চিন্ময়ী এবং কণা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হচ্ছিল।
”আপনি ছোটকাকাকে চেনেন?’
‘কলেজের দিলীপ হলে নিশ্চয় চিনি তবে বহুদিন তো আর দেখা সাক্ষাৎ নেই, প্রায় দশ বছর। আপনি তাহলে দিলীপের ভাইঝি!
একটা যোগসূত্র রচনা করতে পেরে তুষার অত্যন্ত আরাম বোধ করেছিল। হয়তো এমন একটা কিছু সে চাইছিল যাতে এই আলাপ কথাবার্তা নিছকই, অতিথিকে বিরসতার হাত থেকে মুক্তি দেবার জন্য হয়ে না যায়। কিছু ব্যক্তিগত স্পর্শ না থাকলে কথা বলে সুখ নেই। কোনো ধরনের একটা সম্পর্ক এজন্য গড়ে নেওয়া দরকার।
চিন্ময়ী এক ঘণ্টারও বেশি শুভার জন্য অপেক্ষা করেছিল আর ততক্ষণ তুষার কথা বলে গেছে।
”আপনি একটু বলবেন ওঁনাকে? কাজটা পেলে কিন্তু সত্যিই খুব উপকার হয়। টেম্পোরারি, তা হোক…ভেকেন্সি হলে কাজ পেয়ে যাওয়ার চান্স থাকে। তাছাড়া টাইপও জানি, আপনি আমার হয়ে বললে…ওঁনার হাতেই সব, আমাকে ওই স্কুলেরই এক টিচার খবরটা দিয়েছেন…এখনও কোনো ক্যান্ডিডেট নেই শুনেছি।..যদি আপনি…কাকার বন্ধু।’
‘কাকারা, দিলীপ তো আপনার জন্য চেষ্টা করতে পারে কোথাও।’
‘আমাকে আপনি বলবেন না।’
তুষারের হাসি পেল। এটা তো অনেকক্ষণ আগেই ওর বলা উচিত ছিল। বোধহয় উৎকণ্ঠায় চাপে ভুগছে।
‘ছোটকা মালিককে বলে ওর কাগজেই বিজ্ঞাপন যোগাড়ের কাজ পাইয়ে দিয়েছিল। একমাস করেছিলাম।
‘ছাড়লে কেন, ভালোই তো কাজ, অনেক মেয়েই করছে।’
‘তা করছে, কিন্তু আমি যথেষ্ট চালু নই। সাকসেসফুল হতে গেলে এইরকম ছোট ম্যাগাজিনের মেয়ে রিপ্রেজেন্টেটিভকে কাজের বাইরেও কিছু কাজ করতে হয়।…আমার পক্ষে তা করা সম্ভব হয়নি।’
‘কেন হয়নি’, এই প্রশ্নটা যাতে তুষার না করে এমন একটা অনুরোধ ওর চোখে ছিল।
‘দিলীপ কী বলল?’
‘আমার উপর বিরক্ত হয়। ক্যাবলা, গাধা মেয়েদের দ্বারা, আপনি বলুন, সংসারের কি কোনো উপকার হয়?’
