”কী প্রাইজ এবার তাহলে দেবে?” তুষারের বয়স কমিয়ে দেবার এটাও একটা উপলক্ষ্য।
”দোব দোব, এখন সেটা বলা যাবে না, তবে আগের থেকে যে ভালো হবে এটা বলতে পারি।” অনির্বাণ রহস্যটাকে গভীর করে তোলার জন্য নাটকীয়ভাবে প্রস্থান করল।
দুপুরে ডাকে আসা একটা খাম সে পেল। ঠিকানায় হাতের লেখা দেখেই বুঝল মা’র চিঠি। প্রতি মাসে মাইনে পেয়েই সে দু’শো টাকা বেলঘরিয়ায় মা’র নামে পাঠিয়ে দেয়। এই মাসেও পাঠিয়েছে, মানিঅর্ডার রসিদও ফেরত পেয়েছে, আবার তাহলে চিঠি কেন?
”দোসরা ডিসেম্বর তোমার বাবার বাৎসরিক, ওই দিন তুমি অবশ্যই আসিবে। ব্রাহ্মণভোজন করাইব, এ জন্য পঞ্চাশটি টাকা পাঠাইও। অনেকদিন তোমাকে দেখি নাই, বড় ইচ্ছা করে দেখিতে। কবে যে মরিয়া যাইব। শরীর বিশেষ ভালো নয়, চলাফেরা করিতে আর পারি না, কষ্ট হয়। বউ’মা ও কণা কেমন আছে। তাহাদের আমার আশীর্বাদ জানাইবে। ওই দিন কণাকেও লইয়া আসিবে। সে কত বড় হইয়াছে তাহা দেখিতে ইচ্ছা করে। আর বেশিদিন তো বাঁচিব না। এখানে সকলে একপ্রকার। বাসের ধাক্কায় সাইকেল হইতে পড়িয়া গিয়া তরুণের হাত ভাঙিয়াছিল। এখনো তাহার হাত সারে নাই। শ্রীধরজীর কৃপায় সে রক্ষা পাইয়াছে। তুহিনকে চিঠি দিলেও সে উত্তর দেয় না, শুনিলাম সে মোটর কিনিয়াছে। তুমি কিন্তু পঞ্চাশটি টাকা অবশ্যই পাঠাইবে। আশীর্বাদিকা, ইতি তোমার মা।”
হাতের লেখা জড়ানো, লাইনগুলো ক্রমশ ঢালু হয়ে গড়িয়ে পড়েছে। অথচ মায়ের হাতের লেখা ছিল মুক্তোর মতো। এখন বয়স হবে কত? সত্তর কবে পার হয়েছে! তুষার আবার চিঠিটা পড়ল। প্রতি বছর সে বিজয়ায় প্রণাম করে আসে, গত বিজয়ায় যেতে পারেনি। অনুযোগ করে মা চিঠিও দিয়েছিল। মা বাড়িতে কখনো চিঠি দেয় না। শুভার সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক রাখতে তিনি চান না। তুষারও কখনো শুভাকে বলেনি সে প্রতি মাসে বেলঘরিয়ায় টাকা পাঠায়।
দোষটা যে ঠিক কার এখনো সে বুঝতে পারে না। মা চেয়েছিলেন একসঙ্গে সবাই থাকুক। অর্থের দিক থেকে তরুণই ছিল কমজোরি, এখনো তাই। টেক্সম্যাকো কারখানায় তখন সামান্য কাজ করে অথচ লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলেছিল, তুষারের বিয়ের আগেই। শ্বশুরবাড়িতে রাখা বউ এবং একটি ছেলের খরচ টানা আর তার সাধ্যে কুলোচ্ছিল না। তুহিন তখন নিজেই টাকা জোগাড় করে কেমিক্যালসের ছোটখাট ব্যবসায় নেমেছে। সে কখনো কারুর সাহায্য চায়ওনি, সংসারে তার যতটুকু দেয় তার বেশি দেয়ওনি। প্রায় হস্টেলে থাকার মতই সে থাকত।
মা একদিন কলঘরের দরজার কাছে অফিস যাবার সময় তাকে ধরেছিল। ‘তরুণের বউকে তো আর বাপের বাড়িতে ফেলে রাখা যায় না, এবার তো আনতে হয়’। ফিস ফিস করে বলার দরকার ছিল না। তবু গোপনীয় খবর দেবার মতই স্বরটা ছিল।
”কিন্তু ওর যা মাইনে তাতে ও খাওয়াবে কী?’ তুষার ব্যাপারটা জানত। তবু বিরক্তি দেখায়।
‘কেন, তোরা তো আছিস, বউমা তো ভালোই মাইনে পায়, টেনেটুনে চলে যাবে। ছোট ভাই দুরবস্থায় পড়েছে, দাদারা দেখবে না?”
