”তুই নবারুণ দেখিস?”
অন্যমনস্ক কণা চোখ মেলে তাকিয়ে রইল। সে ঠিক করে ফেলেছে হিমুকেই জিজ্ঞাসা করবে, ‘আমাকে কেমন দেখতে বলো তো?’
”অ্যা, নবারুণ?”
”ওখানে ছবিটবিগুলো কেমন হয়?”
”অসাধারণ! বীরেন দত্তর, সুনির্মল ঘোষের ড্রইং দেখবার মতো, কত পাকা ওরা! ফিগার আঁকায় এখন ওদের ধারেকাছে কেউ নেই। স্পেসকে ব্যবহার করা, লাইনের কনট্রাস্টে একটা মুডকে তুলে ধরা…।”
”কিন্তু কাগজটা অতি বাজে।”
”হলেই বা, আর্টিস্টকে তো বিচার করবে তার নিজস্ব কাজের গুণ দিয়ে।”
”তোকে ওখানে ছবি আঁকতে বললে আঁকবি?” হালকা স্বরেই তুষার বলল কিন্তু উত্তরটার জন্য নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলল।
”নিশ্চয়!” টেবিলে মুঠো দিয়ে কণা ধাক্কা দিল। স্বরটা ঈষৎ উত্তেজিত।
বুড়ো আঙুলটা বেঁকিয়ে রান্নাঘরের দিকে নির্দেশ করে তুষার ভ্রূ তুলল। ফিস ফিস করে বলল, ”যদি দেখে?”
কণার মুখে নিঃশব্দ হাসি ছড়িয়ে পড়ল। গত চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে এই প্রথম তার ভিতরটা হালকা ধরঝরে লাগল। গত দিনটাকে এতক্ষণে সে একদমই ভুলে যেতে পারছে। ছোট্ট করে হাত নেড়ে বলল,
”দেখবে না…পড়েই না,”
কণাও জানে শুভা শারীরিক ব্যাপারে কত পিটপিটে, ছুঁচিবেয়ে। স্কুলের বইয়ের বাইরে অন্যকিছু পড়তে সে দেখেনি, এমনকি চিঠিও নয়। মাকে কেউ চিঠি লেখে না। মামাবাড়ি থেকে চিঠি আসে না, বেলঘরিয়া থেকে ঠাকুমাও লেখে না। মার কোনো বন্ধু সে এখনো দেখেনি।
”কিন্তু তোর আঁকা বেরিয়েছে শুনলে ঠিকই দেখবে।”
”আমি বলছি না…বাজি?”
রান্নাঘর থেকে শুভা বেরিয়ে এল।
”তোমরা কি একটু ঘুমিয়ে নিয়ে তারপর ভাত খাবে?”
”এখন ঘুমোব কেন? রাতে কি ঘুমোইনি নাকি?” কণা অবাক চোখে শুভার তারপর তুষারের মুখ লক্ষ্য করল।” ”বাবা তুমি রাতে ঘুমিয়েছ?”
”যে খাটটায় শুতে দিয়েছিল ভীষণ ছারপোকা ছিল। ঘুমোতে পারিনি।”
”আমি দারুণ ঘুমিয়েছি, এত টায়ার্ড ছিলাম। হাঙ্গামার কতকগুলো স্কেচ করেছি রাস্তায়, রেয়ার এক্সপিরিয়েন্স হল, পরীক্ষায় এবার সাবমিট করব, কদিন এখন লাগবে ফিনিশ করতে।” কণা উঠল। সিঁড়ি পর্যন্ত গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল।
”বাজিটার কী হবে?”
কাপ প্লেটগুলো তুলতে তুলতে শুভা তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ”কী?”
