‘কণার আলাদা ঘর এখন দরকার। বড় হচ্ছে, ওর নিজস্ব পার্সোনালিটি এবার গড়ে তোলার সময়।…নিজের ইচ্ছেমতো ঘর সাজানো, চলাফেরা, প্রাইভেসি তাছাড়া যদি আর্ট কলেজে ভর্তি হয় তাহলে আঁকার ব্যাপারও থাকবে, সেজন্য কিছুটা জায়গা, সূর্যের আলো, নির্জনতা…নিচের ঘরে এসব তো নেই। ওকে ঘরটা করে দিয়ে, তোমার ঘরটা বসার ঘর করব।’
তুষার শুধু তাকিয়ে থেকেছিল শুভাননার মুখের দিকে, বরং সঠিক বললে নাকের পাশে দুটো পুরু কাচের দিকে যার পিছনে ওর মনের ক্রিয়াকর্মের আভাস লুকোনো থাকে। ছাদের ঘরটা নেবার ইচ্ছা যে সে কখনো প্রকাশ করেনি এজন্য তুষার নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেছিল। ইচ্ছাটা জানিয়ে দেবার পর প্রত্যাখ্যাত হলে সে অপ্রতিভ হতই। শুভাননা যা কিছু করে সেটা বহু আগেই ঠিক করে রাখে। ছাদের ঘর যে কণার জন্যই নিশ্চয় সেটা বাড়ির নকশা করার সময়ই মনে মনে সে ঠিক করে রেখেছিল।
এই বাড়ি শুভাননারই, তারই জমিতে তারই অর্থে। যা বলবে তা মেনে নিতে হবেই এমন কোনো বাধ্যতা সে স্বামীর উপর কোনোদিন চাপায়নি বটে কিন্তু তুষার নিজেই তা চাপিয়ে নিয়েছে। বহুবার সে ভেবেছে, ‘আমার ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলা দরকার, প্রকাশ করা দরকার।’
তুষারের বিয়ের সম্বন্ধ এনেছিল তাদের পাশের বাড়ির এক বউ। পাত্রী সায়ান্স গ্র্যাজুয়েট, স্কুলশিক্ষিকা অর্থাৎ রোজগেরে, দেওয়া থাওয়া ভালোই করবে। বাবার এক মেয়ে। অবশ্য ছোট এক ভাইও আছে। পনেরো ভরি সোনা, দশ হাজার নগদ আর দেবাই পুকুরে ছ’কাঠা জমি মেয়েকে দেবে। তুষারের মা আপ্লুত হয়ে গেছিলেন। ছেলেকে অনুরোধ করেছিলেন রাজি হয়ে যেতে।
‘এমন সম্বন্ধ যে পাব এ তো ভাবতেই পারি না। তোর মত আছে তো?’
চারমাস আগে তুষার ভারতের বড় তিনটি জুট মিলের অন্যতম ওরিয়েন্টাল জুট মিলসের হেড অফিসে চাকরি পেয়েছে। মিলটা একদা সাহেবদের ছিল, মারোয়াড়ি কিনে নেয়।
‘সবে তো চাকরি পেলাম।’
কিন্তু তুষারের কাছে যৌতুকের জমি, সোনা, নগদ তখন এই সংসার থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন নিজস্ব একটা জীবন শুরুর উপায় বলে মনে হয়েছিল। দুই ভাই, মা, শিক্ষা ও রুচিহীনতা, স্বার্থপরতা এবং অনটনের সঙ্গে অবশ্যম্ভাবী ঝগড়াঝাটিতে তুষার ক্লান্ত হয়ে উঠেছিল। সে জানত এদের সঙ্গে সদ্ভাব নিয়ে বসবাস অসম্ভব; একসময় আলাদা হয়ে যেতেই হবে। তাহলে এই সুযোগেই নয় কেন? জমি পাওয়া যাচ্ছে কলকাতা থেকে সাত-আট মাইল দূরে, ভিত আর একতলার মেঝে করার মতো টাকাও আসছে। দুজনের চাকরি থেকে জমিয়ে জমিয়ে একখানা শোবার ঘর তুলে উঠে যাওয়া যায়। তারপর একটু একটু করে সম্পূর্ণ করে নেওয়া।
কিন্তু তার বিয়ে থেকে যা কিছু প্রাপ্তির ফল ভাইয়েরা এবং মা ভোগ করতে চাইবেই।
‘কিন্তু আমার মতো পাত্রকে ওরা এত কিছু দেবে কেন? কী দেখে দেবে? একটা কেরানির চাকরি আর এই তো ভাগের বাড়ি।’
‘কেন ছেলে হিসেবে তুই খারাপ কিসে!’
