”কি ব্যাপার?”
”বাবা স্পোর্টে দৌড়বে।”
”স্পোর্ট নয় স্পোর্টস বলবে।”
”ঘরের মধ্যে স্পোর্টস?” চিন্ময়ী বেরিয়ে গেল। উনুনে কড়া চাপিয়ে তেল দিয়ে এসেছে।
”তুমি প্রাইজ পাবে?”
তুষার দৌড় থামাল। এইটুকু পরিশ্রমেই সে হাঁফিয়ে পড়েছে, হাঁটু আর উঠছে না। হাঁটা আর দৌড়নোর অনেক তফাত।
”কী করে বলব। আগে তো দৌড়ই, তারপর প্রাইজ।”
”তুমি আমার সঙ্গে দৌড়বে?”
”নিশ্চয়।”
”কবে?”
”যেদিন বলবে।”
”কোথায় দৌড়বে?”
”যেখানে বলবে।”
হিমু চিন্তামগ্ন হল। তুষার ওর মুখের দিকে মজার দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
”আমাকে তোমাদের স্পোর্টে দৌড়তে দেবে?”
তুষারের খেয়াল হল, স্টাফেদের ছেলে-মেয়ের জন্যও কয়েকটা ইভেন্ট আছে, বৌয়েদের জন্য মিউজিক্যাল চেয়ার!
”দৌড়বে তুমি? তাহলে নাম দিয়ে দোব। কিন্তু আবার তুমি স্পোর্ট বললে।”
হিমুর হকচকিয়ে যাবার মতো অবস্থা তারপরই ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে চিৎকার করতে করতে গেল: ”মা মা, আমি স্পোর্টসে নামব…বাবার অফিসে, জানো মা… হ্যাঁ সত্যি, বাবাকে জিজ্ঞেস করো।”
আবার ছুটে ঘরে ঢুকল সে। ”কোথায় হবে স্পোর্টস?”
”গড়ের মাঠে।”
”কবে?”
”শনিবার, দুপুরে।”
হিমু আবার বেরিয়ে গেল খবরটা দোতলায় জেঠিমাকে দেবার জন্য। রুটি আর আলুভাজা নিয়ে চিন্ময়ী এল।
”সত্যি সত্যিই হিমু নামবে?”
”হ্যাঁ নামুক না। বাচ্চচাদের জন্যও তো আছে এমনকি বউয়েদের জন্যও মিউজিক্যাল চেয়ার।”
চিন্ময়ীর চোখ জ্বল জ্বল করে উঠলেও পরমুহূর্তেই স্তিমিত হল।
”নামবে?”
”ও তো বউয়েদের জন্য।”
”তাহলে নামটা দিয়ে দিচ্ছি।”
”না।”
ইচ্ছে করেই চিন্ময়ী ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। তুষার খাওয়ায় মন দিল।
”বাবা, এই দ্যাখো ছবি আঁকার পেন্সিল দিদি রেখে গেছে আমার জন্য।” হিমু একটা স্কেচ পেন্সিল হাতে ঢুকল।
”কে দিদি?” বলেই তুষারের মনে পড়ল সেদিন রাতে যে মেয়েটি এসে পালেদের ঘরে ছিল। ছবি আঁকে। ”কবে এসেছিল?”
”আজ বিকেলে। আমার ছবি আঁকছে তো। আচ্ছা বাবা, ফটোতে আমাকে যেরকম দেখায় সেরকম করে তো আঁকছে না?”
”তোমাকে চেনা যাচ্ছে?”
”হ্যাঁ। তবে মুখের এখানে দাগ ওখানে দাগ চুলটা কেমন এলোমেলো কম কম, আর চোখই আঁকেনি শুধু দুটো গত্তোর মতো হয়ে আছে।”
”পরে আঁকবে। কিন্তু পেন্সিলটা তুমি নিশ্চয় চেয়েছিলে।”
”মোটেই না, মোটেই না, দিদি নিজে থেকে দিয়েছে। আবার আসবে, আমার ছবিটা তো শেষ হয়নি। বলেছে চুপটি করে বসে থাকলে এবার বড়ো দুটো চকোলেট দেবে।”
”আজ একটা দিয়েছে?”
”হ্যাঁ।” বলেই হিমু থতমতো হল। ”আমি চাইনি কিন্তু। আচ্ছা বাবা দিদিকে বলব আমার স্পোর্ট দেখতে যাবার জন্য?”