‘অবস্থাটা তো ও নিজেই তৈরি করেছে তাহলে নিজেই সামলাক। আমরা ওকে বিয়ে করতে বলিনি, মেয়ে দেখে বিয়েও দিইনি, লুকিয়ে করেছে। এখন আমরা ওকে দেখব এটা ও আশা করে কেন?’
‘ও আমায় কিছু বলেনি, আমিই তোকে বলছি।’
তুষার কথাটা বিশ্বাস করেনি কিন্তু মায়ের মুখে তখন ভিখারির কাতরতা দেখে সে কষ্ট বোধ করে।
‘লজ্জায় বলতে পারে না। বোঝে তো যে অন্যায় করে ফেলেছে, দাদাদের কাছে চাইবার মুখ নেই।’
‘তুহিনকে বলেছ?’
‘বলেছি। একটা বাড়তি আধলাও দিতে পারবে না বলল। ব্যবসায় নাকি খারাপ অবস্থা, যে-কোনোদিন উঠে যেতে পারে’।
‘আচ্ছা ভেবে দেখি।’
রাতে সে শুভাকে সব কথা বলে। শুনে ওর মুখে কোনো ভাবান্তর হল না।
‘কিন্তু এ বাড়িতে আমরা আর ক’দিনই বা আছি! দেবাই পুকুরে তো পাঁচ-ছ’ মাসের মধ্যেই চলে যাব তখন ঠাকুরপোর বউ-বাচ্চচাকে কে খাওয়াবে পরাবে?’
তুষার বলতে যাচ্ছিল, মাসে মাসে কিছু টাকা ওকে দেব। কিন্তু বলতে পারেনি। কিসে যেন তার বেঁধেছিল! পরিবারের বা ভাইয়ের সম্মানের কথা ভেবে? নাকি তার নিজের ব্যক্তিত্বের জোর না থাকায়? স্বচ্ছন্দে সে শুভাকে অগ্রাহ্য করে, একটা খবর দেবার মতোই বলতে পারত ‘মা’কে বলেছিলাম তরুণের বউ ছেলেকে আসতে বলো, কি বাপের বাড়িতে এ বাড়ির বউ পড়ে থাকবে? লোকে শুনলে কী বলবে!’ তুষার বলতে পারেনি। তার ভিতরে আবর্জনা জমে গেছে। ‘টাকার জন্য নিজেকে বিক্রি করল’ এই কথাটা, বউ’ভাতে নিমন্ত্রিত অফিসেরই কেউ বলেছিল। কানাকানি হয়ে তার কানেও এসেছিল।
তুষার ঘরের সব কটা মুখ দেখল। তখন সে অন্য ডিপার্টমেন্টে, অন্য ঘরে বসত। এ ঘরের কেউ তার বউভাতে নিমন্ত্রিত হয়নি। ড্রয়ার থেকে মানিঅর্ডার ফর্ম বার করে সে লিখতে শুরু করল। প্রশান্তকে আজই দিয়ে রাখবে যাতে কাল পোস্টঅফিসে প্রথমেই জমা দিতে পারে।
সন্ধ্যাবেলায় সে নাথেরবাগানে গেল। বাবা স্পোর্টসে দৌড়বে, হিমুর কাছে সেটা অবিশ্বাস্য সংবাদ। সন্দেহভরে সে প্রথমে জানতে চাইল, ”তুমি দৌড়তে পার?”
”পারি।”
”কেমন ভাবে দৌড়তে হয় বল তো?”
তুষার ঘরের মাঝে এক জায়গা দাঁড়িয়েই শুরু করল। রান্নাঘর থেকে চিন্ময়ী থালা নিতে ঘরে এল।
