তুষার অভিভূত হয়ে গেছল। সেটা প্রথম ভাঙল ছাঁদনাতলায় শুভদৃষ্টির সময়। একজোড়া কাচ বসানো তাল-এর মতো একটি মুখ আর তাতে নাকে, কানে, কপালে সোনা, হীরে, মুক্তো বসানো। ফুলশয্যার রাতে আলো নিভিয়ে শোবার পর সে আলাপের চেষ্টায় জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘কদিনের ছুটি নিয়েছ?”
‘দু সপ্তাহের।’ জড়তাহীন স্পষ্ট স্বর কিন্তু মিষ্টি।
‘আমি এক হপ্তার। কিন্তু এখান থেকে যাতায়াতের তো অসুবিধে হবে তোমার।’
‘ত্রিবেণী থেকেই স্কুল করব।’
উত্তরের ভঙ্গিতে তুষারের মনে হল সিদ্ধান্তটি বহু আগেই নেওয়া। বাপের বাড়ি থেকে চাকরি করার কথা নব পরিণীতার মুখে অন্তত রীতিমত বেমানান। তার অফিসের অরুণ বিশ্বাসের বউ কলকাতা থেকে রোজ কাঁচড়াপাড়ায় গিয়ে মাস্টারি করে আসছে আজ পনেরো বছর। তাছাড়া কলকাতা থেকে ভদ্রেশ্বর যতটা কাছে ত্রিবেণী থেকে ততটা নয়।
তুষার নিরুত্তর থাকায় শুভা আবার বলল, ‘দেবাই পুকুরের জমিটায় বাবা সামনের মাস থেকেই বাড়ির কাজ শুরু করাবেন। ওখান থেকে স্কুল অনেক কাছে হবে।’
‘কলকাতা থেকে করা যায় না?’
‘ট্রাম বাসে আমার অসুবিধে হয়।’
‘চশমাটা খুলে কোথায় রাখলে?’
‘বালিশের পাশে।’
‘বিয়ের পর বাপের বাড়িতে থেকে গেলে অনেকরকম কথা হবে।’
অনেকক্ষণ পর শুভা বলেছিল, ”কী আর করা যাবে।”
‘স্কুলের কাজটা ছেড়ে দেওয়া যায় না?’
‘না।’ শান্ত, দৃঢ় এবং দ্রুত জবাব। পূর্বস্থিরীকৃত সিদ্ধান্ত।
এই একটা শব্দের মধ্য দিয়েই তুষার জেনে গেছল তার স্ত্রী জেদী, একগুঁয়ে, কোনো অনুরোধেই ওকে এই ‘না’ থেকে সরানো যাবে না।
‘কাজ আমি করে যাব।’
এইখানেই ফুলশয্যার রাতের আলাপ শেষ। নতুন খাটে নতুন বিছানায় তুষার কুঁচকে থাকে। ফুল, সেন্ট আর বেডকভারের কোরা গন্ধে তার গা গুলিয়ে উঠেছিল। সে ভুলে যায় শরীরের কৌমার্য নষ্ট করার অধিকার।
একেবারে স্নান সেরে তুষার কলঘর থেকে বেরিয়ে দেখল খাবার টেবিলে চা ঢাকা দেওয়া রয়েছে। অন্য বাথরুমে কণা। রান্নাঘরে বাসনের শব্দ, ঝি কাজ করছে। শুভা টোস্ট আর ডিমভাজা টেবিলে রেখে গেল। টেবিলে খবরের কাগজটা ভাঁজ করা। শুভা পড়েনি, খবর জানার আগ্রহ কোনোদিনই ওর নেই। বোধহয় চোখের জন্যই পড়তে অসুবিধে হয়। তুষার কাগজটা টেনে নিল।
‘তারকবাবু ছিলেন না। পবিত্রবাবুর সঙ্গে কথা বলছি তখনই ইন্দিরা গান্ধীর খবরটা এল, ব্যস তাড়াতাড়ি দোকান বন্ধ করে ভদ্রলোক চলে গেলেন…কদিন পরে আবার যাব।” তোয়ালে দিয়ে ভিজে চুল ঘষতে ঘষতে কণা বলল।
”কত টাকা দেবে?” তুষার কাগজ থেকে মুখ তুলল ”শুনেছি পাঁচ-ছ’ টাকা দেয় এক একটার জন্য।”
”মাত্র!” সে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।
”তাই নেবার জন্যই কত ছেলে ঘুরছে।”
”দরকার কি তোর এই সামান্য টাকার কাজে, এতে তো নামও হবে না!”
