মিনিট দুই পর ফিরে এসে বলল, ছোটকার শরীর খুব খারাপ, ঘুমোচ্ছে।’
‘কি হয়েছে? অসুখ বিসুখ কিছু?’
চিন্ময়ী প্রশ্নটা এড়িয়ে গিয়ে বলল, ‘আপনি আমার হয়ে কিন্তু একটু বলবেন।’
তুষার বাড়ি ফিরে দেখল শুভা এসেছে।
‘কে একজন যেন স্কুলের টিচারের চাকরির জন্য এসেছিল কণা বলল।’
‘হ্যাঁ, আমার খুব পুরোনো বন্ধু দিলীপের ভাইঝি, তোমাদের কে একজন বিটি পড়তে যাবে শুনে এসেছিল।’
”তাকে কি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এলে? খুব সহজভাবে শুভা বললেও তুষার চট করে ওর মুখটা দেখে নিল। টেবিলে খোলা মিটিংয়ের বিবরণী খাতাটায় মুখ নামাল। ঠোঁটে বা কপালে কোনো কুঞ্চন নেই। পিঠে চর্বির জন্য ওকে কুঁজো মনে হয়, ঝুঁকে বসে থাকলে ঘাড়ের কাছে একটা ডেলা জেগে ওঠে। তার দুপাশে লম্বা পেশী শক্ত হয়ে রয়েছে। তুষার সতর্ক হল।
‘ট্রেনে তুলে দিলাম। ওই ট্রেন থেকেই দেখি আমাদের অফিসের বনবিহারীদা নামল। স্টেশনের ওপারে ভগ্নিপতির বাড়িতে যাবে। গল্প করতে করতে গেলাম এক কাপ চা খেয়ে চলে এলাম।’…তোমাদের স্কুলে কি ভেকেন্সি হবে?’
‘না। আর হলেও যাকে তাকে নেওয়া হবে না। স্কুলেরই দুটি মেয়ে এখন এম এ পড়ছে, নেওয়া হলে ওদেরই কাউকে নেওয়া হবে।’
নিজের ঘরে গিয়ে তুষার শুয়ে পড়ে। আলোটা জ্বালায়নি। একবার পাশ ফেরার সময় পকেটটা খরখর করে ওঠে। চিন্ময়ীর অ্যাপ্লিকেশনটা।
দুদিন পর একটা ফিল্ম দেখে রাত্রে ফিরে সে শুনল চিন্ময়ী এসেছিল। দু সপ্তাহ পর সে চিন্ময়ীকে ডাকে চিঠি দেয়। তাতে লিখেছিল ‘আমাদের অফিসে একজন টাইপিস্ট নেওয়া হবে। তুমি ঠিক সাড়ে পাঁচটায় শহিদ মিনারের নিচে দেখা কর। আমি অপেক্ষা করব।’
চিন্ময়ী দেখা করে। টাইপের পরীক্ষা দেয় এবং ফেল করে।
কার্জন পার্কে বসে চিন্ময়ী দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠেছিল। ‘আমার কিছু হবে না, আমার কিছু হবে না…আমার জীবনটাই অভিশপ্ত, এবার আমি খারাপ হয়ে যাব।’
তখন তুষার আলতো করে ওর পিঠে হাত রেখে বলেছিল, ‘এত হতাশ হচ্ছ কেন, পাঁচ জায়গায় চেষ্টা করতে করতে ঠিক হয়ে যাবে।…আমি তো আছি।’
.ছাদের ঘরে চেয়ারের মতো কিছু একটা সরাবার শব্দ হল। চিত হয়ে তুষার সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে। কণাকে কি চিঠি দিয়ে দিলীপের কাছে পাঠাবে? চিঠিটা বা কণাকে সে কীভাবে নেবে? দিলীপ মদ খেয়ে বাড়ি ফিরে চিন্ময়ীকে সারারাত পাইখানায় বন্ধ করে রেখেছিল। কেউ দরজা খুলে তাকে বার করে আনেনি। এই লোকটার কাছে মেয়েকে কি পাঠানো যায়? এক গুজরাটির টাকায় নাকি ম্যাগাজিনটা কিনে নব কলেবরে বার করে বউ ছেলেমেয়েকে কোন্নগরের বাড়িতে রেখে সে এখন কলকাতায় ফ্ল্যাটে থাকে। নিশ্চয় গাড়িটাড়িও করেছে। কণাকে বসিয়ে হয়তো বলবে ‘তোমার বাবা লোকটি কেমন জান? আমার ভাইঝিকে সে…’