”হ্যাঁ।”
”জ্যোঠিমাকে বলব?”
”হ্যাঁ। কিন্তু তুমি আবার স্পোর্ট বললে।”
রাতে খাওয়ার পর দালানে কণা টি ভি দেখছিল। তার পাশের চেয়ারে তুষার। গণতন্ত্র আর নির্বাচন নিয়ে চারটি লোক ইংরাজিতে কথা বলছে ক্লাসে ছাত্র পড়াবার মতো ভঙ্গিতে। শুভা ঘরের মধ্যে।
”বাবা বন্ধ করে দেব না দেখবে? আমি ওপরে যাব।”
টিভি-তে কথার শব্দ কাজে লাগিয়ে নিচু গলায় তুষার বলল, ”দোসরা রোববার তোর ঠাকুরদার বাৎসরিক। বেলঘরিয়ায় যাব, তুই যাবি আমার সঙ্গে? তোর ঠাকুমা তোকে দেখতে চেয়েছে।”
”রোববার কখন?”
”তিনটে, সাড়ে তিনটেয় বেরোব, ন’টার মধ্যেই ওখান থেকে বেরিয়ে পড়ব।”
কণা টিভি বন্ধ করে বলল, ”যাব।”
ছয়
শনিবার তারা তিনজন শহীদ মিনারে বাস থেকে নামল বেলা বারোটা নাগাদ। মিনিট পাঁচেক হেঁটে পৌঁছল নীলকাপড়ে সাদা অক্ষরে অফিসের রিক্রিয়েশন ক্লাবের নাম লেখা ব্যানার আঁটা সামিয়ানায়। আশেপাশে কয়েকটা মাঠে ক্রিকেট খেলা চলছে। লোকজন খুবই কম।
বাস থেকে নামার পরই মূর্তির, তাঁবুর, রাস্তার নাম জানতে চেয়ে হিমুর কৌতূহল ধারাবাহিক প্রশ্ন হয়ে তুষারকে ধৈর্য্যের পরীক্ষায় নামায়। উত্তর দিতে তার আরামই হচ্ছিল। চিন্ময়ীর প্রশান্ত নির্লিপ্ত কিন্তু সচেতন মুখ, প্রশ্নোত্তর শুনে যাচ্ছিল। রোদের তেজ খুবই মোলায়েম, শীত যতটা লাগবে ভেবেছিল ততটা নয়। তবু হিমুর গায়ে চিন্ময়ীর বোনা হাতকাটা গোল সোয়েটার। তার হাতের পলিথিন ব্যাগে আছে হিমুর কোট, নিজের কার্ডিগান, ওয়াটার বটল।
লম্বা একটি ছেলের সঙ্গে অফিসের এক প্রৌঢ় সহকর্মী তাদের আগে চলেছে। তুষার চেঁচিয়ে বলল, ”ছেলে কি স্পোর্টসে নামবে নাকি রাজেনবাবু?”
”হ্যাঁ।”
চিন্ময়ী অনুযোগের স্বরে তুষারকে বলল, ”অত বড় ছেলে নামলে হিমু পারবে কী করে?”
”জিজ্ঞেস করে দেখি ছোটদের জন্য বয়সের গ্রুপ ভাগ করা হয়েছে কিনা।” বিব্রত বোধ করছে তুষার। জীবনের প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হিমু যেন গৌরব পায়, মনেপ্রাণে সে এটাই চাইছে।
স্পোর্টস কিছু আগে শুরু হয়ে গেছে। দুটো টেবিল ভরে প্রাইজ। বিজয়ীদের হাতে ফিনান্সিয়াল কন্ট্রোলারের বউ সেগুলো তুলে দেবেন। একটা লম্বা সোফায় বুকে ব্যাজ আঁটা স্বামীর সঙ্গে তিনি বসে। মাইক্রোফোনে নানাবিধ ঘোষণা, অনুরোধ, নির্দেশ দেবার কাজে অনির্বাণ ব্যস্ত। সোফার পিছনে চেয়ারগুলোয় বসে কয়েকজন বউ আর প্রবীণ কিছু অফিসার। চিন্ময়ী সেখানেই বসল।
”খোঁজ নাও, হিমু কাদের সঙ্গে দৌড়বে।”
তুষার খোঁজ করতে গেল এবং কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলল, ”হ্যাঁ দুটো গ্রুপ করেছে। আট থেকে বারো আর বারো থেকে পনেরো, ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে কম্পিট করবে।”