”করুক।”
তুষার মুখ ঘুরিয়ে পিছনে তাকাল। রান্নাঘর থেকে শুভার গলা ভেসে এসেছে। তাদের কথাবার্তায় কান রেখেছে।
‘সেলফ সাফিসিয়েন্ট হওয়ার চেষ্টা এখন থেকেই শুরু করা ভালো।”
”কণা খেতে শুরু করেছে। তুষার চায়ের কাপ তুলে ঠোঁটে ছুঁইয়েই নামিয়ে রাখল। ঠান্ডা হয়ে গেছে। কণা সেটা লক্ষ্য করে স্বর চড়িয়ে ”মা, বাবার চাটা গরম করে দাও।”
শুভা এসে কাপটা নিয়ে গেল। তুষার মৃদু স্বরে কণাকে বলল, ”বইয়ের বা ম্যাগাজিনের কভার তো করতে পারিস, গল্পের ইলাস্ট্রেশনও…তোর স্কেচের হাত তো ভালোই।”
”কে দেবে, আমার কোনো চেনাশোনা নেই।”
কণা পূর্ণ দৃষ্টিতে তার বাবার মুখের দিকে তাকাল। কাল রাতে এই লোকটিই হিমুর হাত ধুয়ে দিচ্ছিল। নিশ্চয় হিমু গল্প করেছে, উপরে একটা মেয়ে এসেছে সে তার ছবি এঁকেছে।
মেয়ে ছবি আঁকিয়ে শুনলেই বাবার কৌতূহল হবে। নিশ্চয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে হিমুকে প্রশ্ন করবে-নাম কী? দেখতে কেমন? কাঁধের ঝুলিটার রং কী? পরনে কী ছিল? কী রকম জুতো? চুল কেমন? নামটা হিমু জানে না। তবে দেখতে কেমন, সেটা তো বলতেই পারে। বাচ্চচারা অদ্ভুত সব জিনিস দেখতে পায়।
তখন তার হিমুর মতই বয়স, এক তরুণী এসেছিল মার কাছে, স্কুলের চাকরির জন্য। এই টেবলেই সে বসেছিল। মা তখন বাড়িতে ছিল না। মা যখন ফিরে আসে তখন বর্ণনা দিতে গিয়ে সে বলেছিল, ‘ব্লাউজের হাতা একদমই নেই, বগলেও চুল নেই।’ মা প্রচণ্ড জোরে ধমকে উঠেছিলেন ‘ওসব তোমায় কে দেখতে বলেছে?’
কিন্তু তার চেহারায় এমন কিছু আছে কি যেটা অন্য পাঁচটা মেয়ের থেকে তাকে আলাদা করে বোঝাতে পারে? কণা নিজেকে কলেজের মেয়েদের মধ্যে রেখে একনজরেই চোখে পড়ার মতো কি আছে বার করার চেষ্টা করল।
শুভা চা গরম করে দিয়ে গেছে। এখন সে রান্নায় ব্যস্ত হবে। তুষার কাপটা তুলে নিয়ে ভাবল, একটা চিঠি দিয়ে দিলীপ চৌধুরির কাছে কণাকে পাঠালে কেমন হয়। কলেজে চার বছর তারা একসঙ্গে পড়েছে। কলেজ ম্যাগাজিনে সম্পাদনায় দিলীপ ছিল তার সহকারী। এখন সে পাক্ষিক নবারুণ-এর মালিক এবং সম্পাদকও। বিক্রি নাকি পঞ্চাশ হাজার ছাড়িয়েছে। ম্যাগাজিনটা কেচ্ছা-কেলেঙ্কারিতে ভরা, কিন্তু তার সঙ্গে আর্টিস্টের কী সম্পর্ক? কিন্তু মেয়েদের সেক্সি ফিগারের প্রোভোকেটিভ ভঙ্গির, বিছানায় ইন্টিমেসিস স্কেচ সে নবারুণে দেখেছে। ওইসব কি কণা আঁকবে? তুষার নাকচ করে দিল চিঠি লেখার চিন্তাটা।
