটা, হিমু থার্ডটার চেষ্টা…”।
ততক্ষণে চিন্ময়ীকে অতিক্রম করে সবাই বিস্কুটের কাছে পৌঁছে গেছে। হতাশ চোখে সে দেখল লাইনের সেই প্রথম মেয়েটিই ওই বিস্কুটাই কামড়াবার চেষ্টা করছে। লোক দুটি সজোরে দোলাচ্ছে দড়িটা। হিমু লাফাচ্ছে, ওর নাকে, গালে ঠোক্কর লাগছে বিস্কুটের। পারছে না। অসহায়ভাবে পাশের ছেলেটির দিকে একবার তাকিয়ে হিমু আবার চেষ্টা শুরু করল।
একটা হইহই উঠে জানিয়ে দিল বিস্কুট মুখে প্রতিযোগীরা সমাপ্তিতে পৌঁছচ্ছে। হিমু আর তারই উচ্চচতার একটি মেয়ে তখনো চেষ্টা করছে। তুষার প্রবল উৎসাহে দু’হাত মুঠো করে তখন মাঠের ভিতর থেকে চেঁচাচ্ছে, ”চেষ্টা করো হিমু, বাক আপ হিমু, আবার…পারতেই হবে, আর একবার…।” ছেলেমানুষের মতো সে লাফাচ্ছে।
হিমু পারল। কিন্তু তার আগে আটজন পৌঁছে গেছে। যারা দড়ি দোলাচ্ছিল, তারা নাড়ানো বন্ধ রেখে একটু নিচে করে ধরে ব্যাপারটা সহজ করে দেয়। সমাপ্তির কাছে তখন ভিড়, এলোমেলো পরিবেশ। বিস্কুট মুখে নিয়ে ছুটে গিয়ে, দ্বিধাগ্রস্ত হিমু দাঁড়িয়ে পড়ল ভিড় দেখে।
চিন্ময়ী ছুটে গেল। তুষার তখন হিমুকে কোলে তুলে তার দিকেই আসছে।
”প্রোটেস্ট করা উচিত, তোমার প্রোটেস্ট করা উচিত।” চিন্ময়ীর গলা কাঁপছে, চোখে জল আসার মতো অবস্থা। ”বয়স কমানো লম্বা লম্বা ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে ও পারবে কেন! এভাবে কম্পিটিশন করাটাই অনুচিত। সবাইকে সমান অ্যাডভান্টেজ দেওয়া দরকার। এটা তোমার ওদের বলা উচিত।”
”থাক না, যেতে দাও এসব।” হিমুর হাতে ধরা আধ খাওয়া বিস্কুটটা তুষার কপ করে কামড়ে ধরল। ভেঙে গিয়ে যেটুকু হাতে রইল হিমু তা এগিয়ে ধরল মায়ের দিকে। চিন্ময়ী দৃকপাত করল না।
”আর আমি ওকে এখানে নামতে দেব না, কিছুতেই না। হিমু কোল থেকে নামো, আমার সঙ্গে বসে থাকবে। এই সব দামড়াদের সঙ্গেই তো কম্পিটিশন করবে, সব কটায় ও হারবে।”
”হারুক না!”
”এভাবে হারা উচিত, না এভাবে জেতাও উচিত?
”সব সময় জিততে হবে এমন কোনো কথা আছে? শুরুতেই হারটা জেনে রাখলে জিতটা কি জিনিস সেটা যথার্থ বুঝতে পারবে। ওকে তুমি হারতে দাও।”
”তোমার হিতোপদেশ রাখ।”
”মা, আমি আর দৌড়ব না?”
”জানি না, বাবাকে জিজ্ঞেস কর।”
চিন্ময়ী হনহনিয়ে চেয়ারের দিকে চলে গেল। তুষার কোল থেকে হিমুকে নামিয়ে বলল, ”মা খুব রেগে গেছে।”
সেই সময় পিছনে নারীকণ্ঠে শুনল, ”নিজেরটি হারলেই অমনি সব জোচ্চচুরি। বার্থ সার্টিফিকেট দেখিয়ে নামতে হবে বলে দিলেই পারত, তাহলে সঙ্গে করে এনে দেখিয়ে দিতুম।”
”কেন কেউ কি কিছু বলেছে?” পুরুষ কণ্ঠ।
তুষার আড়চোখে দেখল জিএম-এর স্টেনো অশেষ মুখুজ্জে আর তার বউ।
মিনিট দশেক পর তুষারের ইভেন্ট। ট্রাউজার্সের ভিতর শর্টস পরে বাড়ি থেকে রোজকার মতো অফিসে যাবার সময়েই সে দেবাই পুকুর থেকে বেরিয়েছে। এখনো পর্যন্ত একবারও সে অফিসের স্পোর্টসে, শুভার তো কথাই ওঠে না, কণাকেও নিয়ে যায়নি। প্রাইজ হাতে বাড়ি ফিরে কণাকে গত বছরও অবাক করেছে, শুভার কোনো ভাবান্তর দেখেনি। কাল রাতে কণা খাপছাড়াভাবেই বলেছিল, ”তোমাদের অফিসের স্পোর্টস কবে, বাবা?”
”বলতে পারব না, কেন?”
”কিছু স্কেচ করব তাহলে।”
”হলে বলব।”
ট্রাউজার্স খুলে সে চিন্ময়ীর কোলের উপর সেটা রেখে বলল, ”তেলো হাঁড়ির মতো মুখ করে আর থাকতে হবে না।” তারপর হিমুকে উদ্দেশ্য করে বলল, ”আর ক’মিনিটের মধ্যেই একটা ম্যাজিক হবে।”
”ম্যাজিক?” হিমুর চোখ বড় হয়ে উঠল।
”তোমার মা’র মুখে হাসি ফুটবে।”
”কী করে?”
”আমি এবার দৌড়ব। ফার্স্ট হলেই দেখবে কী হয়!”
ঠোট টিপে দু’জনেই তাকিয়ে। যথেষ্ট চেষ্টা করেও চিন্ময়ী নিজের হাসি আটকাতে পারল না।