তুষার বিব্রত হয়ে ওঠে ওর হঠাৎ স্বর পরিবর্তনে।
বাষ্পর এবং চোখে জলের চিকচিকানি ওর কথাগুলো যে ওর নয়, অন্য কারুর উক্তিরই পুনরাবৃত্তি সেটা বুঝতে তাকে বুদ্ধিতে টান দিতে হয়নি।
‘নিজেকে নিজে দাঁড় না করালে কার এত দায় পড়েছে চিরকাল খাওয়াবে পরাবে এমন তো কোনো চুক্তি নেই…সংসার তো বাড়ছে। আমার মতো কত মেয়েই তো দাঁড়িয়ে যাচ্ছে আমিই শুধু পারি না…ইচ্ছে করলেই পারি কিন্তু এসব আমার বদমায়েসি, কাকাদের ঘাড়ে বসে খাব বলেই…”
থেমে গেছল। তুষার এবারও বুঝল কথাগুলো চিন্ময়ীর মুখ দিয়ে অন্য কারুর সম্ভবত কাকিমাদেরই কারুর, বিষাদে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল তুষার। কিন্তু চিন্ময়ী নিজেকে দ্রুত সামলে নেয়। এরপরই সে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ায়।
বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তুষার দুটো ছাতা বার করল।
‘চলো তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।’
চিন্ময়ীর মুখ দেখে সে বুঝল এইটুকু সৌজন্য সে কখনো পায়নি।
‘এগিয়ে দেবার কি আছে, আমি নিজেই তো স্টেশন থেকে এসেছি, পথ তো জানাই।’
‘সন্ধ্যে হয়ে আসছে, পথটা নির্জন, বৃষ্টিও পড়ছে। সুন্দরী তরুণীদের এখন একা পথ চলতে নেই।’
চিন্ময়ীকে কোমল দেখাল। অপ্রতিভ মুখটা ঘুরিয়ে এক পলকের জন্য হেসে নিয়ে বুঝিয়ে দিল, মিথ্যা হলেও সে তুষারের উদারতাকে তারিফ করছে। স্টেশনে তারা পৌঁছয় পথে গম্ভীর কোনো কথা না বলেই।
‘আমি এবার চলে যেতে পারব।’ ছাতাটা মুড়ে চিন্ময়ী এগিয়ে ধরল।
‘জানি, ট্রেনটা আসুক তো। ছাতাটা এখন থাক, নেমে দরকার হবে।’
চিন্ময়ী হয়তো বলতে যাচ্ছিল, ‘ফেরত দেব কী করে’ কিন্তু বলল না। ট্রেন এল। ছুটির দিনে এই সময় ভিড় থাকার কথা। দূরের যাত্রীদের সপরিবারে ঘরে ফেরার সময় এখন। কিন্তু ভিড় নেই। চিন্ময়ী ছুটে কাছের কামরাটায় উঠল। এই সময় তুষার নিজের কাছেও অপ্রত্যাশিত এমন একটা কাজ করে ফেলে, যার যৌক্তিকতা সে পরে অনেকবার ভেবেও খুঁজে পায়নি। তার শুধু মনে হয়েছে রুটিন মাফিক একঘেয়ে জীবনকে মানতে অস্বীকারের চেষ্টা ছাড়া এটা অন্য কিছু নয়।
চিন্ময়ী রীতিমতো অবাক হয়ে গেছল তুষারকে ট্রেনে উঠে পড়তে দেখে। সে কিছু বলার আগেই তুষার বলে ওঠে, ‘ছাতাটার দাম আছে, ফেরত নিতে হবে না?’
কৌতুকটা ওর বিস্ময় ভেদ করার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় কোন্নগর স্টেশন এসে গেল। তিন মিনিটের পথ। তখনো বৃষ্টি পড়ছিল।
‘এই নিন আপনার দামি ছাতা।
‘এখন নেব কি! ভিজে ভিজে বাড়ি যাবে নাকি? দিলীপকে অনেকদিন দেখিনি, চলো একবার দেখা করে যাব।’
চিন্ময়ীকে অনুসরণ করে প্রায়ান্ধকার রাস্তায় যেটা কয়েকটা মোড় ঘুরে সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছিল, চলতে চলতে কুণ্ঠিত স্বরে সে বলল, ‘তোমার কি অসুবিধে হবে আমি তোমাদের বাড়িতে গেলে?’
‘না, অসুবিধা আর কি। ওটা হবে আপনার, আমাদের লোক বসানোর জায়গাই নেই। অবশ্য ছোটকা থাকলে তার ঘরে বসতে পারবেন।’
একটু পরে তুষার জানাল ‘স্কুলের কাজটা হবে কি হবে না সেটা আমি আজই জেনে নেব। কিন্তু তোমায় জানাব কি করে?’
‘আমি কাল কি পরশু আপনাদের বাড়ি গিয়ে জেনে নেব।’
‘সেই ভালো। সকালে এলে শুভার সঙ্গে দেখা হবেই আর সন্ধ্যের পর।’
‘একটা অ্যাপ্লিকেশন সঙ্গে রয়েছে, এটা ওঁকে দিয়ে দেবেন?’
‘দাও।’
বোধহয় ব্লাউজের মধ্য থেকেই খামটা বার করল। দোমড়ান, দুভাঁজ করা। একতলা জীর্ণ একটা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে, ছাতাটা বন্ধ করে তুষারের হাতে দিয়ে চিন্ময়ী বলল, ‘ছোটকাকে ডেকে দিচ্ছি, আপনি এখানেই দাঁড়ান।’