”তোমায় নয়, বাবাকে বলছি।”
”আগে ওখানে কিছু বেরোক তারপর তো বাজি। তোর স্কেচগুলো কেমন হয়েছে দেখতে ইচ্ছে করছে।” তুষার আগে কখনো তার এই ধরনের ইচ্ছা প্রকাশ করেনি। কণা নিজেই তাকে আঁকা দেখাত।
”শেষ হোক, দেখাব।”
তুষার শোবার ঘরে এল। বিয়ের বড় খাটটায় বাচ্চচা কণাকে নিয়ে তারা দুজন শুত। কণা ছাদের ঘরে যেদিন উঠল তার সঙ্গেই খাটটাকে চালান করে দুটো সিঙ্গল খাট এই ঘরের দুধারের দেয়াল ঘেঁষে পাতা হয়েছে। আলাদা খাটে শোয়ার প্রস্তাবটা প্রথম কে দিল, সেটা তুষারের এখন আর মনে নেই। সম্ভবত সে বলেছিল ‘তোমার পাশে একটা টেবল ল্যাম্প আর ছোট টেবিল থাকলে ভালো হয়। রাতে উঠতে হলে হাত বাড়িয়েই আলো আর চশমাটা পেয়ে যাবে। তাছাড়া, খাটটা বড্ড উঁচু, ওঠানামায় অসুবিধে হয়।’
শ্রীরামপুর থেকে অর্ডার দিয়ে কেনা হয় দুটো খাট আর মাঝের আয়না ড্রয়ার দেওয়া টেবিল। ড্রেসিং টেবিল এটাকে হয়তো বলা যেত যদি শুভার ড্রেস করার দরকার কখনো হত।
কণা ছাদের ঘরে যাওয়ার আগেই তুষারকে দ্বিতীয় ঘরটায় দশবারো বছর কাটাতে হয়েছে। তখন কণা পাঁচ বছরের। একই খাটে তিনজনের, বিশেষ করে ‘বড় হয়ে যাওয়া’ মেয়েকে নিয়ে শোয়ায় শুভাই আপত্তি তুলেছিল। ‘বসার ঘরটায় তো কেউ বসে না, এমনকি পড়ে থাকে, তুমি বরং ওটাতে থাক।…ছাত্রছাত্রীরা কতক্ষণই বা আর বসবে।’
শুভা আর কণা বড় ঘরেই রইল। তাকে আসতে হল ছোট ঘরটায়। সেই সময়ই একদিন বিকেলে সম্ভবত রথের দিন, কেননা শুভার স্কুল বন্ধ ছিল আর সে গেছল স্কুল সেক্রেটারির বাড়ি জরুরি মিটিংয়ে, তখন এসেছিল চিন্ময়ী। শুভার স্কুলের ভূগোলের টিচার বি টি পড়তে যাবেন, তার জায়গায় অস্থায়ী একজনকে নেওয়া হবে। এই খবর পেয়ে সে উমেদার হয়ে এসেছিল।
শুধু তুষার আর কণা ছিল বাড়িতে। খাবার টেবিলের ধারে তারা বসেছিল। লম্বা, ছিপছিপে ফর্সা, চওড়া ভ্রূ ও কপাল, চৌকো চোয়াল মেয়েটির মুখে আত্মপ্রত্যয় ও কাঠিন্য ছিল। কণ্ঠস্বর ঈষৎ কর্কশ, ভরাট যেটা খাদে নামালে পুরুষালি শোনায়। গায়ের চামড়া খসখসে, খোঁপার ফিতে তেলে ময়লা। তাঁতের গোলাপি জমির শাড়িটার রং বিবর্ণ, হাতাবিহীন ব্লাউজের পিঠের হুকগুলোর একটা কি দুটো ছিল না। দেহে কোথাও গহনা নেই, এমনকি লোহার বালাও নয়। চমকপ্রদভাবে শুভার বিপরীত।
তুষার প্রথম দর্শনেই আকৃষ্ট হয়ে ওর সঙ্গে এলোমেলো কথা বলতে থাকে। কণা তার পাশে বসে ছিল, মাঝখানে সেও কথায় যোগ দেয়। এক সময় তুষার চা খাবার প্রস্তাব দেয়। কণা লাফিয়ে ওঠে: ‘আমি চা করব।’ চিন্ময়ীর সৌজন্য আপত্তি অগ্রাহ্য হয়। তারপর কথায় কথায় বাড়িতে কে কে আছেন প্রশ্নটা ওঠে। কোন্নগরে পৈতৃক বাড়িতে কাকা-কাকিমারা আর বিধবা পিসি ছাড়া কেউ নেই। বাবা-মা শৈশবেই মৃত, ভাই বোনও নেই। দুই কাকা জুট মিলে কাজ করেন, সামান্য মাইনে, ছোট কাকা করেন একটা সিনেমার ম্যাগাজিনে।
কী নাম? দিলীপ চৌধুরী।
‘য়্যা দিলীপ! নিশ্চয় আমাদের কলেজের দিলীপ। রোগা, লম্বা, আপনার মতই ফর্সা। চোখ পিট পিট করা অব্যেস। আর পান খায় খুব। ওর খুব ইচ্ছে ছিল ম্যাগাজিন বার করার। আমাকে জপাত, আয় দুজনে মিলে একটা বার করি।’