‘মেয়ে দেখেছ?’
‘না, তবে বউমা বলছিল মুখশ্রী ভালো, স্বাস্থ্যও ভালো, রংটা একটু ময়লা। আমি বলেছি ছবি দিতে।’
তুষার ছবি দেখেনি। ওরা পাঠিয়েছিল কিন্তু মা সেটা তাকে দেখায়নি। কয়েকদিন পর মাঝবয়সি একটি লোক এসে অফিসে তার সঙ্গে দেখা করে জানান, ত্রিবেণী থেকে তিনি আসছেন, তারই মেয়ে শুভাননার সঙ্গে বিয়ের কথা হচ্ছে। কিছু জমি আর পুকুরের মালিক, ডানলপে ক্যানভাস সরবরাহের ব্যবসাও করেন।
‘একটা কথা আপনাকে জানাবার জন্যই দেখা করতে আসা। মনে হল এটা জানিয়ে রাখা উচিত। যদিও আমার মেয়ে তবু বলছি পাত্রী দেখতে সুন্দরী কেন খুব সাধারণ মানেও লাবণ্যময়ী নয়। ছোট থেকেই চোখটা খারাপ, কাছের জিনিস চশমা ছাড়া ভালো দেখতে পায় না। হাইট কম, রং বেশ কালো আর একটু মোটাই। বয়স এখন ছাব্বিশ, আপনারই কাছাকাছি। এসব লুকিয়ে বিয়ে দিলে পরে কিন্তু ফল ভালো হয় না। শুধু মুখের ছবিতে সব ব্যাপার তো বোঝা যায় না আর আপনি নিজে গিয়েও যখন দেখতে অনিচ্ছুক, তাই আমিই এলাম।’
পাত্রীর বাবার এমন সোজা সহজ কথায় তুষার একটু অপ্রতিভ হয়ে যায় কিন্তু লোকটির স্পষ্টতার তারিফও করে। এই লোকটির চরিত্র আছে। কিন্তু কিছুই না দেখে বা শুনে একজন বিয়ে করবেই বা কেন? তার কি পছন্দ অপছন্দের কোনো বালাই নেই? নাকি সে নিরেট, অর্থলোভী?
‘আপনি যা বললেন, আমি তা সবই জানি।’ তুষার মিথ্যা বলল স্বচ্ছন্দেই। ছবিও দেখেছি। আমি লেখাপড়া জানা স্বাবলম্বী মেয়ে পছন্দ করি। রূপ যৌবন আর কদিন থাকে।’
লোকটির মুখে যে চাপা উৎকণ্ঠা ছিল সেটা এতক্ষণে সরে গেল।
‘মাধ্যমিক, প্রি-ইউ ফার্স্ট ডিভিশনে, হাই সেকেন্ড ক্লাশ জুলজিতে, এবারই বিটি করে এল। লেখাপড়া নিয়েই দিনরাত থাকে।’
‘একটা জিনিস আপনাকে জানিয়ে রাখি, মেয়েকে যা দেবেন, জমি বা নগদ তা ওর নামেই দেবেন আমি এসব কিছু নেব না।’
তুষার কেন যে তখন এটা বলেছিল পরে অনেক ভেবেও সে বুঝে উঠতে পারেনি। হয়তো এমন স্পষ্ট দৃঢ় চরিত্রের সামনে সেও নিজেকে বড় করে তুলে ধরতে চেয়েছিল।
‘জমি ছ’কাঠা বলেছিলাম পরে দেখলাম ওটা দশ কাঠা। আর শুভার বাড়ি করার ইচ্ছে থাকলে, আমিই করে দেব। আমার বিষয় সম্পত্তির যে ভাগ ওর প্রাপ্য তা এখনই দিয়ে যাব। ভবিষ্যতে মামলা মোকদ্দমার মধ্যে ছেলেমেয়েকে ফেলে যেতে চাই না।’