অসম্ভব। তাহলে সে গুলি করে মারবে ওই স্কাউন্ড্রেলটাকে।
ছাদের ঘরে চেয়ারে বসে নিচু ত্রিপদে পা তুলে কণা। স্কেচ খাতাটা কোলে। হিমুর অসম্পূর্ণ মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার মনে হল, ছোটবেলায় বাবা বোধহয় এই রকমই দেখতে ছিল। কান, কপাল, খুলির গড়নে দুজনের অদ্ভুত সাদৃশ্য রয়েছে। চোখের মণি দুটো বসানো হয়নি, সেখানটা সাদা। তাতে কী হয়েছে! মুখের বাইরের আকৃতিটা তো চিনে ফেলার পক্ষে যথেষ্ট। পাতাটা খাতা থেকে সাবধানে ছিঁড়ে নিতে সে ঠিক করে ফেলল, বাবাকে এটা দেখানো…অসম্ভব।
পাঁচ
”তুষারদা, পয়লা ডিসেম্বরই ঠিক হল।”
মুখ তুলে জিজ্ঞাসু চোখে তুষার তাকাল। অনির্বাণ টেবিলে ঝুঁকে আবার বলল, ”শনিবার পড়ছে। রোববারটা পাবেন গায়ের ব্যথা মারার জন্য। আপনাদের গ্রুপে তিনটে ইভেন্ট, একটা এবার বাড়ানো হল। একশো মিটার, টাগ অব ওয়ার আর নতুন অ্যাড করা হয়েছে থ্রি লেগেড রেস। আপনি বরাবরের মতো তো শুধু একশো মিটারেই নামবেন? তাহলে কালই রবির কাছে এন্ট্রিটা দিয়ে দেবেন।”
”এবার একটু যেন তাড়াতাড়িই স্পোর্টস করছ।”
”লোকসভা ইলেকশনের আগেই সবাই চাইল। কি আবার ডামাডোল গোলমাল শুরু হবে আর স্পোর্টস শিকেয় উঠবে, তার থেকে বরং আগে হয়ে যাওয়াই ভালো। প্রাইজের টাকা এবার বাড়ানো হয়েছে।”
বছরের এই একটা ব্যাপার যেটা তুষারকে ছেলেমানুষের মতো চনমনিয়ে দেয়। সত্যি সত্যিই সে কয়েকটা দিন যেন স্কুল জীবনের সান্নিধ্য অনুভব করে। প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তেজনায় আর সবাইকে হারিয়ে প্রথম হবার, হাততালি আর হইচইয়ের মধ্যে প্রাইজ নেবার জন্য একটা ঘোরের মধ্যে সে পড়ে যায়। গত চার বছর ধরে অর্থাৎ পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সিদের গ্রুপে পড়ার পর থেকে সে একশো মিটারটায় প্রথম হয়ে আসছে। অফিসের চল্লিশ বছর বয়সিদের সবাইকে হিসেবের মধ্যে রেখে, রবিই তাকে বলেছিল, ”দাদা পঞ্চান্ন বয়স পর্যন্ত চোখ বুজে আপনি চালিয়ে যেতে পারবেন, একশো মিটারের ফার্সট প্রাইজটা আপনার বাঁধা। অফিসে এখন আপনার ধারেকাছে কেউ তো নেই-ই, আগামী ছ’বছরও আসবার মতো কেউ নেই’। শুনে সে অদ্ভুত আত্মপ্রসাদ অনুভব করেছিল। জীবনের বহু কিছু শরীরের ক্ষমতার উপরই নির্ভর করে। হিমুকে বড় করে তোলার জন্য তাকে আরও পনেরো-কুড়ি বছর বাঁচতে হবে, শরীরটাকে ততদিন টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য মাজা-ঘষা করে চালু অবস্থায় রাখা দরকার। বছরে এই একবারই এটা পরীক্ষা করে নেবার সুযোগ তার কাছে আছে। তার ভয় হাঁপানি সম্পর্কে, বাবার নাকি এই রোগটা ছিল।
