হাতের ধাক্কায় বাচ্ছাটাকে ফেলে দিল শৈল। কেঁদে উঠল বাচ্ছাটা, ওকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল মাধবী।
-তুই মাথা ঠাণ্ডা করে রাখ। এলেই ভাত খাইয়ে দিবি। ওকে পাগলামো চিন্তা করতে বারণ করিস। এটাকে নিয়ে যাচ্ছি, চুপ করলে পাঠিয়ে দোব।
ঊর্ধ্বশ্বাসে শৈলর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল মাধবী।
.মাধবী ঘরে নেই। রমা চুপি চুপি তিনতলায় উঠে এল।
ছাদেই ছিল বিশ্ব। জামা শুকোচ্ছিল। তুলে নিয়ে ঘরে ফেরার পথে রমাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল।
-টালিগঞ্জে গেছলুম। হঠাৎ এমন বৃষ্টি নামল!
-কই, এদিকে তো বৃষ্টি হয়নি।
-ওই তো মজা।
-টালিগঞ্জে কে আছে?
অফিসের এক বন্ধু। বেচারার কাল থেকে চাকরি থাকবে না।
-কি করে জানলে?
-ভেতর থেকে খবর পাওয়া গেছে। আরো দু-তিন জনের চাকরি যাবে।
-কেন যাবে?
-ভগবান জানেন। কেন যাবে জানলে তো কোর্টে মামলা লড়া যেত। শুধু জানিয়ে দেবে তোমার চাকরির আর দরকার নেই। ব্যস, তারপর কলা চোষো। চল এখানে দাঁড়িয়ে কি হবে।
-কেন বেশ তো আছি।
-ঘরে চলো না।
রমার কনুই ধরে টানল বিশ্ব।
-কি হবে গিয়ে।
-কি আবার হবে, ব’সে ব’সে পরলোক-তত্ত্ব আলোচনা করব।
টেনে নিয়ে এল বিশ্ব রমাকে। আশা তার দেওরের বাড়ি বেড়াতে গেছে। সন্ধ্যার আগেই ফিরবে। বিশ্ব উঁকি মেরে দেখে নিল মা ঘুমোচ্ছে কি না। দরজাটা ভেজিয়ে দিতেই রমা আপত্তি করল।
-ওটা খোলা থাক না।
-কেন!
-বন্ধই বা কেন করবে!
-একই ব্যাপার।
ব্যাপারটা বুঝেছিল রমা। বুঝে ভালই লাগছে। কিন্তু না বোঝার ভান করলে জিনিসটা আরো মিষ্টি লাগে। সময় কাটানোটাই বড় কথা, তার ওপর ফাউ এই মিষ্টি-মিষ্টি ভাবটুকু। কিন্তু আগেকার সময় কাটানোর থেকে এখন তফাত আছে। আগে যে অনিশ্চিত ভাবটুকু ছিল এখন আর তা নেই। বিশ্ব চাকরি করে। বুক ঠুকে এখন সে সংসার পাততে পারে। এখন ও যে কথা বলবে তা’ সত্যিকারের আন্তরিক। তার ওপর নির্ভর করা যায়।
উঠে গিয়ে রমা খুলে দিল দরজাটা। বিশ্ব ছুটে এসে কপাটটা চেপে ধরল।
-না, বন্ধ থাক।
-ধ্যেৎ, লজ্জা করে না।
-লজ্জা আবার কার কাছে!
মুখ ঘুরিয়ে রইল রমা। জানলা দিয়ে শুধু পাঁচিলটা দেখা যায়। এক’পা এগিয়ে গেলে আকাশটা দেখা যাবে। আকাশ দেখতে ইচ্ছে করল রমার।
দুহাতে জড়িয়ে ধরল বিশ্ব। আকাশ দেখতে ইচ্ছে করছে না এখন আর। নাকটা ঘষতেই বিশ্বর বুকের লোমে খসখস শব্দ হল।
-সেদিন যা বলেছিলে তা ভুলে গেছ!
-কি বলেছিলুম।
-বারে, বাবার কাছে গিয়ে বলবে।
রমাকে ছেড়ে দিল বিশ্ব। কাঁধটা ঝুলে পড়েছে। ন্যাকড়ার পুতুলের মত হাত দুটো নড়বড়ে দেখাচ্ছে।
-কি হবে বলে।
-কেন?
-চাকরি থাকবে কিনা তার ঠিক কি।
-কেন থাকবে না?
-আমি তার কি জানি। দেখছি চোখের সামনে চাকরি চলে যাবে বিনা কারণে। আমার যদি যায়? যতক্ষণ না পাকা হচ্ছি ততক্ষণ আমার সঙ্গে একটা বেকারের কি তফাত? বরং বেকাররা আরো সুখী। তাদের আমার মত যন্ত্রণা পোয়াতে হয় না। কিচ্ছু করতে পারব না আমি। যাই করতে যাই না কেন একটা ভয় সব সময় তাড়া করে ফিরছে; যদি চাকরি না থাকে! কোন কিছুতেই আমি স্থির হতে পারছি না। নিজেকে এক মুহূর্তও নিরাপদ ভাবতে পারছি না।
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যেন স্বীকারোক্তি করছে বিশ্ব। ওর পেছনের জানলার রেলিংগুলো আরো মজবুত দেখাচ্ছে। জানলার ওপরেই আকাশ। রমার আকাশ দেখতে ইচ্ছে করছে।
চুপ করে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইল দুজনে। বিশ্বর মুখ দেখতে পাচ্ছে না রমা। আলোটা আসছে পিছন থেকে। রমা বলল:
-তা হলে?
-জানি না।
-আমি কি করব?
-জানি না।
-এমন করে চললে আমি মরে যাব। আমি আর বাঁচব না।
-তা’ আমি কি করব।
কালো দুটো টুনি যেন জ্বলে উঠল বিশ্বর আবছা অন্ধকার মুখে। ঝুলে পড়া কাঁধটা শান্ত হয়ে উঠল। হাত বাড়িয়ে সে রমাকে ছুঁল।
পেছিয়ে যাবার চেষ্টা করা মাত্রই আঁচলটা টেনে ধরল বিশ্ব। বাধা না দিয়ে রমা শুধু শাড়িটা আঁকড়ে দেয়ালে লেপ্টে গেল।
-তুমি জানোয়ার হয়ে যাচ্ছ।
-জানোয়ারের হাতে পড়লে এতক্ষণে তোমার কিছুই থাকত না। আমি মানুষ।
-না, তুমি মানুষ নও।
দুপাশে হাত ঝুলিয়ে, খাড়া দাঁড়িয়ে হঠাৎ ফুঁপিয়ে উঠল বিশ্ব। বুকের মধ্য থেকে বাতাসের এক একটা ঝাপটা মুখ আর নাক দিয়ে অদ্ভুত শব্দ করে বেরিয়ে আসছিল। আলো এসে পড়েছিল পিছন থেকে। পিছনে জানলা। জানলার ওপারে আকাশ। তখন আর আকাশ দেখতে ইচ্ছে করেনি রমার। ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।
.-চিনু তুইও অ্যাপ্লিকেশন কর।
অদ্ভুত লাগছে চিনুর কথাটা শুনে। সাড়ে সাতটাতেও অফিস-ফেরত ট্রাম বাসগুলোতে ভিড়ের কামাই নেই। হরেক রকমের পুরুষ-মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে। বাতাস দিচ্ছে। কাঁধের ওপর পত পত করল কলারটা। বুকে সেঁটে আছে জামাটা।
অমলের বুকটা ভীষণ সরু। আশ্চর্য ওর এখনো টি-বি হয়নি। ওর বাবাকে এখনো তিনটি মেয়ের বিয়ে দিতে হবে। অমল থার্ড ইয়ারেই পড়া ছেড়েছে। কলেজে বেশ কবিতা লিখত, এখন মাঝে-সাঝে লেখে।
-চিনু তুইও অ্যাপ্লিকেশন কর।
-হবে কি কিছু?
-কিছু হবে না ভাবলে, সত্যিই কিছু হবে না।
করুণ সুরে প্রায় মিনতি করল অমল। চিনু তাকাল পুব মুখো। এদিকে বইয়ের পাড়া। ছোট-বড় বইয়ের দোকান। খুঁজলে দু’একটা লেখককে রাস্তায় পাওয়া যাবে। একজন আসছে, ওকে চিনু দু’দিন আগেই দেখেছে। অমলের মত গলা করে বইয়ের দোকানের সেলসম্যানের কাছে আবেদন করছিল, খদ্দের এলে তার বইটাকে যেন আগে সুপারিশ করে। দুজনে বলার ভঙ্গিটা হুবহু এক। অমলের বাড়ির খবর চিনু জানে, ওই লেখকটিও জানে না। এখন যেন জানা গেল।
